Wednesday, 15 April 2020

রোজা ভঙ্গের কারণ সমূহ | যেসব কাজ করলে আপনার রোজা কখনো হবে না

রোজা ভঙ্গের কারণ সমূহ | যেসব কাজ করলে আপনার রোজা কখনো হবে না  

আল্লাহ তাআলা পরিপূর্ণ হেকমত অনুযায়ী রোযার বিধান জারী করেছেন। তিনি রোযাদারকে ভারসাম্য রক্ষা করে রোযা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন; একদিকে যাতে রোযা রাখার কারণে রোযাদারের শারীরিক কোন ক্ষতি না হয়। অন্যদিকে সে যেন রোযা বিনষ্টকারী কোন বিষয়ে লিপ্ত না হয়।

এ কারণে রোযা-বিনষ্টকারী বিষয়গুলো দুইভাগে বিভক্ত:

কিছু রোযা-বিনষ্টকারী বিষয় রয়েছে যেগুলো শরীর থেকে কোন কিছু নির্গত হওয়ার সাথে সম্পৃক্ত। যেমন- সহবাস, ইচ্ছাকৃত বমি করা, হায়েয ও শিঙ্গা লাগানো। শরীর থেকে এগুলো নির্গত হওয়ার কারণে শরীর দুর্বল হয়। এ কারণে আল্লাহ তাআলা এগুলোকে রোযা ভঙ্গকারী বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করেছেন; যাতে করে এগুলো নির্গত হওয়ার দুর্বলতা ও রোযা রাখার দুর্বলতা উভয়টি একত্রিত না হয়। এমনটি ঘটলে রোযার মাধ্যমে রোযাদার ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং রোযা বা উপবাসের ক্ষেত্রে আর ভারসাম্য বজায় থাকবে না।

আর কিছু রোযা-বিনষ্টকারী বিষয় আছে যেগুলো শরীরে প্রবেশ করানোর সাথে সম্পৃক্ত। যেমন- পানাহার। তাই রোযাদার যদি পানাহার করে তাহলে যে উদ্দেশ্যে রোযার বিধান জারী করা হয়েছে সেটা বাস্তবায়িত হবে না।[মাজমুউল ফাতাওয়া ২৫/২৪৮]

আল্লাহ তাআলা নিম্নোক্ত আয়াতে রোযা-বিনষ্টকারী বিষয়গুলোর মূলনীতি উল্লেখ করেছেন:

“এখন তোমরা নিজ স্ত্রীদের সাথে সহবাস কর এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা কিছু লিখে রেখেছেন তা (সন্তান) তালাশ কর। আর পানাহার কর যতক্ষণ না কালো সুতা থেকে ভোরের শুভ্র সুতা পরিস্কার ফুটে উঠে...”[সূরা বাকারা, আয়াত: ১৮৭]

এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা রোযা-নষ্টকারী প্রধান বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হচ্ছে- পানাহার ও সহবাস। আর রোযা নষ্টকারী অন্য বিষয়গুলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর হাদিসে উল্লেখ করেছেন।

তাই রোযা নষ্টকারী বিষয় ৭টি; সেগুলো হচ্ছে-

১। সহবাস

২। হস্তমৈথুন

৩। পানাহার

৪। যা কিছু পানাহারের স্থলাভিষিক্ত

৫। শিঙ্গা লাগানো কিংবা এ জাতীয় অন্য কোন কারণে রক্ত বের করা

৬। ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করা

৭। মহিলাদের হায়েয ও নিফাসের রক্ত বের হওয়া

এ বিষয়গুলোর মধ্যে প্রথম হচ্ছে- সহবাস; এটি সবচেয়ে বড় রোযা নষ্টকারী বিষয় ও এতে লিপ্ত হলে সবচেয়ে বেশি গুনাহ হয়। যে ব্যক্তি রমযানের দিনের বেলা স্বেচ্ছায় স্ত্রী সহবাস করবে অর্থাৎ দুই খতনার স্থানদ্বয়ের মিলন ঘটাবে এবং পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগ লজ্জাস্থানের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে যাবে সে তার রোযা নষ্ট করল; এতে করে বীর্যপাত হোক কিংবা না হোক। তার উপর তওবা করা, সেদিনের রোযা পূর্ণ করা, পরবর্তীতে এ দিনের রোযা কাযা করা ও কঠিন কাফফারা আদায় করা ফরয। এর দলিল হচ্ছে- আবু হুরায়রা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদিস তিনি বলেন: “এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এসে বলল: ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি ধ্বংস হয়েছি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: কিসে তোমাকে ধ্বংস করল? সে বলল: আমি রমযানে (দিনের বেলা) স্ত্রীর সাথে সহবাস করে ফেলেছি। তিনি বললেন: তুমি কি একটি ক্রীতদাস আযাদ করতে পারবে? সে বলল: না। তিনি বললেন: তাহলে লাগাতার দুই মাস রোযা রাখতে পারবে? সে বলল: না। তিনি বললেন: তাহলে ষাটজন মিসকীনকে খাওয়াতে পারবে? সে বলল: না...[হাদিসটি সহিহ বুখারী (১৯৩৬) ও সহিহ মুসলিমে (১১১১) এসেছে]

স্ত্রী সহবাস ছাড়া অন্য কোন কারণে কাফফারা আদায় করা ওয়াজিব হয় না।

দ্বিতীয়: হস্তমৈথুন। হস্তমৈথুন বলতে বুঝায় হাত দিয়ে কিংবা অন্য কিছু দিয়ে বীর্যপাত করানো। হস্তমৈথুন যে রোযা ভঙ্গকারী এর দলিল হচ্ছে- হাদিসে কুদসীতে রোযাদার সম্পর্কে আল্লাহর বাণী: “সে আমার কারণে পানাহার ও যৌনকর্ম পরিহার করে” সুতরাং যে ব্যক্তি রমযানের দিনের বেলা হস্তমৈথুন করবে তার উপর ফরয হচ্ছে— তওবা করা, সে দিনের বাকী সময় উপবাস থাকা এবং পরবর্তীতে সে রোযাটির কাযা পালন করা। আর যদি এমন হয়— হস্তমৈথুন শুরু করেছে বটে; কিন্তু বীর্যপাতের আগে সে বিরত হয়েছে তাহলে আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে; তার রোযা সহিহ। বীর্যপাত না করার কারণে তাকে রোযাটি কাযা করতে হবে না। রোযাদারের উচিত হচ্ছে— যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী সবকিছু থেকে দূরে থাকা এবং সব কুচিন্তা থেকে নিজের মনকে প্রতিহত করা। আর যদি, মজি বের হয় তাহলে অগ্রগণ্য মতানুযায়ী— এটি রোযা ভঙ্গকারী নয়।

তৃতীয়: পানাহার। পানাহার বলতে বুঝাবে— মুখ দিয়ে কোন কিছু পাকস্থলীতে পৌঁছানো। অনুরূপভাবে নাক দিয়ে কোন কিছু যদি পাকস্থলীতে পৌঁছানো হয় সেটাও পানাহারের পর্যায়ভুক্ত। এ কারণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তুমি ভাল করে নাকে পানি দাও; যদি না তুমি রোযাদার হও।”[সুনানে তিরমিযি (৭৮৮), আলবানি সহিহ তিরমিযিতে হাদিসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন] সুতরাং নাক দিয়ে পাকস্থলীতে পানি প্রবেশ করানো যদি রোযাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করত তাহলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভাল করে নাকে পানি দিতে নিষেধ করতেন না।

চতুর্থ: যা কিছু পানাহারের স্থলাভিষিক্ত। এটি দুইটি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। ১. যদি রোযাদারের শরীরে রক্ত পুশ করা হয়। যেমন- আহত হয়ে রক্তক্ষরণের কারণে কারো শরীরে যদি রক্ত পুশ করা হয়; তাহলে সে ব্যক্তির রোযা ভেঙ্গে যাবে। যেহেতু পানাহারের উদ্দেশ্য হচ্ছে— রক্ত তৈরী। ২. খাদ্যের বিকল্প হিসেবে ইনজেকশন পুশ করা। কারণ এমন ইনজেকশন নিলে পানাহারের প্রয়োজন হয় না।[শাইখ উছাইমীনের ‘মাজালিসু শারহি রমাদান’, পৃষ্ঠা- ৭০] তবে, যেসব ইনজেকশন পানাহারের স্থলাভিষিক্ত নয়; বরং চিকিৎসার জন্য দেয়া হয়, উদাহরণতঃ ইনসুলিন, পেনেসিলিন কিংবা শরীর চাঙ্গা করার জন্য দেয়া হয় কিংবা টীকা হিসেবে দেয়া হয় এগুলো রোযা ভঙ্গ করবে না; চাই এসব ইনজেকশন মাংশপেশীতে দেয়া হোক কিংবা শিরাতে দেয়া হোক।[শাইখ মুহাম্মদ বিন ইব্রাহিম এর ফতোয়াসমগ্র (৪/১৮৯)] তবে, সাবধানতা স্বরূপ এসব ইনজেকশন রাতে নেয়া যেতে পারে।

কিডনী ডায়ালাইসিস এর ক্ষেত্রে রোগীর শরীর থেকে রক্ত বের করে সে রক্ত পরিশোধন করে কিছু কেমিক্যাল ও খাদ্য উপাদান (যেমন— সুগার ও লবণ ইত্যাদি) যোগ করে সে রক্ত পুনরায় শরীরে পুশ করা হয়; এতে করে রোযা ভেঙ্গে যাবে।[ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটির ফতোয়াসমগ্র (১০/১৯)]

পঞ্চম: শিঙ্গা লাগানোর মাধ্যমে রক্ত বের করা। দলিল হচ্ছে— নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: “যে ব্যক্তি শিঙ্গা লাগায় ও যার শিঙ্গা লাগানো হয় উভয়ের রোযা ভেঙ্গে যাবে।”[সুনানে আবু দাউদ (২৩৬৭), আলবানী সহিহ আবু দাউদ গ্রন্থে (২০৪৭) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]

রক্ত দেয়াও শিঙ্গা লাগানোর পর্যায়ভুক্ত। কারণ রক্ত দেয়ার ফলে শরীরের উপর শিঙ্গা লাগানোর মত প্রভাব পড়ে। তাই রোযাদারের জন্য রক্ত দেয়া জায়েয নেই। তবে যদি অনন্যোপায় কোন রোগীকে রক্ত দেয়া লাগে তাহলে রক্ত দেয়া জায়েয হবে। রক্ত দানকারীর রোযা ভেঙ্গে যাবে এবং সে দিনের রোযা কাযা করবে।[শাইখ উছাইমীনের ‘মাজালিসু শারহি রামাদান’ পৃষ্ঠা-৭১]

কোন কারণে যে ব্যক্তির রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে— তার রোযা ভাঙ্গবে না; কারণ রক্ত ক্ষরণ তার ইচ্ছাকৃত ছিল না।[স্থায়ী কমিটির ফতোয়াসমগ্র (১০/২৬৪)]

আর দাঁত তোলা, ক্ষতস্থান ড্রেসিং করা কিংবা রক্ত পরীক্ষা করা ইত্যাদি কারণে রোযা ভাঙ্গবে না; কারণ এগুলো শিঙ্গা লাগানোর পর্যায়ভুক্ত নয়। কারণ এগুলো দেহের উপর শিঙ্গা লাগানোর মত প্রভাব ফেলে না।

ষষ্ঠ: ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করা। দলিল হচ্ছে— “যে ব্যক্তিরঅনিচ্ছাকৃতভাবে বমিএসে যায় তাকে উক্ত রোযা কাযা করতে হবে না। কিন্তু যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় বমি করল তাকে সে রোযা কাযা করতে হবে”[সুনানে তিরমিযি (৭২০), আলবানী সহিহ তিরমিযি গ্রন্থে (৫৭৭) হাদিসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন]

হাদিসে ذرعه শব্দের অর্থ غلبه।

ইবনে মুনযির বলেন: যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত বমি করেছে আলেমদের ঐক্যবদ্ধ অভিমত (ইজমা) হচ্ছে তার রোযা ভেঙ্গে গেছে।[আল-মুগনী (৪/৩৬৮)]

যে ব্যক্তি মুখের ভেতরে হাত দিয়ে কিংবা পেট কচলিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করেছে কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কিছু শুকেছে কিংবা বারবার দেখেছে এক পর্যায়ে তার বমি এসে গেছে তাকেও রোযা কাযা করতে হবে।

তবে যদি কারো পেট ফেঁপে থাকে তার জন্য বমি আটকে রাখা বাধ্যতামূলক নয়; কারণ এতে করে তার স্বাস্থ্যের ক্ষতি হবে।[শাইখ উছাইমীনের মাজালিসু শাহরি রামাদান, পৃষ্ঠা-৭১]

সপ্তম: হায়েয ও নিফাসের রক্ত নির্গত হওয়া। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যখন মহিলাদের হায়েয হয় তখন কি তারা নামায ও রোযা ত্যাগ করে না!?”[সহিহ বুখারী (৩০৪)] তাই কোন নারীর হায়েয কিংবা নিফাসের রক্ত নির্গত হওয়া শুরু হলে তার রোযা ভেঙ্গে যাবে; এমনকি সেটা সূর্যাস্তের সামান্য কিছু সময় পূর্বে হলেও। আর কোন নারী যদি অনুভব করে যে, তার হায়েয শুরু হতে যাচ্ছে; কিন্তু সূর্যাস্তের আগে পর্যন্ত রক্ত বের হয়নি তাহলে তার রোযা শুদ্ধ হবে এবং সেদিনের রোযা তাকে কাযা করতে হবে না।

আর হায়েয ও নিফাসগ্রস্ত নারীর রক্ত যদি রাত থাকতে বন্ধ হয়ে যায় এবং সাথে সাথে তিনি রোযার নিয়ত করে নেন; তবে গোসল করার আগেই ফজরহয়ে যায় সেক্ষেত্রে আলেমদের মাযহাব হচ্ছে— তার রোযা শুদ্ধ হবে।

হায়েযবতী নারীর জন্য উত্তম হচ্ছে তার স্বাভাবিক মাসিক অব্যাহত রাখা এবং আল্লাহ তার জন্য যা নির্ধারণ করে রেখেছেন সেটার উপর সন্তুষ্ট থাকা, হায়েয-রোধকারী কোন কিছু ব্যবহার না-করা। বরং আল্লাহ তার থেকে যেভাবে গ্রহণ করেন সেটা মেনে নেয়া অর্থাৎহায়েয এর সময় রোযা ভাঙ্গা এবং পরবর্তীতে সে রোযা কাযা পালন করা। উম্মুল মুমিনগণ এবং সলফে সালেহীন নারীগণ এভাবেই আমল করতেন।[স্থায়ী কমিটির ফতোয়াসমগ্র (১০/১৫১)]

তাছাড়া চিকিৎসা গবেষণায় হায়েয বা মাসিক রোধকারী এসব উপাদানের বহুমুখী ক্ষতি সাব্যস্ত হয়েছে। এগুলো ব্যবহারের ফলে অনেক নারীর হায়েয অনিয়মিত হয়ে গেছে। তারপরেও কোন নারী যদি হায়েয বন্ধকারী ঔষধ গ্রহণ করার ফলে তার হায়েযের রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যায় এবং জায়গাটি শুকিয়ে যায় সে নারী রোযা রাখতে পারবে এবং তার রোযাটি আদায় হয়ে যাবে।

উল্লেখিত বিষয়গুলো হচ্ছে- রোযা বিনষ্টকারী। তবে, হায়েয ও নিফাস ছাড়া অবশিষ্ট বিষয়গুলো রোযা ভঙ্গ করার জন্য তিনটি শর্ত পূর্ণ হতে হয়:

-রোযা বিনষ্টকারী বিষয়টি ব্যক্তির গোচরীভূত থাকা; অর্থাৎ এ ব্যাপারে সে অজ্ঞ না হয়।

-তার স্মরণে থাকা।

-জোর-জবরদস্তির স্বীকার না হয়ে স্বেচ্ছায় তাতে লিপ্ত হওয়া।

এখন আমরা এমন কিছু বিষয় উল্লেখ করব যেগুলো রোযা নষ্ট করে না:

-এনিমা ব্যবহার, চোখে কিংবা কানে ড্রপ দেয়া, দাঁত তোলা, কোন ক্ষতস্থানের চিকিৎসা নেয়া ইত্যাদি রোযা ভঙ্গ করবে না।[মাজমুউ ফাতাওয়া শাইখুল ইসলাম (২৫/২৩৩, ২৫/২৪৫)]

-হাঁপানি রোগের চিকিৎসা কিংবা অন্য কোন রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে জিহ্বার নীচে যে ট্যাবলেট রাখা হয় সেটা থেকে নির্গত কোন পদার্থ গলার ভিতরে চলে না গেলে সেটা রোযা নষ্ট করবে না।

-মেডিকেল টেস্টের জন্য যোনিপথে যা কিছু ঢুকানো হয়; যেমন- সাপোজিটর, লোশন, কলপোস্কোপ, হাতের আঙ্গুল ইত্যাদি।

-স্পেকুলাম বা আই, ইউ, ডি বা এ জাতীয় কোন মেডিকেল যন্ত্রপাতি জরায়ুর ভেতরে প্রবেশ করালে।

-নারী বা পুরুষের মুত্রনালী দিয়ে যা কিছু প্রবেশ করানো হয়; যেমন- ক্যাথিটার, সিস্টোস্কোপ, এক্সরে এর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত রঞ্জক পদার্থ, ঔষধ, মুত্রথলি পরিস্কার করার জন্য প্রবেশকৃত দ্রবণ।

-দাঁতের রুট ক্যানেল করা, দাঁত ফেলা, মেসওয়াক দিয়ে কিংবা ব্রাশ দিয়ে দাঁত পরিস্কার করা; যদি ব্যক্তি কোন কিছু গলায় চলে গেলে সেগুলো গিলে না ফেলে।

-গড়গড়া কুলি ও চিকিৎসার জন্য মুখে ব্যবহৃত স্প্রে; যদি কোন কিছু গলায় চলে আসলেও ব্যক্তি সেটা গিলে না ফেলে।

-অক্সিজেন, এ্যানেসথেসিয়ার জন্য ব্যবহৃত গ্যাস রোযা ভঙ্গ করবে না; যদি না রোগীকে এর সাথে কোন খাদ্য-দ্রবণ দেয়া হয়।

-চামড়া দিয়ে শরীরে যা কিছু প্রবেশ করে। যেমন- তৈল, মলম, মেডিসিন ও কেমিকেল সম্বলিত ডাক্তারি প্লাস্টার।

-ডাগায়নস্টিক ছবি তোলা কিংবা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে হৃৎপিণ্ডের ধমনীতে কিংবা শরীরের অন্য কোন অঙ্গের শিরাতে ছোট একটি টিউব প্রবেশ করানোতে রোযা ভঙ্গ হবে না।

-নাড়ীভুড়ি পরীক্ষা করার জন্য কিংবা অন্য কোন সার্জিকাল অপারেশনের জন্য পেটের ভেতর একটি মেডিকেল স্কোপ প্রবেশ করালেও রোযা ভাঙ্গবে না।

- কলিজা কিংবা অন্য কোন অঙ্গের নমুনাস্বরূপ কিছু অংশ সংগ্রহ করলেও রোযা ভাঙ্গবে না; যদি এ ক্ষেত্রে কোন দ্রবণ গ্রহণ করতে না হয়।

- গ্যাসট্রোস্কোপ (gastroscope) যদিপাকস্থলীতে ঢুকানো তাতে রোযা ভঙ্গ হবে না; যদি না সাথে কোন দ্রবণ ঢুকানো না হয়।

- চিকিৎসার স্বার্থে মস্তিষ্কে কিংবা স্পাইনাল কর্ডে কোন চিকিৎসা যন্ত্র কিংবা কোন ধরণের পদার্থ ঢুকানো হলে রোযা ভঙ্গ হবে না।

আল্লাহই ভাল জানেন।

[দেখুন শাইখ উছাইমীনের ‘মাজালিসু শারহি রামাদান’ ও ‘সিয়াম সংক্রান্ত ৭০টি মাসয়ালা’ নামক এ ওয়েব সাইটের পুস্তিকা]

Monday, 24 September 2018

হস্তমৈথুন করা কি ইসলামে জায়েয? ইসলামে কি বলা হয়েছে

হস্তমৈথুন করা কি ইসলামে জায়েয? ইসলামে কি বলা হয়েছে

প্রশ্ন: আমার একটি প্রশ্ন আছে, আমি সে প্রশ্নটি পেশ করতে লজ্জাবোধ করছি। এক বোন নতুন ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তিনি প্রশ্নটির জবাব জানতে চান। কুরআন-হাদিসের দলিল ভিত্তিক এ প্রশ্নের জবাব আমার জানা নেই। আমি আশা করব, আপনারা আমাদেরকে সহযোগিতা করবেন। আমি আল্লাহ্‌র কাছে প্রার্থনা করছি, যদি আমার প্রশ্নটি অশালীন হয় তাহলে তিনি যেন আমাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু, মুসলিম হিসেবে জ্ঞানার্জনে আমাদের লজ্জাবোধ করা উচিত নয়।
সে বোনের প্রশ্ন হচ্ছে– হস্তমৈথুন করা কি ইসলামে জায়েয?


আলহামদুলিল্লাহ।

কুরআন ও সুন্নাহ্‌র দলিলের ভিত্তিতে হস্তমৈথুন করা হারাম:

এক. কুরআনে কারীম:

ইবনে কাছির (রহঃ) বলেন: ইমাম শাফেয়ি এবং যারা তাঁর সাথে একমত পোষণ করেছেন তারা সবাই এ আয়াত দিয়ে হস্তমৈথুন হারাম হওয়ার পক্ষে দলিল দিয়েছেন। আয়াতটির ভাবানুবাদ হচ্ছে-

“আর যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে হেফাযত করে। নিজেদের স্ত্রী বা মালিকানাভুক্ত দাসীগণ ছাড়া; এক্ষেত্রে (স্ত্রী ও দাসীর ক্ষেত্রে) অবশ্যই তারা নিন্দিত নয়। যারা এর বাইরে কিছু কামনা করবে তারাই সীমালঙ্ঘনকারী।”[সূরা মুমিনুন, আয়াত: ৫-৬]

ইমাম শাফেয়ি ‘নিকাহ অধ্যায়ে’ বলেন: ‘স্ত্রী বা দাসী ছাড়া অন্য সবার থেকে লজ্জাস্থান হেফাযত করা’ উল্লেখ করার মাধ্যমে স্ত্রী ও দাসী ছাড়া অন্য কেউ হারাম হওয়ার ব্যাপারে আয়াতটি সুস্পষ্ট। এরপরও আয়াতটিকে তাগিদ করতে গিয়ে আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন (ভাবানুবাদ): “যারা এর বাইরে কিছু কামনা করবে তারাই সীমালঙ্ঘনকারী।” সুতরাং স্ত্রী বা দাসী ছাড়া অন্য কোন ক্ষেত্রে পুরুষাঙ্গ ব্যবহার করা বৈধ হবে না, হস্তমৈথুনও বৈধ হবে না। আল্লাহ্‌ই ভাল জানেন।[ইমাম শাফেয়ি রচিত ‘কিতাবুল উম্ম’]

কোন কোন আলেম এ আয়াত দিয়ে দলিল দেন: “যারা বিবাহে সক্ষম নয়, তারা যেন সংযম অবলম্বন করে যে পর্যন্ত না আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেন।”[সূরা নূর, আয়াত: ৩৩] এ আয়াতে সংযমের নির্দেশ দেয়ার দাবী হচ্ছে– অন্য সবকিছু থেকে ধৈর্য ধারণ করা।

দুই. সুন্নাহ্‌:

আলেমগণ এ ব্যাপারে আব্দুল্লাহ্‌ বিন মাসউদ (রাঃ) এর হাদিস দিয়ে দলিল দেন যে, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে আমরা এমন কিছু যুবকে ছিলাম যাদের কিছু ছিল না। তখন রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: হে যুবকেরা! তোমাদের মধ্যকার যার باءة (বিয়ের খরচ বহন ও শারীরিক সামর্থ্য) রয়েছে সে যেন বিয়ে করে ফেলে। কেননা, তা তার দৃষ্টি নিম্নগামী রাখতে ও লজ্জাস্থানকে হেফাজত করায় সহায়ক হয়। আর যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে। কারণ তা যৌন উত্তেজনা প্রশমনকারী।”[সহীহ বুখারী (৫০৬৬)]

শরিয়ত প্রণেতা, বিয়ে করতে অক্ষম হলে কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও রোযা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। হস্তমৈথুন করার পরামর্শ দেননি। যদিও হস্তমৈথুনের প্রতি আগ্রহ বেশি থাকে, হস্তমৈথুন করা রোযা রাখার চেয়ে সহজ। কিন্তু তদুপরি তিনি সে অনুমতি দেননি।

এ মাসয়ালায় আরও অনেক দলিল আছে। আমরা এ দলিলগুলো উল্লেখ করাই যথেষ্ট মনে করছি।

হস্তমৈথুনে লিপ্ত ব্যক্তি কিভাবে এর থেকে মুক্তি পেতে পারেন এ সম্পর্ক নিম্নে আমরা কিছু উপদেশ ও পদক্ষেপ উল্লেখ করব:

১। এই অভ্যাস থেকে বাঁচার প্রেরণা যেন হয় আল্লাহ্‌র নির্দেশ পালন ও তাঁর অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা।

২। স্থায়ী সমাধান তথা বিয়ের মাধ্যমে এ অভ্যাসকে প্রতিরোধ করা। কারণ এটাই ছিল যুবকদের প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপদেশ।

৩। নানা রকম কু-চিন্তা ও খারাপ ভাবনা থেকে দূরে থাকা। দুনিয়া বা আখেরাতের কল্যাণকর চিন্তায় নিজেকে ব্যস্ত রাখা। কারণ কু-চিন্তাকে বাড়তে দিলে সেটা এক পর্যায়ে কর্মের দিকে নিয়ে যায়। চূড়ান্ত পর্যায়ে তা নিয়ন্ত্রয়ের বাইরে গিয়ে অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। তখন তা থেকে মুক্ত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

৪। দৃষ্টিকে নত রাখা। কারণ কোন ব্যক্তি বা অশ্লীল ছবির দিকে দৃষ্টিপাত করা, সেটা জীবিত মানুষের হোক কিংবা আঁকা হোক, বাঁধহীন দৃষ্টি ব্যক্তিকে হারামের দিকে নিয়ে যায়। এ কারণে আল্লাহ্‌ তাআলা বলেছেন: “মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে”[সূরা নূর, আয়াত: ৩০] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “তুমি দৃষ্টির পর দৃষ্টি দিবে না”[সুনানে তিরমিযি (২৭৭৭), আলবানী হাদিসটিকে ‘হাসান’ বলেছেন] তাই প্রথম দৃষ্টি, যে দৃষ্টি হঠাৎ করে পড়ে যায় সেটাতে গুনাহ না থাকলেও দ্বিতীয় দৃষ্টি হারাম। এছাড়া যে সব স্থানে যৌন উত্তেজনা জাগিয়ে তোলার উপকরণ বিদ্যমান থাকে সেসব স্থান থেকে দূরে থাকা বাঞ্ছনীয়।

৫। নানাবিধ ইবাদতে মশগুল থাকা। পাপকাজ সংঘটিত হওয়ার মত কোন অবসর সময় না রাখা।

৬। এ ধরণের কু-অভ্যাসের ফলে যেসব শারীরিক ক্ষতি ঘটে থাকে সেগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। যেমন- দৃষ্টিশক্তি ও স্নায়ুর দুর্বলতা, প্রজনন অঙ্গের দুর্বলতা, মেরুদণ্ডের ব্যথা ইত্যাদি যেসব ক্ষতির কথা চিকিৎসকরা উল্লেখ করে থাকেন। অনুরূপভাবে বিভিন্ন মানসিক ক্ষতি; যেমন- উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, মানসিক পীড়া অনুভব করা। এর চেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে- নামায নষ্ট করা। যেহেতু বারবার গোসল করা লাগে, যা করা কঠিন। বিশেষতঃ শীতের রাত্রিতে। অনুরূপভাবে রোযা নষ্ট করা।

৭। ভুল দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি পরিতুষ্টি দূর করা। কারণ কিছু কিছু যুবক ব্যভিচার ও সমকামিতা থেকে নিজেকে রক্ষা করার ধুয়া তুলে এই কু-অভ্যাসকে জায়েয মনে করে। অথচ হতে পারে সে যুবক ব্যভিচার ও সমকামিতার নিকটবর্তী হওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই।

৮। কঠিন ইচ্ছা ও শক্ত সিদ্ধান্ত দিয়ে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা। শয়তানের কাছে হার না মানা। একাকী না থাকা; যেমন একাকী রাত কাটানো। হাদিসে এসেছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন পুরুষকে একাকী রাত কাটাতে নিষেধ করেছেন।[মুসনাদে আহমাদ, হাদিসটি ‘সহিহুল জামে’ তে রয়েছে]

৯। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশিত প্রতিকার পদ্ধতি গ্রহণ করা; সেটা হচ্ছে– রোযা রাখা। কেননা রোযা যৌন উত্তেজনাকে প্রশমিত করে এবং যৌন চাহিদাকে পরিশীলিত করে। এর সাথে উদ্ভট আচরণ থেকে সাবধান থাকা; যেমন- হস্তমৈথুন পুনরায় না করার ব্যাপারে শপথ করা কিংবা মানত করা। কারণ যদি কেউ পুনরায় করে ফেলে তাহলে সে ব্যক্তি পাকাপোক্ত-শপথ ভঙ্গকারী হিসেবে গণ্য হবে। অনুরূপভাবে যৌন উত্তেজনা নিরোধক ঔষধ সেবন না করা। কেননা এসব ঔষধ সেবনে শারীরিক ঝুঁকি আছে। তাছাড়া যৌন উত্তেজনা একেবারে নিঃশেষ করে ফেলে এমন কিছু সেবন করা থেকে হাদিসে নিষেধাজ্ঞা সাব্যস্ত হয়েছে।

১০। ঘুমানোর সময় ইসলামী আদবগুলো মেনে চলা। যেমন- ঘুমানোর দোয়াগুলো পড়া, ডান পার্শ্বে কাত হয়ে শোয়া, পেটের উপর ভর দিয়ে না-ঘুমানো; যেহেতু এ সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিষেধ আছে।

১১। ধৈর্য ও সংযমের গুণে নিজেকে ভূষিত করা। কারণ হারাম কাজ থেকে ধৈর্য রাখা আমাদের উপর ফরয; যদিও আমাদের মাঝে সেগুলো করার চাহিদা থাকে। আমাদের জানা উচিত, যদি আমরা নিজেকে সংযমী রাখার চেষ্টা করি তাহলে পরিশেষে সেটা ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য আখলাকে পরিণত হবে। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি সংযম অবলম্বন করে আল্লাহ্‌ তাকে সংযমী বানিয়ে দিবেন, যে ব্যক্তি অমুখাপেক্ষী থাকার চেষ্টা করবেন আল্লাহ্‌ তাকে অমুখাপেক্ষী বানিয়ে দিবেন, যে ব্যক্তি ধৈর্য রাখার চেষ্টা করবেন আল্লাহ্‌ তাকে ধৈর্যশীল বানিয়ে দিবেন। কোন মানুষকে ধৈর্যের চেয়ে প্রশস্ত ও কল্যাণকর আর কোন দান দেয়া হয়নি।”[সহিহ বুখারী (১৪৬৯)]

১২। কেউ যদি এই গুনাহটি করে ফেলে তাহলে তার উচিত অনতিবিলম্বে তওবা করা, ক্ষমা প্রার্থনা করা, নেকীর কাজ করা এবং ক্ষমাপ্রাপ্তির ব্যাপারে হতাশ না হওয়া। কেননা এ পাপটি একটি কবিরা গুনাহ।

১৩। সর্বশেষ, নিঃসন্দেহে আল্লাহ্‌র কাছে ধর্ণা দেয়া, দোয়ার মাধ্যমে তাঁর কাছে মিনতি করা, তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা এই কু-অভ্যাস থেকে বাঁচার সবচেয়ে বড় উপায়। কেননা আল্লাহ্‌ তাআলা দোয়াকারীর ডাকে সাড়া দেন। আল্লাহ্‌ই ভাল জানেন।

ইসলামে স্বামী স্ত্রী সহবাস করার সময় কিছু নিয়ম কানুন কী কী

ইসলামে স্বামী স্ত্রী সহবাস করার সময় কিছু নিয়ম কানুন কী কী

আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত:
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যখন পুরুষ তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করে তখন সে যেন পরিপূর্ণভাবে (সহবাস) করে। আর তার যখন চাহিদা পূরণ হয়ে যায় (শুক্রস্খলন হয়) অথচ স্ত্রীর চাহিদা অপূর্ণ থাকে, তখন সে যেন তাড়াহুড়া না করে। [মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদিস নং-১০৪৬৮]
কী বলা হচ্ছে এখানে? সহবাসকালে পুরুষ তার নিজের যৌন চাহিদা পুরো হওয়া মাত্রই যেন উঠে না যায়, স্ত্রীর যৌন চাহিদা পূরণ হওয়া পর্যন্ত যেন বিলম্ব করে। এরকম একটা হাদিস চোখ দিয়ে দেখার পরও কারো জন্য এমন দাবি করা কি ঠিক হবে যে ইসলামে নারীদের যৌন চাহিদার কোন স্বীকৃতি নেই!
এসব তো গেল উপদেশ। কিন্তু বাস্তবে কেউ যদি এসব উপদেশ অনুসরণ না করে তাহলে এই ধরণের পুরুষদের সতর্ক করা তার অভিভাবক এবং বন্ধুদের যেমন দায়িত্ব তেমনিস্ত্রীরাও তাদের স্বামিদের বিরূদ্ধে ইসলামি রাষ্ট্রের কাছে নালিশ করার অধিকার রাখে। এধরণের কিছু ঘটনা পরিচ্ছেদ চারে আসছে।
এছাড়া সঙ্গমকালে স্ত্রীকে যৌনভাবে উত্তেজিত না করে সঙ্গম করাকে ইসলামে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা তাতে স্বামীর চাহিদা পূরণ হলেও স্ত্রীর চাহিদা পূরণ হয় না এবং স্ত্রীর জন্য তা কষ্টকর হয়। পরিচ্ছেদ পাঁচে এই ব্যাপারে আলোকপাত করা হবে।



সহবাসের স্বাভাবিক নিয়ম বা পন্থা। সহবাস কিভাবে করবেন।  সহবাস প্রসঙ্গে।
সহবাসের স্বাভাবিক পন্থা হলো এই যে, স্বামী উপরে থাকবে আর স্ত্রী নিচে থাকবে। প্রত্যেক প্রাণীর ক্ষেত্রেও এই স্বাভাবিক পন্থা পরিলক্ষতি হয়। সর্বপরি এ দিকেই অত্যন্ত সুক্ষভাবে ইঙ্গিত করা হয়েছে আল কুরআনে।
আয়াতের অর্থ হলোঃ  “যখন স্বামী -স্ত্রীকে ঢেকে ফেললো তখন স্ত্রীর ক্ষীণ গর্ভ সঞ্চার হয়ে গেলো।”
আর স্ত্রী যখন নিচে থাকবে এবং স্বামী তার উপর উপুড় হয়ে থাকবে তখনই স্বামীর শরীর দ্বারা স্ত্রীর শরীর ঢাকা পড়বে। তাছাড়া এ পন্থাই সর্বাধিক আরামদায়ক। এতে স্ত্রীরও কষ্ট সহ্য করতে হয়না এবং গর্ভধারণের জন্যেও তা উপকারী ও সহায়ক। বিখ্যাত চিকিতসা বিজ্ঞানী বু-আলী ইবনে সীনা তার অমর গ্রন্থ “কানুন” নামক বইয়ে এই পন্থাকেই সর্বোত্তম পন্থা হিসেবে উলে­খ করেছেন এবং ‘স্বামী নিচে আর স্ত্রী উপরে’ থাকার পন্থাকে নিকৃষ্ট পন্থা বলেছেন। কেননা এতে পুংলিংগে বীর্য আটকে থেকে দুর্গন্ধ যুক্ত হয়ে কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই অবশ্যই আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে যেন আনন্দঘন মুহুর্তটা পরবর্তিতে বেদনার কারণ হয়ে না দাড়ায়।
তাই ইসলামী জীবন বিধান মেনে চলুন আনন্দকে অনন্দ হিসেবে উপভোগ করুন। আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে বিধান অনুযায়ী মেনে চলার তৌফিক দান করুন। আমীন।

সহবাসের সঠিক নিয়ম
স্ত্রী সহবাসের নিষিদ্ধ সময়
মিলনের নিয়ম
সহবাসের দোয়া বাংলায়
শবে বরাতের রাতে স্ত্রী সহবাস
হাদিস অনুযায়ী সহবাসের নিয়ম
স্বামী স্ত্রী সহবাস করার সময় কিছু নিয়ম কানুন >
হাদিসের আলোকে সহবাস 

Thursday, 22 March 2018

টাখনুর নীচে কাপড় ঝুলিয়ে পরিধান করা


টাখনুর নীচে কাপড় ঝুলিয়ে পরিধান করা যদি অহংকার বশতঃ হয় তবে তার শাস্তি কি? কিন্তু যদি অহংকার বশতঃ না হয় তবে তার শাস্তি কি? আবু বকরের হাদীছ দ্বারা যারা দলীল পেশ করে তাদের দাবীর কি জবাব?
লুঙ্গি, পায়জামা, প্যান্ট ইত্যাদি কাপড় যদি পায়ের কিঞ্চিৎ নিচে ঝুলিয়ে পরিধান করা হয় এবং তাঁর উদ্দেশ্য হয় অহংকার করা, তবে তাঁর শাস্তি হল – কিয়ামত দিবসে আল্লাহ্‌ তা’আলা তাঁর দিকে দৃষ্টি দিবেন না, তাঁর সাথে কথা বলবেন না, তাকে পবিত্র করবেন না এবং তাঁর জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর যদি অহংকারের সাথে নয় বরং সাধারণভাবে কাপড় ঝুলিয়ে পরে, তবে তাঁর শাস্তি হল –তাঁর টাখনুদ্বয়কে জাহান্নামের আগুনে পোড়ানো হবে। কেননা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ

ثَلاَثَةٌ لاَ يُكَلّمُهُمُ اللّهُ يَوْمَ الْقِياَمَةِ وَلاَ يَنْظُرُ إلَيْهِمْ وَلاَ يُزَكّيْهِمْ وَلَهُمْ عَذاَبٌ ألِيْم: المُسْبِلُ وَالمَنَّانُ وَالْمُنْفِقُ سِـلْعَتَهُ بـاِلْحَلِفِ الكـاَذِبِ

“কিয়ামত দিবসে আল্লাহ্‌ তা’আলা তিনি ব্যাক্তির সাথে কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না, তাদেরকে পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। সেই তিনি ব্যাক্তি হল –
১) পায়ের টাখনুর নীচে কাপড় ঝুলিয়ে পরিধানকারী,
২) দান করে খোটাদানকারী
৩) মিথ্যা শপথ করে পন্য বিক্রয়কারী “ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেনঃ

مَنْ جَرَّ ثَوْبَهُ خُيَلاَءَ لَمْ يَنْظُرِ الله إلَيْهِ يَوْمَ الْقِياَمَـةِ

“যে ব্যাক্তি অহংকার বশতঃ কাপড় ঝুলিয়ে পরিধান করবে কিয়ামত দিবসে আল্লাহ্‌ তাঁর দিকে দৃষ্টিপাত করবেন না” এ বিধান ঐ ব্যাক্তির জন্য যে অহংকার বশতঃ কাপড় ঝুলিয়ে পরে।
আর যে ব্যাক্তি অহংকারের উদ্দেশ্য ছাড়া কাপড় ঝুলিয়ে পরবে তাঁর ব্যাপারে হাদীসে এসেছে, আবূ হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ

ماَ أسْفَلَ الكعبين مِـنَ الإزاَرِ فَفِيْ النّـارِ

“যে টাখনুদ্বয়ের নীচে কাপড় ঝুলিয়ে পরা হত তা আগুনের মধ্যে জ্বলবে” এ হাদিসে দোযখের আগুনে টাখনু জ্বলার ব্যাপারে অহঙ্কারের কথা উল্লেখ নেই।
আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ

إِزْرَةُ الْمُؤْمِنِ إِلَى نِصْفِ السَّاقِ وَلا حَرَجَ أَوْ لا جُنَاحَ فِيمَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْكَعْبَيْنِ ومَا كَانَ أَسْفَلَ مِنَ الْكَعْبَيْنِ فَهُوَ فِي النَّارِ وَمَنْ جَرَّ إِزَارَهُ بَطَرًا لَمْ يَنْظُرِ اللَّهُ إِلَيْهِ يَوْمَ الْقِياَمَةِ

“মুমিম ব্যাক্তির কাপড় নেসফে সাক তথা অর্ধ হাঁটু পর্যন্ত, এতে কোন অসুবিধা নেই” (হাঁটু থেকে পায়ের তোলার মধ্যভাগকে নেসফে সাক বলা হয়) অন্য বর্ণনায় তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরুপ বলেনঃ “পায়ের টাখনু এবং হাটুর মধ্যবর্তী স্থানে কাপড় পরিধান করাতে কোন অসুবিধা নেই। যে টাখনুর নীচে কাপড় পরিধান করা হবে তা জাহান্নামে যাবে, এবং যে ব্যাক্তি অহংকার বশতঃ কাপড় ঝুলিয়ে পরবে, কিয়ামত দিবসে আল্লাহ্‌ তাঁর দিকে দৃষ্টিপাত করবেন না”।

অনেকে কাপড় ঝুলিয়ে পরিধান করে এবং যুক্তি দেখায় যে আমি তো অহংকার বশতঃ কাপড় টাখনুর নীচে ঝুলিয়ে পরিনাই, সতরাং এতে তেমন অসুবিধা নেই। উল্লেখিত হাদিসগুলি থেকে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, এ ব্যাক্তির যুক্তি সম্পূর্ণ অসাড়।

অতএব অহকারের উদ্দেশ্য ব্যাতিত এমনিই সাধারণভাবে কাপড় টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে পরলেই জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে। আর তাঁর সাথে যদি অহংকার যুক্ত হয় তবে তাঁর শাস্তি আরও কঠিন, তা হল – আল্লাহ্‌ তাঁর সাথে কথা বলবেন না, তাঁর দিকে তাকাবেন না, তাকে পবিত্র করবেন না এবং তাঁর জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।

আবু বকর (রাঃ) এর হাদীছ দ্বারা যারা দলীল পেশ করতে চায় দু’দিক থেকে তাদের যুক্তি খন্ডনঃ

প্রথম কথাঃ আবু বকর (রাঃ) বলেছেন, আমার কাপড়ের এক পার্শ্ব (অনিচ্ছাকৃত) ঝুলে পড়ে কিন্তু আমি তা বারবার উঠিয়ে নেয়ার চেষ্টা করি।” অতএব তিনি তো ইচ্ছাকৃত একাজ করতেন না। বরং তাঁর শরীর অধিক ক্ষীণ হওয়ার কারণে অনিচ্ছাকৃত কাপড় ঝুলে যেত। তাছাড়া তিনি তা উঠিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতেন। কিন্তু যারা কাপড় ঝুলিয়ে পরে এবং ধারণা করে যে তারা অহংকার করে না, তারা তো ইচ্ছাকৃত একাজ করে। অতএব তাদের ক্ষেত্রে আমরা বলব, অহংকারের উদ্দেশ্য ব্যতীত ইচ্ছাকৃত কাপড় ঝুলিয়ে পরলে তার টাখনু জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে। যেমনটি আবু হুরায়রার হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। আর যদি অহংকার বশতঃ হয় তবে তার শাস্তি হচ্ছে, আল্লাহ্‌ তাঁর সাথে কথা বলবেন না, তাঁর দিকে তাকাবেন না, তাকে পবিত্র করবেন না এবং তাঁর জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।

দ্বিতীয় কথাঃ নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেই আবু বকর (রাঃ)কে পরিশুদ্ধ করেছেন এবং সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি সেই সকল লোকদের অন্তর্ভুক্ত নন, যারা অহংকার বশতঃ একাজ করে থাকে। অতএব বর্তমানে এরা কি নবীজীর পক্ষ থেকে এরূপ সচ্চরিত্রের সনদ ও তাঁর সাক্ষ্য লাভ করেছে? কিন্তু শয়তান প্রবৃত্তির অনুসারী লোকদেরকে কুরআন্তসুন্নাহ্‌ থেকে সামঞ্জস্যপূর্ণ উক্তি সমূহকে খেয়াল-খুশির উপর ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধু করে। তখন তারা বিভ্রান্ত হয়। আল্লাহ্‌ যাকে ইচ্ছা সঠিক পথে পরিচালিত করে থাকেন।

ইসলামের দৃষ্টেতে হস্তমৈথুন ও খতিকারক দিক সমুহ:

ইসলামের দৃষ্টেতে হস্তমৈথুন ও খতিকারক দিক সমুহ:
     

ইসলামের দৃষ্টেতে হস্তমৈথুন:
আল্লাহ তা’আলার দেয়া এ সুন্দর যৌবনকালটাকে ক্ষয় করার জন্য যে ব্যক্তি তার স্বীয় লিঙ্গের পিছনে লেগে যায় এবং নিজ হাত দিয়ে এটা চর্চা করায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তার এ হাত পরকালে সাক্ষী দেবে যে, সে এ পাপ কোথায় কতবার করেছে- যা পবিত্র কালামে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ “সেই দিন আমি তাদের মুখের উপর মোহর মেরে দেব, বরং তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে, আর তাদের পা সাক্ষ্য দেবে যা তারা অর্জন করত সে-সন্বন্ধে। ” -(আল- কুরআন, ৩৬:৬৫) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ “ যে ব্যক্তি স্বীয় জিহ্বা এবং লজ্জাস্থান জামিন হবে আমি তার জাহান্নামের জন্যে জামিন হবো।” -(বুখারি, মিশকাত) উক্ত হাদিস থেকে প্রমানিত হচ্ছে, মানব দেহের এ দু’টো অঙ্গ অত্যন্ত দুর্বল ও বিপদজনক। এ দু’টো অঙ্গের মাধ্যমে বিশেষ করে লজ্জাস্থানের মাধ্যমে পাপ করাতে শয়তানের জন্য খুব সুবিধা। এ দু’টো অঙ্গের মাধ্যমে বেশীরভাগ পাপ হয়ে থাকে। যদি কোন ব্যক্তি এ দু’টো অঙ্গের হেফাজত করে, বিশেষ করে যুবক অবস্i✔উ✔মi✔ লিঙ্গের হেফাজত করে অবয়িদ কোন প্রকারেই বীর্যপাত ঘটাতে চেষ্টা না করে তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশের বিরাট সুযোগ পেয়ে যাবে। অন্যত্র সহীহ হাদীস থেকে আরও প্রমানিত হয়ঃ “(একদা রাসুলুল্লাহ (সাঃ) যুবকদের লক্ষ্য করে বলেন) হে যুবকেরা! তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহের দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা রাখে, তাদের বিবাহ করা উচিত। কেননা বিবাহ দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। আর যে বিবাহের দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা রাখে না, তার উচিত (কামভাব দমনের জন্য) রোযা রাখা।” -(বুখারী, মুসলিম, মিশকাত) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরও বলেনঃ “তিন ব্যক্তিকে সাহায্য করা আল্লাহ তা’আলা নিজের দায়িত্ব মনে করেন। (১) ঐ খতদাতা ব্যক্তি, যে তার খতের মূল্য পরিশোধের চেষ্টা করে। (২) সে বিবাহিত যুবক, যে চরিত্রের হিফাজতের উদ্দেশে বিবাহ করে। (৩) সে মুজাহিদ, যে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে।” -(হাসানঃ আত-তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ, মিশকাত) হস্তমৈথুন এমনই একটি কাজ যার অর্থ নিজেকে কলুষিত করা। এটা একটা জঘন্য কলুষ বা পাপ বোধযুক্ত কাজ। হস্তমৈথুন এমনই গোপনীইয় পাপ যা মানুষ চোরের মত চুপিসারে করে এবং প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরও বলেনঃ “উত্তম চরিত্র হল পু্ন্য। আর যে কাজ তোমার মনে খটকা সৃষ্টি করে এবং লোকের কাছে প্রকাশ হওয়াকে তুমি পছন্দ কর না, তা হল পাপ।” -(মুসলিম, মিশকাত) অশালীন, অশোভনীয় ও অন্যায় কাজে মনে সঙ্কোচবোধ করার নাম হলো লজ্জা বা হায়া। যার লজ্জা নেই সে পারে হস্তমৈথুনে লিপ্ত হতে। লজ্জা বা হায়া সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ “লজ্জাশীলতা কল্যাণই বয়ে আনে । ” – [বুখারী ও মুসলিম] মুসলিমের এক বর্ণনায় এরূপ রয়েছেঃ “লজ্জাশীলতার পুরোটাই কল্যাণময়।

ইসলামের দৃষ্টিতে হস্তমৈথুনের খতিকারক দিক সমুহ:
ইসলামের দৃষ্টিতে এটা হারাম এবংকবীরা গুনাহ। শরীয়ত অনুযায়ী যারা
হস্তমৈথুন করে তারা সীমালংগনকারী ।শারীরিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা
হয়েছে। পুরুষ হস্তমৈথুন করলে প্রধান  যে্সব সমস্যায় ভুগতে পারে তার মধ্যে একটি হল
[১ ] পুরুষ হস্তমৈথুন করতে থাকলে সে
ধীরে ধীরে নপুংসক (Impotent) হয়ে
যায়। অর্থাৎ যৌন সংগম স্থাপন করতে
অক্ষম হয়ে যায় ।[২] আরেকটি সমস্যা হল অকাল
বীর্যপাত। ফলে স্বামী তার স্ত্রীকে
সন্তুষ্ট করতে অক্ষম হয় । বৈবাহিক
সম্পর্ক বেশিদিন স্থায়ী হয় না ।[৩ ] অকাল বীর্যপাত হলে বীর্যে
শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যায় । তখন বীর্যে
শুক্রাণুর সংখ্যা হয় ২০মিলিয়নের কম ।।
যার ফলে সন্তান জন্মদানে ব্যর্থতার
দেখা দেয় ।
(যে বীর্য বের হয় সে বীর্যে শুক্রাণুর
সংখ্যা হয় ৪২ কোটির মত ।
স্বাস্থ্যবিজ্ঞান মতে কোন পুরুষের থেকেযদি ২০ কোটির কম শুক্রাণু বের হয় তাহলে সে পুরুষ থেকে কোন সন্তান হয়না। )[৪ ] । অতিরিক্ত হস্তমৈথুন পুরুষে যৌনাঙ্গকে দুর্বল করে দেয় ।Dr.Liu বলেন –

“There is a huge change in body
chemistry when one
masturbates excessively”
আর শরীরের অন্যান্য যেসব ক্ষতি হয়-
১ ) Nervous system, heart, digestive
system, urinary system এবং আরো
অন্যান্য system ক্ষতিগ্রস্ত হয় । পুরো
শরীর দুর্বল হয়ে যায় এবং শরীর রোগ –
বালাইয়ের যাদুঘর হয়ে যায় ।
২ ) চোখের ক্ষতি হয় ।৩ ) স্মরণ শক্তি কমে যায় ।৪ ) মাথা ব্যথা হয় ইত্যাদি আরো অনেক
সমস্যা হয় হস্তমৈথুনের কারণে।
৫ ) আরেকটি সমস্যা হল Leakage of semen। অর্থাৎ সামান্য উত্তেজনায়
যৌনাঙ্গ থেকে তরল পদার্থ বের হয় । ফলে অনেক মুসলিম ভাই নামায পড়তে
পারেন না ।মহান আল্লাহ্ তা’ আলার স্মরণ থেকে মুসলিমদের দূরে রাখে
হস্তমৈথুন।রসূলুল্লাহ্ ( সঃ ) বলেছেন-“যে ব্যক্তি আমাকে তার দুই চোয়ালের
মধ্যবর্তী জিনিস (জিহ্বার) এবং দুইপায়ের মধ্যবর্তী জিনিস (যৌনাঙ্গের)
নিশ্চয়তা (সঠিক ব্যবহারের) দেবে আমি তার বেহেশতের নিশ্চয়তা দিব । ” –
(বুখারী ও মুসলিম)

Monday, 19 March 2018

নাপাক বস্তু পবিত্র করবেন কীভাবে?

নাপাক বস্তু পবিত্র করবেন কীভাবে?


শরীরে নাজাসাতে হাকীকী (বড় নাপাকি) লাগলে তিনবার ধুয়ে দিলেই ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে পবিত্র হয়ে যায়। শরীরে নাপাক তেল অথবা অন্য কোনো তৈলাক্ত কিছু মালিশ করা হলে, শুধু তিনবার ধুয়ে ফেললেই শরীর পবিত্র হয়ে যাবে। তৈলাক্ততা দূর করা অবশ্যক নয়। যদি নাপাক রক্তে শরীর বা চুল রাঙানো হয়, তাহলে এতটুকু ধুয়ে ফেললে যথেষ্ট হবে যাতে পরিষ্কার পানি বের হয়। রঙ তুলে ফেলার দরকার নেই। [তাফসিরে বায়যাবি, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৭৯]

মোজা, জুতা অথবা চামড়ার তৈরী অন্যান্য জিনিস যদি নাপাক হয়ে যায় আর নাপাকি জমাটবাঁধা ঘন হয় (যেমন গোবর, পায়খানা, রক্ত, বীর্য প্রভৃতি) তাহরে নাপাকি ঘষে তুললে পবিত্র হয়ে যাবে। আর নাপাকি যদি তরল হয় এবং শুকিয়ে যায় দেখা না যায়, তাহলে না ধোয়া পর্যন্ত পবিত্র হবে না। ধৌত করার নিয়ম এই যে, প্রত্যেক বার ধোয়ার পর এতটা বিলম্ব করতে হবে যেন পানি টপকানো বন্ধ হয়ে যায়। এভাবে তিনবার ধুতে হবে। [ফতওয়ায়ে আলমগিরি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৪; হিদায়া, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৭২]

কাপড়ে নাপাকি লাগলে তিনবার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে এবং প্রত্যেকবার ভালো করে চাপ দিয়ে নিংড়াতে হবে। ভালো করে নিংড়িয়ে ধোয়ার পরও যদি দুর্গন্ধ থেকে যায় কিংবা দাগ থাকে তাতে কোনো দোষ নেই। এতেই কাপড় পবিত্র হয়ে যাবে। নাপাকি যদি এমন জিনিসে লাগে যা নিংড়ানো যায় না (যেমন খাট, পালং, মাদুর, পাটি, চাটাই, মাটির পাত্র, কলস, বাসন, চীনা মাটির বরতন, পেয়ালা, বোতল ইত্যাদি) তবে তা পবিত্র করা নিয়ম হলো, একবার ধুয়ে এমনভাবে রাখতে হবে যেন সমস্ত পানি ঝরে যায়। পানি ঝরা বন্ধ হলে আবার ধুবে। এরূপ তিনবার ধুয়ে নিলে পবিত্র হয়ে যাবে। [বেহেশতি জিওর, উর্দূ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৭৭]


দুই পাল্লা বিশিষ্ট কাপড়ের এক পাল্লা যদি পবিত্র ও অপর পাল্লা অপবিত্র হয়, আর ঐ পবিত্র পাল্লার উপর নামাজ আদায় করলে নামাজ আদায় করা জায়িজ হবে। [বেহেশতি জিওর, উর্দূ, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৮০]

অপবিত্র মাটি শুকিয়ে গেলেই তা পবিত্র হয়ে যাবে। এমন মাটিতে নামাজ আদায় করা যাবে, তবে তা দিয়ে তায়াম্মুম করা জায়িজ হবে না। [ফতওয়ায়ে আলমগিরি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৪; হিদায়া, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৭৪]

মাটি থেকে উদগত ধান, শস্য গাছের চারা নাপাক হওয়ার পর তা শুকিয়ে গেলে তা পবিত্র হয়ে যায়। চুনসুরকী বা সিমেন্ট, বালি দিয়ে গাঁথা ইট নাপাক হলে তা শুকিয়ে গেলে পবিত্র হয়ে যাবে। [ফতওয়ায়ে আলমগিরি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৪] আর গাঁধুনি ছাড়া বিছানো আলগা ইট নাপাক হলে তা ধুয়ে পবিত্র করতে হবে।

নাপাক মাটি দ্বারা হাঁড়ি পাতিল বানালে কাঁচা থাকা পর্যন্ত নাপাক থাকবে তবে আগুনে পোড়াবার সাথে সাথে তা পবিত্র হয়ে যাবে। [ফতওয়ায়ে আলমগিরি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৪]

যে জমিন গোবর দ্বারা লেপা হয় তা নাপাক। তার উপর পবিত্র বিছানা না বিছালে নামাজ হবে না। তবে লেপা গোবর ভালোভাবে শুকিয়ে গেলে তার উপর এমনকি ভিজা কাপড় বিছিয়ে নামাজ আদায় করাও জায়িজ। অবশ্য কাপড় যদি এত বেশি ভিজা হয় যে এতে গোবর লেগে যাবার সম্ভাবনা থাকে তাহলে নামাজ হবে না। [বেহেশতি জিওর, উর্দূ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৮৯]

Tuesday, 13 February 2018

মাতা-পিতার দায়িত্ব ও সন্তানের করণীয়

শিশুই হল, দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ। শিশুদের বাল্য কালের শিক্ষা-দীক্ষা যদি ভালো হয়, তবে তাদের আগামী দিন ও ভবিষ্যৎ ভালো হবে। তাতে দেশ, জাতি ও সমাজ তাদের দ্বারা হবে লাভবান ও উপকৃত। এ জন্য শিশুদের শিক্ষা, তালীম, তরবিয়ত ও তাদের চরিত্রবান করে ঘড়ে তোলার প্রতি গুরুত্ব দেয়া, অধিক গুরুত্বপূর্ণ।মাতা-পিতার সাথে সৎ ব্যবহার করা, তাদের খেদমত করা ইত্যাদি বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। শিশুরা কীভাবে ওজু, গোসল, তায়াম্মুম ও সালাত আদায় করবে, তাও তিনি এ রিসালাটিতে আলোচনা করেছেন। এ ছাড়াও শিশুরা যখন বড় হতে থাকবে, তখন মাতা-পিতার করণীয় কি এবং মাতা-পিতার প্রতি তাদের দায়িত্ব কি হওয়া উচিত; তার একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তিনি তুলে ধরেছেন। আশা করি পাঠকগণ রিসালাটি পাঠ করে উপকৃত হবেন। যদি একজন পাঠকও এ রিসালাটি পড়ে উপকৃত হন, তাহলে আমি ধরে নিব আমার এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা আমার নাজাতের জন্য যথেষ্ট হবে। যেকোনো কাজ করতে গেলেই ভুল-ভ্রান্তি হওয়াই স্বাভাবিক।

জীবনের শুরুতেই শিশুদের ঈমান ও ইসলামের রোকনসমূহ তালীম দিতে হবে, যাতে তারা বড় হয়ে, তা হতে দূরে সরে না যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি:

 “এ কথার সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোন হক ইলাহ নাই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল।” অর্থাৎ, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোন ইলাহ নাই আর আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে মুহাম্মদ এর আনুগত্য করা ওয়াজিব।

“সালাত কায়েম করা” : সালাতের আরকান ও ওয়াজিবসমূহ সহ খুশুর সাথে সালাত আদায় করা।

 “যাকাত প্রদান করা” : যদি কোন মুসলিম তার মৌলিক প্রয়োজনের বাইরে ৮৫ গ্রাম স্বর্ণ বা তার সমপরিমাণ অর্থের মালিক হয়, তাহলে তার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে যখন তার এ সম্পদের উপর এক বছর অতিবাহিত হয়; তখন তাকে শতকরা ২.৫ টাকা যাকাত দিতে হবে। এ-ছাড়াও আরও অনেক সম্পদ আছে যেগুলোর উপর যাকাত ওয়াজিব হয়। সে সব সম্পদের যাকাত শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত হারে প্রদান করতে হয়।

“বায়তুল্লাহর হজ করা” : হজ তার উপর ফরয হবে, যে হজ করার সামর্থ্য রাখে।

 “রমযানের রোজা রাখা:” রোজা বলতে আমরা বুঝি, নিয়ত সহকারে ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খানা-পিনা ও রোজার পরিপন্থী সবধরনের কাজ হতে বিরত থাকা।

 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

“তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমাদের সন্তানদের বিষয়ে ইনসাফ কর।” [বুখারী, মুসলিম]
অর্থাৎ, তোমাদের সন্তানদের বিষয়ে তাদের ধন-সম্পত্তিতে, অনুদানের ক্ষেত্রে ও যাবতীয় সব বিষয়ে তুমি ইনসাফ কর।

 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,اً

“প্রতিটি নবজাত শিশু ফিতরাত তথা ইসলামের উপর জন্মগ্রহণ করে, তারপর তার পিতা তাকে ইয়াহুদি বানায়, খ্রিষ্টান বানায়, অথবা অগ্নি-উপাসক বানায়। যেমন, চতুষ্পদ জন্তু সে একটি জন্তু জন্ম দেয়, কিন্তু তার মধ্যে কোনটিকেই তুমি কান কাটা দেখতে পাবে না।” [বুখারী]

 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ,

“কবিরা গুনাহের একটি বড় ধরনের কবিরা গুনাহ হল, কোন লোক তার মাতা-পিতাকে গালি দেওয়া। যেমন, সে কোন লোকের পিতাকে গালি দিল, তখন লোকটিও তার পিতাকে গালি দিল অথবা সে অন্যের মাকে গালি দিল এবং সে লোকও তার মাকে গালি দিল।” [বুখারী, মুসলিম]

বিবাহ বৈধ এমন নারীর সাথে করমর্দন করা যাবে কিনা?

নিঃসন্দেহে এটা হাতের যিনা। যেমন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “দুচোখ যিনা করে, দুহাত যিনা করে, দুপা যিনা করে এবং লজ্জাস্থানও যিনা করে”। [মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ৩৯১২; সহীহুল জামে, হাদীস নং ৪১২৬

আজকের সমাজে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা অবারিতভাবে চলছে। ফলে অনেক নারী-পুরুষই নিজেকে আধুনিক হিসাবে যাহির করার জন্য শরী‘আতের সীমালংঘন করে পরস্পরে মুসাফাহা করছে। তাদের ভাষায় এটা হ্যান্ডশেক বা করমর্দন। আল্লাহর নিষেধকে থোড়াই কেয়ার করে বিকৃত রূচি ও নগ্ন সভ্যতার অন্ধ অনুকরণে তারা এ কাজ করছে এবং নিজেদেরকে প্রগতিবাদী বলে যাহির করছে। আপনি তাদেরকে যতই বুঝান না কেন বা দলীল-প্রমাণ যতই দেখান না কেন তারা তা কখনই মানবে না। উল্টো আপনাকে প্রতিক্রিয়াশীল, সন্দেহবাদী, মোহাচ্ছন্ন, আত্মীয়তাছিন্নকারী ইত্যাদি বিশেষণে আখ্যায়িত করবে।

চাচাত বোন, ফুফাত বোন, মামাত বোন, খালাত বোন, ভাবী, চাচী, মামী প্রমুখ আত্মীয়ের সঙ্গে মুসাফাহা করা তো এসব লোকদের নিকট পানি পানের চেয়েও সহজ কাজ। শরী‘আতের দৃষ্টিতে কাজটি কত ভয়াবহ তা যদি তারা দূরদৃষ্টি দিয়ে দেখত তাহলে কখনই তারা এ কাজ করত না। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয় তোমাদের কারো মাথায় লোহার পেরেক ঠুকে দেওয়া ঐ মহিলাকে স্পর্শ করা থেকে অনেক শ্রেয়, যে তার জন্য হালাল নয়”। [ত্বাবরাণী; সিলসিলা সহীহাহ, হাদীস নং ২২৬।]

নিঃসন্দেহে এটা হাতের যিনা। যেমন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “দুচোখ যিনা করে, দুহাত যিনা করে, দুপা যিনা করে এবং লজ্জাস্থানও যিনা করে”। [মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ৩৯১২; সহীহুল জামে, হাদীস নং ৪১২৬]

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অধিক পবিত্র মনের মানুষ আর কে আছে? অথচ তিনি বলেছেন, “আমি নারীদের সাথে মুসাফাহা করি না”। [মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ২৭৫৩; সহীহুল হাদীস, হাদীস নং ২৫৯০]

তিনি আরও বলেছেন, “আমি নারীদের হাত স্পর্শ করি না”। [ত্বাবরাণী; কাবীর, ২৪/৩৪২; সহীহুল জামে‘, হাদীস নং ৭০৫৪]

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেছেন, “আল্লাহর শপথ, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাত কখনই কোনো বেগানা নারীর হাত স্পর্শ করে নি। তিনি মৌখিক বাক্যের মাধ্যমে তাদের বায়আত নিতেন”। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮৬৬]

সুতরাং আধুনিক সাজতে গিয়ে যারা নিজেদের বন্ধুদের সাথে মুসাফাহা না করলে স্ত্রীদের তালাক দেওয়ার হুমকি দেয় তারা যেন হুঁশিয়ার হয়। জানা আবশ্যক যে, মুসাফাহা কোনো আবরণের সাহায্যে হোক বা আবরণ ছাড়া হোক উভয় অবস্থাতেই হারাম।

শাইখ মুহাম্মাদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ

Monday, 12 February 2018

বিয়ের ক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ

বিয়ের ক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ ছিল সহজ করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা। বিয়ের ঘোষণা দেয়া ও বিয়ের খবর প্রচার করা। খুশি ও আনন্দ প্রকাশ করা। ওয়ালিমা বা বৌভাতের আয়োজন করা ও দাওয়াত দেয়া। দাওয়াতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদেরকে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এমনকি কেউ রোযা থাকলে তবুও তিনি হাযির হয়ে নিমন্ত্রণকারীর জন্য দোয়া করবেন; তবে খাবার গ্রহণ করা অপরিহার্য নয়।
এরপর স্বামী-স্ত্রী সৎভাবে সংসার করবে এবং সদভাবে সংসার করার যাবতীয় উপকরণ গ্রহণ করবে।
সংক্ষিপ্তভাবে এটাই নবীজির আদর্শ; এবার বিস্তারিত আলোচনায় আসুন:
এক: মোহরানা সাধ্যের মধ্যে হওয়া
বাইহাকী (১৪৭২১) বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “সর্বোত্তম মোহরানা হচ্ছে- সহজসাধ্য মোহরানা”। একই হাদিস আবু দাউদ (২১১৭) বর্ণনা করেছেন এ ভাষায়: “সর্বোত্তম বিবাহ হচ্ছে- সহজসাধ্য মোহরানা”[আলবানী হাদিসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন]
আউনুল মাবুদ গ্রন্থে বলা হয়েছে-
أيسره শব্দের অর্থ হচ্ছে- মোহরানা ও অন্যান্য খরচ কমানো, যাতে করে পুরুষের জন্য সহজসাধ্য হয়। আল্লামা শাইখ আল-আযিযি বলেন: “মোহরানার পরিমাণ কম হওয়া কিংবা এমন হওয়া যাতে করে পাত্রের জন্য প্রস্তাব গ্রহণ করা সহজ হয়”[সমাপ্ত]
ইমাম আহমাদ (২৩৯৫৭) ও ইবনে হিব্বান (৪০৯৫) আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “কনের বরকতের আলামত হচ্ছে- বিয়ের প্রস্তাবনা সহজ হওয়া, মোহরানা সহজসাধ্য হওয়া এবং গর্ভ ধারণ সহজ হওয়া।”[‘সহিহুল জামে’ (২২৩৫) গ্রন্থে আলবানী হাদিসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন]
সুনানে তিরমিযি গ্রন্থে (১১১৪) ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: “সাবধান, তোমরা নারীদের মোহরানা নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে না। যদি মোহরানা নিয়ে বাড়াবাড়ি করা দুনিয়াতে সম্মানের বিষয় হত কিংবা আল্লাহর কাছে তাকওয়া হত তাহলে তোমাদের নবী তা করতেন। আমার জানামতে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে নারীদেরকে বিয়ে করেছেন কিংবা তাঁর মেয়েদেরকে বিয়ে দিয়েছেন তাদের কারো মোহরানা ১২ উকিয়ার বেশি ছিল না।[আলবানী হাদিসটিকে সহিহুত তিরমিযি গ্রন্থে ‘সহিহ’ আখ্যায়িত করেছেন]
এক উকিয়া হচ্ছে- ৪০ দিরহাম। গ্রামের হিসেবে দিরহামের ওজন হচ্ছে- ২.৯৭৫ গ্রাম।
দুই: বিয়ের ঘোষণা দেয়া
তিরমিযি (১০৮৯) আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তোমরা এ বিয়ের ঘোষণা দাও”[আলবানী তাঁর ‘ইরওয়াউল গালিল’ গ্রন্থে (৭/৫০) হাদিসটিকে ‘হাসান’ আখ্যায়িত করেছেন]
নাসাঈ (৩৩৬৯) মুহাম্মদ বিন হাতেব (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “হালাল ও হারামের মাঝে ব্যবধান হচ্ছে- বিয়েতে দফ বাজানো ও চেঁচামেচি করা”[আলবানী হাদিসটিকে ‘হাসান’ আখ্যায়িত করেছেন]
বিয়েতে দফ বাজানো নারীদের জন্য খাস।
ইবনে হাজার তার ফাতহুল বারী গ্রন্থে বলেন: “মজবুত হাদিসগুলোতে দফ বাজানোর যে অনুমতি এসেছে সেটা নারীদের জন্য খাস। এ অনুমোদনের মধ্যে পুরুষেরা অন্তর্ভুক্ত হবে না। যেহেতু সাধারণভাবে পুরষদেরকে নারীদের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে”[সমাপ্ত]
তিন: ওয়ালিমা বা বৌভাত
বিয়ের ক্ষেত্রে ওয়ালিমার আয়োজন করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। এটি বিয়ের প্রচারণার অন্তর্ভুক্ত এবং আনন্দ ও খুশি প্রকাশ করার শামিল।
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, আব্দুর রহমান বিন আউফ (রাঃ) যখন বিয়ে করেছেন তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেন: “একটি ছাগল দিয়ে হলেও তুমি ওয়ালিমার আয়োজন কর”[সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম]
মুসনাদে আহমাদের হাদিসের কারণে কোন কোন আলেম ওয়ালিমার আয়োজন করাকে ওয়াজিব বলেন। ইবনে বুরাইদা (রাঃ) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, আলী (রাঃ) যখন ফাতেমা (রাঃ) কে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “বিয়ের ক্ষেত্রে ওয়ালিমা বা ভোজানুষ্ঠান থাকতেই হবে।”[আলবানী তাঁর ‘আদাবুয যিফাফ’ নামক গ্রন্থে (৭২) বলেন: হাদিসটির সনদ যেমনটি বলেছেন ইবনে হাজার: কোন অসুবিধা নেই][সমাপ্ত]
ওয়ালিমার দাওয়াত পেলে উপস্থিত হওয়া ওয়াজিব। তোমাদের কাউকে যখন ওয়ালিমার দাওয়াত দেয়া হয় তখন সে যেন সে দাওয়াতে যায়”[সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম]
ইবনে উছাইমীন (রহঃ) বলেন:
আলেমগণ বলেন: বিয়ের প্রথম দাওয়াত কবুল করা ওয়াজিব। অর্থাৎ প্রথম ওয়ালিমার। যদি নিমন্ত্রণকারী কিংবা তার প্রতিনিধি কিংবা কার্ড পাঠানোর মাধ্যমে ব্যক্তিকে সুনির্দিষ্টভাবে দাওয়াত দেয়া হয়। তবে শর্ত হচ্ছে- এ অনুষ্ঠানে যেন শরিয়ত গর্হিত কোন কিছু না থাকে। আর যদি এ অনুষ্ঠানে শরিয়ত গর্হিত কোন কিছু থাকে তাহলে এর হুকুম ব্যাখ্যাসাপেক্ষ: যদি ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে এ গর্হিত কাজে নিষেধ করা সম্ভবপর হয় তাহলে এ ব্যক্তির জন্য উপস্থিত হওয়া ওয়াজিব। আর যদি উপস্থিত হয়ে এ গর্হিত কাজে বাধা দেয়া সম্ভবপর না হয় তাহলে এ ব্যক্তির জন্য উপস্থিত হওয়া নাজায়েয।

সৃষ্ট জীবের প্রতি দয়া করতে হবে

পৃথিবীর সবকিছু আল্লাহর সৃষ্টি। সব সৃষ্টির প্রতি দয়া করতে হবে। বিশেষ করে সৃষ্ট জীবের প্রতি দয়া করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জরুরি।

আল্লাহতায়ালা সেই বান্দাকে বেশি ভালোবাসেন যেই বান্দা সৃষ্ট জীবের প্রতি বেশি দয়াবান। প্রিয় নবী (সা.) সব সময় দয়া ও মেহেরবানির প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ মেহেরবান। তিনি মেহেরবানিকে পছন্দ করেন। মেহেরবানির জন্য তিনি যা দান করেন কঠোরতার জন্য তা দান করেন না। মেহেরবানি ব্যতীত অন্য কিছুতেই তা দান করেন না। মুসলিম শরিফ। অপর হাদিসে এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, রসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, আমি কি তোমাদের ওই ব্যক্তির সংবাদ দেব না যার ওপর দোজখের আগুন হারাম এবং যে ব্যক্তি দোজখের জন্য হারাম। সে হলো ওই ব্যক্তি যে ভদ্র, মিশুক এবং বিনম্র। আবু দাউদ, তিরমিজি। আরও এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বলেন, রসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, অনুগ্রহকারীদের প্রতি পরম করুণাময় অনুগ্রহ করে থাকেন। তোমরা দুনিয়াবাসীর ওপর অনুগ্রহ কর, এতে আসমানে অবস্থানকারী তোমাদের ওপর অনুগ্রহ করবেন। আবু দাউদ, তিরমিজি।

সৃষ্ট জীবের ওপর দয়া করার কারণে আল্লাহতায়ালা কঠিন গুনাহও মাপ করে দেন। এ বিষয়ে হাদিসে একটি ঘটনা এসেছে, হজরত আবু হোরায়রা (রা.) বলেন, রসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে চলছিল। তার খুব পিপাসা পেল। তারপর একটি কুয়া পেল। সে তাতে নেমে পানি পান করল। কুয়া থেকে উঠে দেখল, একটি কুকুর পিপাসায় বার বার জিভ বের করে কাদামাটি চাটছে। লোকটি মনে মনে বলল, পিপাসার কারণে আমার যে অবস্থা হয়েছিল কুকুরটিরও সেই অবস্থা হয়েছে। তারপর সে আবার কুয়ায় নেমে নিজের পা মুজায় পানি ভরে উপরে নিয়ে এলো এবং কুকুরটিকে পানি পান করাল। এই কারণে আল্লাহতায়ালা তাকে প্রতিদান দিলেন এবং তাকে মাফ করে দিলেন। সাহাবিরা আরজ করলেন, হে আল্লাহর রসুল, চতুষ্পদ প্রাণীর কারণেও কি আমাদের জন্য সওয়াব রয়েছে? রসুল (সা.) বললেন, হ্যাঁ, প্রত্যেক জীবন্ত প্রাণীর মধ্যেই সওয়াব রয়েছে। বোখারি ও মুসলিম।

প্রিয় পাঠক, সৃষ্ট জীবের প্রতি দয়া করা যেমন সওয়াবের কাজ তেমনি সৃষ্ট জীবকে কষ্ট দেওয়া গুনাহের কারণ। হজরত ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, এক মহিলা একটি বিড়ালের কারণে জাহান্নামে গেছে। কেননা সে তাকে বেঁধে রেখেছে আর কোনো খাবার দেয়নি। জমিনে পোকা-মাকড় খাওয়ার জন্য তাকে সে ছেড়ে দেয়নি। বোখারি ও মুসলিম।

আমরা যদি কারও উপকার করতে নাও পারি তাহলে যেন সবার সঙ্গে ভালো কথা বলি। কারণ, ভালো কথা বলার বিনিময়েও রয়েছে সওয়াব। এ বিষয়ে হজরত আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজী (সা.) বলেছেন, উত্তম কথাও সদকা। বোখারি। অর্থাৎ সদকা করলে যেই সওয়াব, উত্তম কথা বললেও সেই সওয়াব। মহান আল্লাহ যেন আমাদের সেই তৌফিক দান করেন। আমিন।

মাসিক চলাকালীন সময়ে কি স্ত্রী সহবাস করা যায়?

* মাসিকের সময় জরায়ু ও যোনির অম্লভাব থাকে না। তাই এটি খুব সহজেই রোগজীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে।
* মিলনের সময় এবং পরবর্তীতে প্রচন্ড ব্যথা হতে পারে।
* রক্তপাত তুলনামূলক ভাবে বেশি হতে পারে।
* দেহ অপবিত্র লাগে বিধায় মানসিক অরুচি সৃষ্টি হতে পারে।
* পুরুষ লিঙ্গে রক্ত লেগে যৌনমিলনে তার অরুচি জন্মাতে পারে।
* পুরুষের কোন রোগ (Sexual transmited disease) থাকলে এসময় অতিদ্রুত নারী যোনিতে ছড়িয়ে পড়ে।
* তেমনি নারীদেহেও কোন রোগ (Sexual transmited disease) থাকলে পুরুষ দেহে দ্রুত ছড়াতে পারে।
* জরায়ু মুখ ঘোরে যেতে পারে, যা পরবর্তীতে মারাত্মক কুফল বয়ে আনতে পারে।

ইসলামের দৃষ্টিতে এসময় যৌন মিলন হারাম। ইসলামের দৃষ্টিতে মাসিকের সময় যৌন মিলনঃ
পবিত্র কুরআ’ন এ আল্লাহ তায়ালা বলেন- “আর আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে হায়েয সম্পর্কে। বলে দেন, এটা অশুচি। কাজেই তোমরা হায়েয অবস্থায় স্ত্রীগণ থেকে বিরত থাকো এবং যতক্ষন না তারা পবিত্র হয়ে যায় ততক্ষণ তাদের নিকটবর্তী হবে না। যখন উত্তম রূপে পরিশুদ্ধ হয়ে যায়, তখন গমন কর তাদের কাছে, যে ভাবে আল্লাহ হুকুম দিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারী এবং যারা অপবিত্রতা হতে বেঁচে থাকে তাদেরকে পছন্দ করেন।” (বাকারা/আয়াত-২২২)
সুতরাং স্বামীর জন্য জায়েয হবে না স্ত্রী সহবাস করা যতক্ষন না স্ত্রী হায়েয থেকে মুক্ত হয়ে গোসল করে পবিত্র হয়।
হায়েয অবস্থায় স্ত্রী সহবাস যে একটি গর্হিত ও হারাম কাজ রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম) এর হাদিস থেকেও তার প্রমান পাওয়া যায়।
আমাদের প্রানপ্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) বলেছেন- “যে ব্যাক্তি হায়েয অবস্থায় সহবাস করে বা পিছনের রাস্তা দিয়ে স্ত্রীর সাথে মিলন করে কিংবা কোন গণকের কাছে গমন করে, তবে সে আমার নিকট যা অবতীর্ণ হয়েছে তা অস্বীকার করল।” [তিরমিযী]
বর্তমান চিকিতসা বিজ্ঞান বলছে যে, মাসিক অবস্থায় মেয়েদের জরায়ু থেকে যে স্রাব আসে, তাতে রয়েছে বিষাক্ত কিছু যৌগ। তাই পুরুষদের সিফিলিস, গোনোরিয়া, লিংগ ছোট হয়ে যাওয়া, লিংগ বিকৃতিসহ নানা রোগের কারন মাসিক অবস্থায় সহবাস করা।
ডিম্বানু ভেঙ্গে তা মাসিকের স্রাবের সাথে বেরিয়ে যায়। মাসিকের সময় কোন ডিম্বানু থাকে না। যারা মনে করে মাসিকের সময় সহবাস না করলে সন্তান হয় না, এটা তাদের চরম মুর্খতা। তবে কখনো কখনো মাসিকের সময় ডিম্বানু গঠিত হয়, যদিও এটা বিরল।
মাসিকের সময় একটি মেয়ে খুবই অসুস্থ থাকে, এর সাথে থাকে অসহ্যকর ব্যাথা-বেদনা, বমি বমি ভাব, মাথা ব্যাথা। এই অবস্থায় তার সাথে সহবাস করা, তার উপর অমানবিক জুলুম ছাড়া আর কিছুই নয়।


রক্তস্রাব চলাকালীন স্ত্রী সহবাস করা স্বামীর জন্য যেমন হারাম ঠিক তেমনি ঐ অবস্থায় স্বামীকে মিলনের সুযোগ দেয়াও স্ত্রীর জন্য হারাম। এ হুকুমটি সরাসরি পবিত্র কুরআনের আয়াত দ্বারা প্রমাণিত। মহান আল্লাহ বলেন:
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُواْ النِّسَاء فِي الْمَحِيضِ وَلاَ تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّىَ يَطْهُرْنَ ২২২) سورة البقرة
"তারা তোমাকে হায়েয সম্পর্কে প্রশ্ন করে, তুমি বলে দাও যে, এটা কষ্টদায়ক বস্তু, কাজেই তোমরা হায়েয অবস্থায় স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাক এবং ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের নিকট যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা পবিত্র না হয়।" [সূরা আল-বাকারাহ: ২২২]
উক্ত আয়াতে মাহীয) শব্দ দ্বারা হায়েযের সময় এবং লজ্জাস্থানকে বুঝানো হয়েছে। এভাবে হাদীস দ্বারাও বিষয়টি প্রমাণিত। প্রিয় নবী সা. বলেছেন: স্ত্রী সহবাস ছাড়া বাকী সব কিছু করতে পার।)) [মুসলিম]
সম্মানিত পাঠক-পাঠিকা! আমাদেরকে স্মরণ রাখতে হবে যে, রক্তস্রাব অবস্থায় স্ত্রী সহবাস হারাম হওয়ার ব্যাপারে সমস্ত মুসলমান একমত। এখানে কারো কোন রকম দ্বিমত নেই। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলা এবং পরকালের প্রতি ঈমান রাখে তার জন্য এমন একটি অসৎ কাজে লিপ্ত হওয়া কোনভাবেই বৈধ হবে না, যার উপর কুরআন, সুন্নাহ এবং মুসলমানদের সর্ব সম্মত সিদ্ধান্ত কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর পরও যারা এ অবৈধ কাজে লিপ্ত হবে তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ কারীদের অন্তর্ভুক্ত এবং মু'মিনদের মতাদর্শের পরিপন্থী পথের অনুসারী হিসেবে সাব্যস্ত হবে।
আল-মাজমূ' শারহুল মুহায্‌যাব ২য় খন্ডের ৩৭ নং পৃষ্ঠায় ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে, ঋতুস্রাব চলাকালে যে ব্যক্তি স্ত্রী সঙ্গমে লিপ্ত হবে তার কবীরা গুনাহ হবে। আমাদের ওলামায়ে কেরাম যেমন ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: যে ব্যক্তি হায়েয অবস্থায় স্ত্রী মিলনকে হালাল মনে করবে সে কাফের হয়ে যাবে।
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার যিনি পুরুষের জন্য ঋতুস্রাব চলাকালীন সঙ্গম ব্যতীত স্ত্রীর সাথে এমন সব কাজ করাকে জায়েয করে দিয়েছেন যার মাধ্যমে স্বামী আপন কামোত্তেজনা নির্বাপিত করতে পারে। যেমন চুমু দেয়া, আলিঙ্গন করা এবং লজ্জাস্থান ছাড়া অন্যান্য অঙ্গের মাধ্যমে যৈবিক চাহিদা পূর্ণ করা। তবে নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ ব্যবহার না করাই উত্তম। কাপড় বা পর্দা জড়িয়ে আড়াল করে নিলে অসুবিধা নেই। কেননা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: নবী করীম সা. ঋতুস্রাব চলাকালীন আমাকে আদেশ করলে আমি ইযার পরতাম। তখন তিনি আমাকে আলিঙ্গন করতেন।))


মাসিক অবস্থায়ঃ
১) মাসিক অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করা হারাম।
২) মাসিক অবস্থায় স্ত্রীর নাভী থেকে হাঁটু পর্যন্ত দেখা বা স্পর্শ করা হারাম।
৩) মাসিক অবস্থায় নামায পড়া যাবে না এবং তার কাযা মাফ।
৪) মাসিক অবস্থায় রোযা রাখা যাবে না, কিন্তু তার কাযা আদায় করতে হবে।
৫) মাসিক অবস্থায় কুরআ’ন শরীফ স্পর্শ করা বা মুখে উচ্চারণ করা হারাম।
৬) মাসিক অবস্থায় স্ত্রীর সাথে শোয়া, তাকে চুম্বন কিংবা আলিঙ্গন করা জায়েয।
৭) মাসিক শেষ, কিন্তু গোসল করে নাই, এমতাবস্থায় সহবাস করা যাবে না।
৮) মাসিক তিন দিনের কম বা ১০ দিনের বেশি হলে ইস্তিহাযা। ইস্তিহাযা অবস্থায় নামায পড়তে হবে।
৯) মাসিক অবস্থায় কাবা ঘর তাওয়াফ করা ছাড়া হজ্বের অন্যান্য কাজ করা যায়।
এখানে খুবই সহজ কিছু মাসয়ালা দেয়া হলো। মাসিকের মাসয়ালার পরিসর অনেক বড়। মাসিকের মাসয়ালা সমূহ মনে রাখা অনেক কঠিন কাজ। শতকরা ৫ ভাগ মেয়েও সঠিক মাসয়ালা মানা দূরে থাক, জানেও না।

তবে কেউ যদি ভুলে, অনিচ্ছাকৃত এবং না জেনে তাহলে তার কোন গুনাহ হবে না। আর যদি ইচ্ছাকৃতভাবে করে থাকে তাহলে কাফফারা দিতে হবে। কাফফারার পরিমাণ একদিনার বা অর্ধ দিনার। কোনো কনো ফিকাহ বিদের মতে স্বামী দুটির যে কোন একটি দিতে পারবে। আবার কেউ কেউ বলেন মাসিকের প্রথম দিকে করলে ১ দিনার, শেষের দিকে বা মাসিক শেষ কিন্তু গোসল করে নি এমতাবস্থায় করলে অর্ধ দিনার। [কিতাবুল কাবার/ পৃষ্ঠা-৫৫]

মাসিক চলাকালীন সময়ে কি স্ত্রী সহবাস করা যায়?

* মাসিকের সময় জরায়ু ও যোনির অম্লভাব থাকে না। তাই এটি খুব সহজেই রোগজীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে।
* মিলনের সময় এবং পরবর্তীতে প্রচন্ড ব্যথা হতে পারে।
* রক্তপাত তুলনামূলক ভাবে বেশি হতে পারে।
* দেহ অপবিত্র লাগে বিধায় মানসিক অরুচি সৃষ্টি হতে পারে।
* পুরুষ লিঙ্গে রক্ত লেগে যৌনমিলনে তার অরুচি জন্মাতে পারে।
* পুরুষের কোন রোগ (Sexual transmited disease) থাকলে এসময় অতিদ্রুত নারী যোনিতে ছড়িয়ে পড়ে।
* তেমনি নারীদেহেও কোন রোগ (Sexual transmited disease) থাকলে পুরুষ দেহে দ্রুত ছড়াতে পারে।
* জরায়ু মুখ ঘোরে যেতে পারে, যা পরবর্তীতে মারাত্মক কুফল বয়ে আনতে পারে।

ইসলামের দৃষ্টিতে এসময় যৌন মিলন হারাম। ইসলামের দৃষ্টিতে মাসিকের সময় যৌন মিলনঃ
পবিত্র কুরআ’ন এ আল্লাহ তায়ালা বলেন- “আর আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে হায়েয সম্পর্কে। বলে দেন, এটা অশুচি। কাজেই তোমরা হায়েয অবস্থায় স্ত্রীগণ থেকে বিরত থাকো এবং যতক্ষন না তারা পবিত্র হয়ে যায় ততক্ষণ তাদের নিকটবর্তী হবে না। যখন উত্তম রূপে পরিশুদ্ধ হয়ে যায়, তখন গমন কর তাদের কাছে, যে ভাবে আল্লাহ হুকুম দিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারী এবং যারা অপবিত্রতা হতে বেঁচে থাকে তাদেরকে পছন্দ করেন।” (বাকারা/আয়াত-২২২)
সুতরাং স্বামীর জন্য জায়েয হবে না স্ত্রী সহবাস করা যতক্ষন না স্ত্রী হায়েয থেকে মুক্ত হয়ে গোসল করে পবিত্র হয়।
হায়েয অবস্থায় স্ত্রী সহবাস যে একটি গর্হিত ও হারাম কাজ রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম) এর হাদিস থেকেও তার প্রমান পাওয়া যায়।
আমাদের প্রানপ্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) বলেছেন- “যে ব্যাক্তি হায়েয অবস্থায় সহবাস করে বা পিছনের রাস্তা দিয়ে স্ত্রীর সাথে মিলন করে কিংবা কোন গণকের কাছে গমন করে, তবে সে আমার নিকট যা অবতীর্ণ হয়েছে তা অস্বীকার করল।” [তিরমিযী]
বর্তমান চিকিতসা বিজ্ঞান বলছে যে, মাসিক অবস্থায় মেয়েদের জরায়ু থেকে যে স্রাব আসে, তাতে রয়েছে বিষাক্ত কিছু যৌগ। তাই পুরুষদের সিফিলিস, গোনোরিয়া, লিংগ ছোট হয়ে যাওয়া, লিংগ বিকৃতিসহ নানা রোগের কারন মাসিক অবস্থায় সহবাস করা।
ডিম্বানু ভেঙ্গে তা মাসিকের স্রাবের সাথে বেরিয়ে যায়। মাসিকের সময় কোন ডিম্বানু থাকে না। যারা মনে করে মাসিকের সময় সহবাস না করলে সন্তান হয় না, এটা তাদের চরম মুর্খতা। তবে কখনো কখনো মাসিকের সময় ডিম্বানু গঠিত হয়, যদিও এটা বিরল।
মাসিকের সময় একটি মেয়ে খুবই অসুস্থ থাকে, এর সাথে থাকে অসহ্যকর ব্যাথা-বেদনা, বমি বমি ভাব, মাথা ব্যাথা। এই অবস্থায় তার সাথে সহবাস করা, তার উপর অমানবিক জুলুম ছাড়া আর কিছুই নয়।


রক্তস্রাব চলাকালীন স্ত্রী সহবাস করা স্বামীর জন্য যেমন হারাম ঠিক তেমনি ঐ অবস্থায় স্বামীকে মিলনের সুযোগ দেয়াও স্ত্রীর জন্য হারাম। এ হুকুমটি সরাসরি পবিত্র কুরআনের আয়াত দ্বারা প্রমাণিত। মহান আল্লাহ বলেন:
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُواْ النِّسَاء فِي الْمَحِيضِ وَلاَ تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّىَ يَطْهُرْنَ ২২২) سورة البقرة
"তারা তোমাকে হায়েয সম্পর্কে প্রশ্ন করে, তুমি বলে দাও যে, এটা কষ্টদায়ক বস্তু, কাজেই তোমরা হায়েয অবস্থায় স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাক এবং ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের নিকট যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা পবিত্র না হয়।" [সূরা আল-বাকারাহ: ২২২]
উক্ত আয়াতে মাহীয) শব্দ দ্বারা হায়েযের সময় এবং লজ্জাস্থানকে বুঝানো হয়েছে। এভাবে হাদীস দ্বারাও বিষয়টি প্রমাণিত। প্রিয় নবী সা. বলেছেন: স্ত্রী সহবাস ছাড়া বাকী সব কিছু করতে পার।)) [মুসলিম]
সম্মানিত পাঠক-পাঠিকা! আমাদেরকে স্মরণ রাখতে হবে যে, রক্তস্রাব অবস্থায় স্ত্রী সহবাস হারাম হওয়ার ব্যাপারে সমস্ত মুসলমান একমত। এখানে কারো কোন রকম দ্বিমত নেই। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলা এবং পরকালের প্রতি ঈমান রাখে তার জন্য এমন একটি অসৎ কাজে লিপ্ত হওয়া কোনভাবেই বৈধ হবে না, যার উপর কুরআন, সুন্নাহ এবং মুসলমানদের সর্ব সম্মত সিদ্ধান্ত কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর পরও যারা এ অবৈধ কাজে লিপ্ত হবে তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ কারীদের অন্তর্ভুক্ত এবং মু'মিনদের মতাদর্শের পরিপন্থী পথের অনুসারী হিসেবে সাব্যস্ত হবে।
আল-মাজমূ' শারহুল মুহায্‌যাব ২য় খন্ডের ৩৭ নং পৃষ্ঠায় ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে, ঋতুস্রাব চলাকালে যে ব্যক্তি স্ত্রী সঙ্গমে লিপ্ত হবে তার কবীরা গুনাহ হবে। আমাদের ওলামায়ে কেরাম যেমন ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: যে ব্যক্তি হায়েয অবস্থায় স্ত্রী মিলনকে হালাল মনে করবে সে কাফের হয়ে যাবে।
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার যিনি পুরুষের জন্য ঋতুস্রাব চলাকালীন সঙ্গম ব্যতীত স্ত্রীর সাথে এমন সব কাজ করাকে জায়েয করে দিয়েছেন যার মাধ্যমে স্বামী আপন কামোত্তেজনা নির্বাপিত করতে পারে। যেমন চুমু দেয়া, আলিঙ্গন করা এবং লজ্জাস্থান ছাড়া অন্যান্য অঙ্গের মাধ্যমে যৈবিক চাহিদা পূর্ণ করা। তবে নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ ব্যবহার না করাই উত্তম। কাপড় বা পর্দা জড়িয়ে আড়াল করে নিলে অসুবিধা নেই। কেননা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: নবী করীম সা. ঋতুস্রাব চলাকালীন আমাকে আদেশ করলে আমি ইযার পরতাম। তখন তিনি আমাকে আলিঙ্গন করতেন।))


মাসিক অবস্থায়ঃ
১) মাসিক অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করা হারাম।
২) মাসিক অবস্থায় স্ত্রীর নাভী থেকে হাঁটু পর্যন্ত দেখা বা স্পর্শ করা হারাম।
৩) মাসিক অবস্থায় নামায পড়া যাবে না এবং তার কাযা মাফ।
৪) মাসিক অবস্থায় রোযা রাখা যাবে না, কিন্তু তার কাযা আদায় করতে হবে।
৫) মাসিক অবস্থায় কুরআ’ন শরীফ স্পর্শ করা বা মুখে উচ্চারণ করা হারাম।
৬) মাসিক অবস্থায় স্ত্রীর সাথে শোয়া, তাকে চুম্বন কিংবা আলিঙ্গন করা জায়েয।
৭) মাসিক শেষ, কিন্তু গোসল করে নাই, এমতাবস্থায় সহবাস করা যাবে না।
৮) মাসিক তিন দিনের কম বা ১০ দিনের বেশি হলে ইস্তিহাযা। ইস্তিহাযা অবস্থায় নামায পড়তে হবে।
৯) মাসিক অবস্থায় কাবা ঘর তাওয়াফ করা ছাড়া হজ্বের অন্যান্য কাজ করা যায়।
এখানে খুবই সহজ কিছু মাসয়ালা দেয়া হলো। মাসিকের মাসয়ালার পরিসর অনেক বড়। মাসিকের মাসয়ালা সমূহ মনে রাখা অনেক কঠিন কাজ। শতকরা ৫ ভাগ মেয়েও সঠিক মাসয়ালা মানা দূরে থাক, জানেও না।

তবে কেউ যদি ভুলে, অনিচ্ছাকৃত এবং না জেনে তাহলে তার কোন গুনাহ হবে না। আর যদি ইচ্ছাকৃতভাবে করে থাকে তাহলে কাফফারা দিতে হবে। কাফফারার পরিমাণ একদিনার বা অর্ধ দিনার। কোনো কনো ফিকাহ বিদের মতে স্বামী দুটির যে কোন একটি দিতে পারবে। আবার কেউ কেউ বলেন মাসিকের প্রথম দিকে করলে ১ দিনার, শেষের দিকে বা মাসিক শেষ কিন্তু গোসল করে নি এমতাবস্থায় করলে অর্ধ দিনার। [কিতাবুল কাবার/ পৃষ্ঠা-৫৫]

দিনের বেলায় স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করার বিধান কি?


ইসলাম ধর্মে দিনের  বেলা স্ত্রীর সঙ্গে সহবাসের
কোনো নিষেধ নেই।
তবে রমজান মাসে দিনের বেলায় যে ব্যক্তি
যৌনমিলন করে তিনি মুকীম (নিজ অঞ্চলে
অবস্থানকারী) রোযাদার হলে তার উপর বড়-
কাফ্ফারা (আল কাফ্ফারাতুল মুগাল্লাযাহ)
ওয়াজিব হয়। আর তা হল একজন দাস মুক্ত করা। যদি
তা না পায় তাহলে একাধারে দুইমাস সিয়াম পালন
করা। আর যদি তাও না পারে তবে ৬০ জন মিসকীনকে
খাওয়ানো।

ঈদুল আযহার ইতিহাস, তাৎপর্য ও শিক্ষা

মুসলমানদের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ উৎসব ঈদুল আযহা বা
কোরবানির ঈদ। পবিত্র কুরআনে কুরবানীর বদলে
‘কুরবান’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। হাদীছেও ‘কুরবানী’
শব্দটি ব্যবহৃত না হয়ে এর পরিবর্তে ‘উযহিয়াহ’ ও
‘যাহিয়া’ প্রভৃতি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। আর এজন্যই
কুরবানীর ঈদকে ‘ঈদুল আযহা’ বলা হয়। আর আযহা
শব্দটি আরবীতে ‘কুরবান’ (ﻗﺮﺑﺎﻥ ) ফারসী বা ঊর্দূতে
‘কুরবানী’ রুপে পরিচিত হয়েছে, যার অর্থ ‘নৈকট্য’।
পারিভাষিক অর্থে ﺗَﻌَﺎﻟَﻲ ﺍﻟﻘﺮﺑﺎﻥُ ﻣﺎَ ﻳُﺘﻘَﺮَﺏُ ﺑِﻪِ ﺇِﻝَ ﺍﻟَّﻠﻪِ
‘কুরবানী’ ঐ মাধ্যমকে বলা হয়, যার দ্বারা আল্লাহর
নৈকট্য হাছিল হয়। প্রচলিত অর্থে, ঈদুল আযহার দিন
আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে শারঈ তরীকায়
যে পশু যবহ করা হয়, তাকে ‘কুরবানী’ বলা হয়। সকালে
রক্তিম সূর্য উপরে ওঠার সময়ে ‘কুরবানী’ করা হয় বলে
এই দিনটিকে ‘উয়াওমুল আযহা’ বলা হয়ে থাকে। যদিও
কুরবানী সারাদিন ও পরের দুদিন করা য়ায়। আর
কোরবানির শাব্দিক অর্থ ত্যাগ। জিলহজ্ব মাসের দশ
তারিখে পরম ত্যাগের নির্দেশনা স্বরূপ বিশ্ব মুসলিম
মহাসমারোহে হজের অন্যতম অংশ পশু জবাইয়ের
মাধ্যমে কোরবানি/ ঈদুল আযহা উৎসব পালন করে।
সুতরাং ত্যাগের মাধ্যমে মহান আল্লাহ তাআলার
নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে মুসলমান জাতি যে উৎসবে
মিলিত হয় তাই ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ।
কোরবানি মুসলিম জাতির একটি ঐতিহ্য হওয়ায় এর
গুরুত্ব অপরিসীম। এ কারণেই রাসুল (সা) সব সময়
কোরবানি করেছেন। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও
কোরবানি বর্জনকারী ব্যক্তির প্রতি তিনি
সতর্কবানী উচ্চারণ করেন। রাসুল(সা) বলেন, যে
ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না
সে যেন আমাদের ঈদগাঁয়ে না আসে।

কুরবানীর ইতিহাস:
কুরবানীর ইতিহাস ততোটাই প্রাচীন যতোটা প্রাচীন
মানব অথবা ধর্মের ইতিহাস। আল্লাহ রাহে কুরবানী
মানব জাতির প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত সকল শরীয়তেই
কার্যকর ছিলো। সকল নবীর উম্মতকেই কুরবানী করতে
হয়েছে। প্রত্যেক উম্মতের ইবাদতের এ ছিল একটা
অপরিহার্য অংশ। আল্লাহতায়ালার এ বিধান মানব
জাতির সৃষ্টি লগ্ন থেকেই কার্যকর হয়ে আসছে।
মানব সভ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাস এটাই সাক্ষ্য দেয় যে,
পৃথিবীর সব জাতি ও সম্প্রদায় কোন না কোন ভাবে
আল্লাহর দরবারে নিজেদের প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করে ।
এটাই মানুষের চিরন্তন স্বভাব বা ফিতরাত। এ
ফিতরাতের স্বীকৃতি প্রদান করে মহান আল্লাহ
তায়ালা সুস্পষ্ট ভাবে ঘোষণা করেছেন ঃ
ﻭَﻟِـﻜُﻞِّ ﺍُﻣَّﺔٍ ﺟَﻌَـﻠْـﻨَﺎ ﻣَﻨْﺴَﻜًﺎ ﻟِّـﻴَـﺬْﻛُﺮُﻭْﺍ ﺍﺳْﻢَ ﺍﻟﻠﻪِ ﻋَﻠﻰ ﻣَـﺎ ﺭَﺯَﻗَـﻬُﻢْ ﻣِﻦْ ﺑَـﻬِﻴـْﻤَﺔِ
ﺍﻟْﺎَﻧْـﻌَـﺎﻡِ
“আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কুরবানীর এক বিশেষ
রীতি পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছি, যেন তারা ওসব
পশুর উপর আল্লাহর নাম নিতে পারে যে সব আল্লাহ
তাদেরকে দান করেছেন”। (সূরা আল হজ্জ-৩৪)

মানব ইতিহাসের সর্ব প্রথম কুরবানী : মানব
ইতিহাসের সর্বপ্রথম কুরবানী হযরত আদম আ. এর
দু’পুত্র হাবিল ও কাবিলের কুরবানী। এ ঘটনাটি
বিশুদ্ধ ও শক্তিশালী সনদ সহ বর্ণিত হয়েছে। ইবনে
কাসীর একে ওলামায়ে মোতাকাদ্দেমীন ও
ওলামায়ে মোতায়াখ্খেরীনের সর্ব সম্মত উক্তি বলে
আখ্যা দিয়েছেন। ঘটনাটি এই : যখন আদম ও হাওয়া
আ. পৃথিবীতে আগমন করেন এবং সন্তান প্রজনন ও
বংশ বিস্তার আরম্ভ হয়, তখন প্রতি গর্ভ থেকে একটি
পুত্র ও একটি কন্যা এরূপ যমজ সন্তান জন্ম গ্রহণ করত।
তখন এক শ্রেণীর ভাই বোন ছাড়া হযরত আদমের আর
কোন সন্তান ছিলনা। অথচ ভাই বোন বিবাহ বন্ধনে
আবদ্ধ হতে পারে না। তাই মহান আল্লাহ উপস্থিত
প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে আদম আ. এর শরীয়তে
বিশেষ ভাবে এ নির্দেশ জারি করেন যে, একই গর্ভ
থেকে যে যমজ পুত্র ও কন্যা জন্ম গ্রহণ করবে, তারা
পরস্পর সহোদর ভাই-বোন গণ্য হবে। সুতরাং তাদের
মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হবে। কিন্তু পরবর্তী
গর্ভ থেকে জন্ম গ্রহণকারী পুত্রের জন্য প্রথম গর্ভ
থেকে কন্যা সহোদরা বোন গণ্য হবে না। তাই তাদের
পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বৈধ হবে। কিন্তু
ঘটনাক্রমে কাবিলের সহজাত সহোদরা বোনটি ছিল
খুবই সুশ্রী-সুন্দরী তার নাম ছিল ‘আকলিমা’ আর
হাবিলের সহজাত বোনটি ছিল তুলনামূলক কম সুন্দরী
তার নাম ছিল ‘গাজা’। বিবাহের সময়ে হলে
নিয়মানুযায়ী হাবিলের সহজাত অসুন্দরী কন্যা
কাবিলের ভাগে পড়ল। এতে কাবিল অসন্তুষ্ট হয়ে
হাবিলের শত্রু হয়ে গেল। সে জেদ ধরল যে, আমার
সহজাত বোনকেই আমার সঙ্গে বিবাহ দিতে হবে।

হযরত আদম আ. তাঁর শরীয়তের আইনের
পরিপ্রেক্ষিতে কাবিলের আবদার প্রত্যাখ্যান
করলেন। অতঃপর তিনি হাবিল ও কাবিলের মতভেদ
দূর করার উদ্দেশ্যে বললেন, তোমরা উভয়েই আল্লাহর
জন্য নিজ নিজ কুরবানী পেশ কর। যার কুরবানী গৃহিত
হবে, সে-ই উক্ত কন্যার পানি গ্রহণ করবে। হযরত আদম
আ. এর নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল যে, যে সত্য পথে আছে,
তার কুরবানীই গৃহিত হবে। তৎকালে কুরবানী গৃহিত
হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল এই যে, আকাশ
থেকে একটি অগ্নি শিখা এসে কুরবানীকে ভস্মীভূত
করে আবার অন্তর্হিত হয়ে যেত। যেমন মহান আল্লাহ
তায়ালা বলেন ঃ ﺑِـﻘُـﺮْﺑَـﺎﻥٍ ﺗَـﺄﻛُـﻠُـﻪُ ﺍﻟـﻨَّـﺎﺭُ “ঐ কুরবানী যাকে
আগুন গ্রাস করে নিবে”। (সূরা আলে ইমরান-১৮৩) আর
যে কুরবানীকে অগ্নি ভস্মীভূত করত না, সেটাকে
প্রত্যাখ্যাত গণ্য করা হত। কুরবানীর এ তরীকা
খাতামুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদ সা. এর যুগ পর্যন্ত
সকল পূর্বেকার নবীর যুগে বলবৎ ছিল। হাবিল ভেড়া,
দুম্মা ইত্যাদি পশু পালন করত। সে একটি উৎকৃষ্ট দুম্বা
কুরবানী করল। কাবিল কৃষি কাজ করত। সে কিছু শস্য,
গম ইত্যাদি কুরবানীর জন্যে পেশ করল। (তাফসীরে
ইবনে কাসীর, সূত্র হযরত ইবনে আব্বাস রা. কর্তৃক
বর্ণিত) অতঃপর নিয়মানুযায়ী আকাশ থেকে অগ্নি
শিখা অবতরণ করে হাবিলের কুরবানীটি ভস্মীভূত
করে দিল এবং কাবিলের কুরবানী যেমন ছিল তেমনি
পড়ে রইল। এ অকৃতকার্যতায় কাবিলের দুঃখ ও ক্ষোভ
বেড়ে গেল। সে আত্মসংবরণ করতে পারল না। তাই
সে হাবিলকে হত্যা করার সংকল্প করল এবং এক
পর্যায়ে তাকে হত্যা করে ফেলল।(মাআ’রেফুল
কুরআন বাংলা সংস্করণ-৩২৪ পৃষ্ঠা) হাবিল ও
কাবিলের কুরবানীর ঘটনা পবিত্র কুরআনে এ ভাবে
বর্ণিত হয়েছে:
ﻭَﺍﺗْﻞُ ﻋَﻠَﻴْـﻬِﻢْ ﻧَﺒَﺎَ ﺍﺑْـﻨَـﻰْ ﺍﺩَﻡَ ﺑِـﺎﻟْـﺤَـﻖِّ - ﺍِﺫْ ﻗَـﺮَّﺑَـﺎ ﻗُـﺮْﺑَﺎﻧًﺎ ﻓَـﺘُـﻘُـﺒِّـﻞَ ﻣِﻦْ ﺍَﺣَﺪِﻫِﻤَﺎ
ﻭَﻟَﻢْ ﻳُـﺘَـﻘَﺒَّﻞْ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﺎﺧَﺮِ - ﻗَﺎﻝَ ﻟَﺎَﻗْﺘُﻠَـﻨَّﻚَ - ﻗَﺎﻝَ ﺍِﻧَّﻤَﺎ ﻳَﺘَﻘَﺒَّﻞُ ﺍﻟﻠﻪُ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤُﺘَّﻘِﻴْﻦَ - ﻟَﺌِﻦْ
ﺑَﺴَﻄْﺖَّ ﺍِﻟَﻰَّ ﻳَﺪَﻙَ ﻟِﺘَﻘْﺘُﻠَﻨِﻰْ ﻣَﺎ ﺍَﻧَﺎ ﺑِﺒَﺎﺳِﻂٍ ﻳَّﺪِﻯَ ﺍِﻟَﻴْﻚَ ﻟِﺎَ ﻗْﺘُﻠَﻚَ - ﺍِﻧِّﻰْ ﺍَﺧَﺎﻑُ ﺍﻟﻠﻪَ
ﺭَﺏَّ ﺍﻟْﻌﻠَﻤِﻴْﻦَ - ﺍِﻧِّﻰْ ﺍُﺭِﻳْﺪُ ﺍَﻥْ ﺗَﺒُـﻮْﺍَ ﺑِـﺎِﺛْﻤِﻰْ ﻭَﺍِﺛْﻤِﻚَ ﻓَﺘَﻜُـﻮْﻥَ ﻣِﻦ ﺍَﺻْﺤﺐِ ﺍﻟﻨَـﺎﺭِ -
ﻭَﺫﻟِﻚَ ﺟَﺰﺅُ ﺍﻟﻈّﻠِﻤِﻴْﻦَ - ﻓَﻄَﻮَّﻋَﺖْ ﻟَـﻪُ ﻧَـﻔْﺴُﻪ ﻗَـﺘْﻞَ ﺍَﺧِـﻴْـﻪِ ﻓَﻘَـﺘَـﻠَﻪُ ﻓَﺎَﺻْﺒَﺢَ ﻣِﻦَ
ﺍﻟْـﺨﺴِﺮِﻳْﻦَ - ﻓَﺒَـﻌَـﺚَ ﺍﻟﻠﻪُ ﻏُـﺮَﺍﺑًﺎ ﻳَﺒْﺤَﺚُ ﻓِﻰ ﺍﻟْﺎَﺭْﺽِ ﻟِﻴُﺮِﻳَﻪُ ﻛَـﻴْـﻒَ ﻳُـﻮَﺍﺭِﻯْ ﺳَـﻮْﺀَﺓَ
ﺍَﺧِﻴْﻪِ - ﻗَﺎﻝَ ﻳـﻮَ ﻳْﻠَﺘـﻰ ﺍَﻋَﺠَﺰْﺕُ ﺍَﻥْ ﺍَﻛُﻮْﻥَ ﻣِـﺜْﻞَ ﻫـﺬَﺍ ﺍﻟْﻐُﺮَﺍﺏِ ﻓَﺎُﻭَﺍﺭِﻯَ ﺳَـﻮْﺀَﺓً–
ﻓَﺎَﺻْﺒَﺢَ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻨّﺪِﻣِﻴْﻦَ
“আপনি তাদেরকে আদমের দু’পুত্রের ঘটনাটি
ঠিকভাবে শুনিয়ে দিন। (তা হচ্ছে এই যে,) যখন তারা
উভয়ে কুরবানী পেশ করলো, তখন তাদের একজনের
কুরবানী গৃহিত হল আর অপর জনের কুরবানী গৃহিত
হলোনা। তখন সে ভাইকে বলল- অবশ্যই আমি
তোমাকে হত্যা করব। সে উত্তরে বলল আল্লাহ তো
মুত্তাকীদের কুরবানীই কবুল করেন। যদি তুমি
আমাকে হত্যা করতে আমার দিকে হস্ত প্রসারিত কর,
তবে আমি তোমাকে হত্যা করতে তোমার দিকে হস্ত
প্রসারিত করব না। নিশ্চয়ই আমি বিশ্ব জগতের পালন
কর্তা আল্লাহকে ভয় করি। আমি চাই যে, আমার পাপ
ও তোমার পাপ তুমি নিজের মাথায় চাপিয়ে নাও।
অত:পর তুমি দোযখীদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাও। এটাই
অত্যাচারীদের শাস্তি। অতঃপর তার অন্তর তাকে
ভ্রাতৃ হত্যায় উদ্বুদ্ধ করল। অনন্তর সে তাকে হত্যা
করল। ফলে সে ক্ষতি গ্রস্তদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেল।
আল্লাহ এক কাক প্রেরণ করলেন। সে মাটি খনন
করছিল যাতে তাকে শিক্ষা দেয় যে, আপন ভ্রাতার
মৃতদেহ সে কিভাবে সমাহিত করবে। সে বললো,
আফসোস! আমি কি এ কাকের সমতুল্যও হতে পারলাম
না যে, আপন ভ্রাতার মৃতদেহ সমাহিত করি! অত:পর
সে অনুতাপ করতে লাগল”।(সূরা আল মায়িদাহ, ২৭-৩১
আয়াত)। উল্লেখ্য যে, হযরত আদম আ. এর পর সকল
উম্মতের মধ্যেই অবিচ্ছন্ন ভাবে কুরবানীর
ধারাবাহিকতা চলতে থাকে।

আমাদের কুরবানী সুন্নাতে ইবরাহীমী : কুরবানী
ইবাদত হিসেবে যদিও আদম আ. এর যুগ হতে হয়ে
আসছে কিন্তু পরবর্তীতে হযরত ইবরাহীম আ. এর এক
ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশেষ বৈশিষ্ট্য
নিয়ে শুরু হয়েছে। আমরা হযরত ইবরাহীম আ. এর
মিল্লাতের উপর প্রতিষ্ঠিত আছি। এ মিল্লাতের
প্রতিষ্ঠাতা ও মুসলিম জাতির পিতা হচ্ছেন হযরত
ইবরাহীম আ.। তিনি যেমন আল্লাহর নির্দেশে
জীবনের সবচাইতে প্রিয় বস্তু- পুত্র ইসমাঈলকে তাঁর
উদ্দেশ্যে কুরবানী করতে প্রস্তুত ছিলেন, ঈদুল
আয্হার দিন মুসলমানরাও তেমনি পশু কুরবানীর
মাধ্যমে নিজেদের প্রিয়তম জান-মাল আল্লাহর পথে
কুরবানী করার সাক্ষ্য প্রদান করেন। মুসলিম
মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহীম আ. এর সেই মহত্ব ও
মাকবুল কুরবানীকে শাশ্বত রূপদানের জন্যেই আল্লাহ
তায়ালা ও তাঁর রাসূল সা. এই দিনে মুসলমানদেরকে
ঈদুল আয্হা উপহার দিয়েছেন এবং এ কুরবানী করার
নির্দেশ দিয়েছেন।

মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে সান্নিধ্যপ্রাপ্ত
হযরত ইবরাহীম আ. কে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন
ধরনের কঠিন থেকে কঠিনতর পরীক্ষা করেছেন।
তিনি প্রত্যেকটি পরীক্ষায় পূর্ণ সফলকাম প্রমাণিত
হয়েছেন। এক. তাওহীদের হেফজতের প্রয়োজনে
চিরদিনের জন্য প্রিয় জন্মভূমি ত্যাগ করে হিজরত
করলেন। হযরত লূত আ. যিনি ইতিপূর্বে তাঁর উপর ঈমান
এনেছিলেন তাকে সাথে নিয়ে নিজ জন্মভূমি ইরাক
থেকে হিজরত করে ফিলিস্তিনের কেনানে অবস্থান
নিলেন। ৮৬ বৎসর বয়সে সেখানে বসে আওলাদের জন্য
দোয়া করলেন ﺭَﺏِّ ﻫَـﺐْ ﻟِﻰْ ﻣِـﻦَ ﺍﻟـﺼَّﺎﻟِـﺤِﻴْـﻦَ “হে আল্লাহ
আমাকে সৎ পুত্র দান করুন”। (সূরা আসসাফ্ফাত-১০০)।

মহান আল্লাহ তায়ালা সুসংবাদ দিয়ে বললেন :
ﻓَـﺒَـﺸَّـﺮْﻧﻪُ ﺑِـﻐُـﻠـﻢٍ ﺣَـﻠِـﻴْـﻢٍ “ইবরাহীমকে এক ধৈর্যশীল পুত্রের
(ইসমাঈল) সুসংবাদ দিলাম। ৯৯ বৎসরের সময় আরেক
জন ছেলে হয়েছে তার নাম ইসহাক”। (সূরা
আসসাফ্ফাত-১০১)

 দুই. নমরুদ কর্তৃক প্রজ্জ্বলিত
অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হয়ে চরম ধৈর্যের ও আল্লাহ
প্রেমের পরাকাষ্ঠ প্রদর্শন করেন। আল্লাহ তায়ালা
তাঁর খলীলের জন্য আগুনকে ফুলবাগীচায় পরিণত
করে দিয়েছিলেন।মহান আল্লাহ্ বলেন :
ﻗُﻠْﻨَﺎ ﻳﺎ ﻧَﺎﺭُ ﻛُﻮْ ﻧِﻰْ ﺑَﺮْﺩًﺍ ﻭَ ﺳَﻠَﺎ ﻣًﺎ ﻋَﻠﻰ ﺍِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢَ “আমি বললাম, হে
আগুন, তুমি ইবরাহীমের উপর শীতল ও নিরাপদ হয়ে
যাও”। (সূরা আল আম্বিয়া -৬৯)

তিন. অতঃপর যখন তাঁর
প্রিয় আদরের পুত্র ইসমাঈল ও প্রিয় স্ত্রী হযরত
হাজেরা আ. কে মক্কার বিরাণ মরুভূমিতে রেখে
আসার আদেশ হলো। সেটাও ছিল কঠিন পরীক্ষা।
কেননা বার্ধক্য ও শেষ বয়সের বহু আকাংখার
স্বপ্নসাধ, দিবা রাত্রির প্রার্থণার ফল এবং
পরিবারের একমাত্র আশার আলো হযরত ইসমাঈল কে
শুধু আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে পানি ও
জনমানবহীন মরু প্রান্তরে রেখে এসেছেন। অথচ
একবারও পিছনের দিকে ফিরেও তাকাননি। যেন এমন
না হয় যে, পিতৃ¯েœহ উথলিয়ে উঠে এবং আল্লাহর
আদেশ পালনে কোন প্রকার বিচ্যুতি ঘটে যায়। স্ত্রী
ও পুত্রকে সেখানে রেখে এসে তিনি কেবল আল্লাহ
তায়ালার নিকট দোয়া করলেন:
ﺭَﺑَّﻨﺎَ ﺍِﻧِّﻰْ ﺍَﺳْﻜَﻨْﺖُ ﻣِﻦْ ﺫُﺭِّﻳَّﺘِﻰْ ﺑِﻮَﺍﺩٍ ﻏَﻴْﺮِ ﺫِﻯْ ﺯَﺭْﻉٍ ﻋِﻨْﺪَ ﺑَﻴْﺘِﻚَ ﺍﻟْﻤُﺤَﺮَّﻡِ - ﺭَﺑَّﻨَﺎ
ﻟِﻴُﻘِﻴْﻤُﻮْﺍ ﺍﻟﺼَّﻠﻮﺓَ ﻓَﺎ ﺟْﻌَﻞْ ﺍَﻓْﺌِﺪَﺓً ﻣِّﻦَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ ﺗَﻬْﻮِﻯْ ﺍِﻟَﻴْﻬِﻢْ ﻭَﺍَﺭْﺯُﻗْﻬُﻢْ ﻣِّﻦَ ﺍﻟﺜَﻤَﺮَﺍﺕِ
ﻟَﻌَﻠَّﻬُﻢْ ﻳَﺸْﻜُﺮُﻭْﻥَ
“হে আল্লাহ! আমি নিজের এক বংশধরকে আপনার
পবিত্র ঘরের নিকট অনাবাদ জায়গায় বসবাস
করালাম। হে আল্লাহ ! যেন তারা নামায কায়েম
করে। অত;পর আপনি কিছু লোকের অন্তর তাদের
প্রতি আকৃষ্ট করুন এবং তাদের ফল ফলাদি দ্বারা
রুজি দান করুন। আশা করি তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
করবে”। (সূরা আল ইবরাহীম -৩৭)

 চার. উপরোল্লিখিত
পরক্ষিাগুলির কঠিন মঞ্জিল অতিক্রম করার পর
হযরত ইবরাহীম আ. কে স্বপ্নের মাধ্যমে সবচেয়ে
কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করা হয়। যা বিগত
পরীক্ষাগুলির চেয়ে ও অধিক কঠিন, হৃদয় বিদারক ও
আল্লাহ প্রেমের কঠিন পরীক্ষা। কোন কোন বর্ণনা
মতে জানা যায় যে, এই স্বপ্ন তিনি পরপর তিন রাত্রি
দেখেন। স্বপ্নে তিনি একমাত্র প্রিয় পুত্র ইসমাঈল
কে কুরবানী করতে আদিষ্ট হন। প্রাণ প্রিয় পুত্রকে
কুরবানী করার নির্দেশ তাঁকে এমন সময় দেয়া
হয়েছিল, যখন অনেক দোয়া কামনা করে পাওয়া
সন্তানকে লালন পালন করার পর পুত্র পিতার সাথে
চলাফেরা করতে পারে এবং তাঁকে সাহায্য করার
যোগ্য হয়েছে। তাফসীরবিদগণ লিখেছেন: এ সময়
হযরত ইসমাঈলের বয়স ছিল তের বছর। কেউ কেউ
বলেছেন তিনি তখন বয়প্রাপ্ত হয়ে গিয়েছিলেন
(তাফরীরে মাযহারী)।

তবে তাফসীরে রুহুল বয়ানে
আছে ৯ বছরের কথা। এ কথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত
সত্য যে, নবী রাসূলগণের স্বপ্নও ওহীর অর্ন্তভূক্ত। তাই
এ স্বপ্নের অর্থ ছিল এই যে, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ
থেকে হযরত ইবরাহীম আ. এর প্রতি একমাত্র পুত্রকে
যবেহ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এ হুকুমটি স্বপ্নের
মাধ্যমে দেয়ার কারণ হলো হযরত ইবরাহীম আ. এর
আনুগত্যের বিষয়টি পূর্ণমাত্রায় প্রমাণিত করা। হযরত
ইবরাহীম আ. মহান প্রতি পালকের নির্দেশ পালনের
নিমিত্তে যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। কিন্তু এ
পরীক্ষাটি যেহেতু ইবরাহীম আ. এর ব্যক্তিত্বের
সাথে সাথে তার পুত্রও সংশ্লিষ্ট ছিলেন তাই তিনি
তার পুত্র ইসমাঈলকে লক্ষ্য করে বললেন : ﻗَﺎﻝَ ﻳﺒُﻨَﻰَّ ﺍِﻧِّﻰْ
ﺍَﺭﻯ ﻓِﻰ ﺍﻟْﻤَﻨَـﺎﻡِ ﺍَﻧِّﻰ ﺍَﺫْ ﺑَـﺤُـﻚَ ﻓَـﺎﻧْـﻈُـﺮْ ﻣَـﺎﺫَﺍ ﺗَـﺮﻯ “হে প্রাণ প্রিয়
পুত্র আমার! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে যবেহ
করছি। সুতরাং তুমি চিন্তা ভাবনা করে দেখ এবং এ
স্বপ্নের ব্যাপারে তোমার অভিমত কি তা বল”( সূরা
আস-সাফফাত-১০২)।
যেমন বাপ, তেমন বেটা। পুত্রও
ছিলেন যেন হযরত ইবরাহীম আ. এর ছাঁচে গড়া,
কেননা তিনি ও ভাবী নবী। তাই তৎক্ষণাৎ
আত্মসর্ম্পনে মস্তক অবনত করে পুত্র জবাবে বললেন :
ﻗَﺎﻝَ ﻳـﺎَﺑَﺖِ ﺍﻓْـﻌَـﻞْ ﻣَﺎ ﺗُـﺆْﻣَﺮُ - ﺳَـﺘَـﺠِـﺪُ ﻧِﻰْ ﺍِﻥْ ﺷَـﺎﺀَ ﺍﻟﻠﻪُ ﻣِﻦَ ﺍﻟـﺼّـﺒِـﺮِﻳْـﻦَ “হে
আমার পিতাজী! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে
আপনি তাই করুন। ইনশা আল্লাহ আপনি আমাকে
ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন” (সূরা আস
সাফ্ফাত-১০২)। পুত্রের সাথে পরামর্শের হিকমত ছিল
এই যে, প্রথমত: পুত্রের দৃঢ়তা, হিম্মত এবং আল্লাহর
আনুগত্যের জয্বা সৃষ্টি হওয়ার পরীক্ষা স্বরূপ।

দ্বিতীয়ত : সে আনুগত্য স্বীকার করলে সওয়াব ও
প্রতিদানের অধিকারী হবে। কেননা সওয়াবের জন্য
নিয়ত ও আগ্রহ জরুরী। তৃতীয়ত : যবেহের সময় মানুষ
হিসেবে এবং স্বভাবজাত পিতৃ¯েœহের কারণে কোন
ভূল ভ্রান্তি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থেকে অনেকটা
মুক্ত থাকার প্রবল আশা সৃষ্টি হবে।(তাফসীরে রুহুল
বয়ান)। পরামর্শ শেষে পিতা ও পুত্র মহান আল্লাহর
সন্তুষ্টির জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে
কুরবানীর নির্দেশ পালনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন
এবং এ কাজ সমাধার জন্য তারা মিনা প্রান্তরে গমন
করেন। ইতিহাস ও তাফসীর ভিত্তিক কোন কোন
রেওয়ায়াত থেকে জানা যায় যে, শয়তান কুরবানীর
মহান একাজে বিভিন্নভাবে বাঁধার সৃষ্টি করে । সে
প্রথমে মা হাজেরা ও ইসমাঈল আ. কে উল্টো বুঝিয়ে
এ থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করে। কিন্তু তাঁরা
শয়তানের প্ররোচনায় কোন পাত্তা দিলেন না। মরদুদ
শয়তান হযরত হাজেরা আ. ও হযরত ইসমাঈল আ. কে
ধোঁকা দেয়া থেকে নিরাশ হয়ে মিনা যাওয়ার পথে
‘জামরায়ে আকাবাহ’, ‘জামারায়ে উসত্বা’ এবং
‘জামরায়ে উলা’ এই তিন জায়গায় তিনবার হযরত
ইবরাহীম আ. কে প্ররোচিত করার চেষ্টা করে এবং
হযরত ইবরাহীম আ. প্রত্যেকবারই তাকে সাতটি করে
কংকর নিক্ষেপের মাধ্যমে তাড়িয়ে দেন। অদ্যাবধি
এ প্রশংসনীয় কাজের স্মৃতি স্বরূপ মিনায় ঐ তিনটি
স্থানে কংকর নিক্ষেপ করার বিধান হাজীদের জন্য
ওয়াজিব হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। অবশেষে
পিতা-পুত্র উভয়ে যখন এই মহান কুরবানীর ইবাদত
পালনের উদ্দেশ্যে কুরবানগাহে পৌঁছলেন এবং
ইবরাহীম আ. কুরবানী করার জন্য ইসমাঈল আ. কে
শোয়ালেন, তখন পুত্র ইসমাঈল আ. পিতা ইবরাহীম আ.
কে বললেন আব্বাজান! আমার হাত পা খুব শক্ত করে
বেঁধে নিন যাতে আমি নড়াচড়া করতে না পারি। আর
আপনার পরিধেয় বস্ত্রাদি সামলে নিন, যাতে আমার
রক্তের ছিটা না পড়ে। অন্যথায় এতে আমার ছওয়াব
হ্রাস পেতে পারে। এছাড়া রক্ত দেখলে আমার মা
অধিক ব্যাকুল হবেন। আপনার ছুরিটি ধার দিয়ে নিন
এবং আমার গলায় দ্রুত চালাবেন, যাতে আমার প্রাণ
সহজে বের হয়ে যায়। কারণ, মৃত্যু বড় কঠিন ব্যাপার।
আপনি আমার আম্মাজানের নিকট আমার শেষ
বিদায়ের সালাম টুকু অনুগ্রহ পূর্বক পৌঁছে দিবেন।

যদি আমার জামা তার নিকট নিয়ে যেতে চান, তবে
নিয়ে যাবেন। একমাত্র আদরের সন্তানের মুখে এমন
কথা শুনে পিতার মানসিক অবস্থা কি যে হতে পারে,
তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু হযরত ইবরাহীম আ. দৃঢ়তায়
অটল পাহাড় হয়ে জবাব দিলেন, ওগো আমার প্রাণ
প্রিয় বৎস! আল্লাহর নির্দেশ পালন করার জন্য তুমি
আমার চমৎকার সহায়ক হয়েছ। অতঃপর তিনি পুত্রকে
আদর করে চুম্বন করলেন এবং অশ্রু সজল নয়নে তাকে
বেঁধে নিলেন । অতঃপর তাঁকে সোজা করে শুইয়ে
দিয়ে তার গলায় ছুরি চালালেন। কিন্তু আশ্চর্য
ব্যাপার যে, বার বার ছুরি চালানো সত্বেও গলা
কাটছে না। কেননা আল্লাহ তায়ালা স্বীয় কুদরতে
পিতলের একটা টুকরা মাঝখানে অন্তরায় করে
দিয়েছিলেন। তখন পুত্র নিজেই আবদার করে বললেন,
আব্বাজী! আমাকে উপুড় করে শুইয়ে নিন। কারণ,
আমার মুখমন্ডল দেখে আপনার মধ্যে পিতৃ ¯েœহ
উথলে উঠে। ফলে গলা কাটা যাচ্ছে না। এ ছাড়া
ছুরি দেখে আমি ঘাবড়ে যাই। সে মতে হযরত ইবরাহীম
আ. তাকে উপুড় করে শুইয়ে দিলেন এবং পুনরায়
সজোরে প্রাণপণে ছুরি চালালেন। কিন্তু তখন ও গলা
কাটতেছেনা। হযরত ইবরাহীম আ. চেষ্টা করেই
যাচ্ছেন। হযরত ইবরাহীম আ. এর এ প্রাণন্তর প্রচেষ্টা
প্রত্যক্ষ করে মহান আল্লাহ সন্তুষ্ট হলেন এবং হযরত
ইসমাঈলের বিনা যবেহেই তার কুরবানী কবুল করে
নিলেন। এ ব্যাপারে হযরত ইবরাহীম আ. এর উপর ওহী
নাযিল হলো। (তাফসীরে রুহুল মাআ’নী।

সূত্র হযরত
কাতাদাহ রা. হতে বর্নিত, তাফসিরে ইবনে কাসীর
মসনদে আহমদ থেকে নকল করা হয়েছে। সূত্র হযরত
ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত)। ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺍَﺳْﻠَﻤَﺎ ﻭَﺗَﻠَّﻪ ﻟِﻠْﺠَﺒِﻴْﻦِ -
ﻭَﻧَﺎﺩَﻳْﻨﻪُ ﺍَﻥْ ﻳَّﺎ ﺍِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢَ - ﻗَﺪْ ﺻَﺪَّﻗْﺖَ ﺍﻟﺮُّﺀْﻳَﺎ - ﺍِﻧَّﺎ ﻛَﺬﻟِﻚَ ﻧَـﺠْـﺰِﻯ ﺍﻟْـﻤُﺤْﺴِﻨِﻴْـﻦَ - ﺍِﻥَّ
ﻫـﺬَﺍ ﻟَﻬُـﻮَ ﺍﻟْـﺒَﻠـﺆُ ﺍﻟْﻤُﺒِﻴْـﻦُ - ﻭَﻗَـﺪَﻳْﻨﻪُ ﺑِـﺬِﺑْﺢٍ ﻋَـﻈِـﻴْﻢٍ “অবশেষে যখন
পিতা-পুত্র উভয়ে আল্লাহর কাছে নিজেদের কে
সোপর্দ করলো এরং ইবরাহীম আ. পুত্রকে উপুড় করে
শুইয়ে দিলেন (যবেহ করার জন্যে), তখন আমরা তাকে
সম্বোধন করে বললাম, হে ইবরাহীম! তুমি সপ্নকে
সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছ। আমরা সৎকর্মশীলদের
এরূপ প্রতিদানই দিয়ে থাকি। বস্তুত এ এক সুস্পষ্ট
কঠিন পরীক্ষা। আর আমরা বিরাট কুরবানী ফিদিয়া
স্বরূপ দিয়ে তাকে (ইসমাঈলকে) উদ্ধার করেছি”।
(সূরা আস-সাফ্ফাত ১২০-১০৭)
 অতঃপর আল্লাহ
তাআলা নির্দেশ দিলেন এখন পুত্রকে ছেড়ে দিন
এবং আপনার নিকট যে দুম্বাটি দাঁড়ানো রয়েছে,
পুত্রের পরিবর্তে সেটাকে যবেহ করুন। তখন ইবরাহীম
আ. পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখেন, একটি হৃষ্ট পুষ্ট
দুম্বা দাঁড়ানো আছে। আল্লাহর শোকর আদায় করে
তিনি সেই দুম্বাটিকে যবেহ করলেন। এটাই সেই
কুরবানী যা আল্লাহর দরবারে এতই প্রিয় ও মাকবুল
হয়েছিল যে, আল্লাহ তায়ালা পরবর্তী সকল উম্মতের
মধ্যে তা অবিস্মরণীয় রূপে বিরাজমান রাখার
ব্যবস্থা করে দিলেন। যার ফলে মিল্লাতে
ইবরাহীমে তথা দ্বীন ইসলামে এক মহান ওয়াজিব
ইবাদত ও শিয়ার প্রতীক হিসেবে এ কুরবানী আজও
পালিত হয়ে আসছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা পালিত
হতে থাকবে। তাই মহান আল্লাহ বলেন : ﻭَﺗَﺮَﻛْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻓِﻰ ﺍﻟْﺎ
ﺧِﺮِﻳْﻦَ “আর আমরা ভবিষ্যতের উম্মতের মধ্যে
ইবরাহীমের এ সুন্নাত স্মরণীয় করে রাখলাম”। (সূরা
আস আস সাফ্ফাত ১০৮)

উম্মতে মুহাম্মদীর প্রতি কুরবানীর নির্দেশ: আল
কুরআনে নবী করীম সা. কে সালাত আদায় করার মতো
কুরবানী করারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইরশাদ
হচ্ছে ঃ ﻓَﺼَﻞِّ ﻟِﺮَﺑِّﻚَ ﻭَﺍﻧْﺤَﺮْ “তোমার রবের জন্য নামায পড়
এবং কুরবানী করো”। (সূরা আল কাউসার -০২) মহান
আল্লাহ কুরবানী ও জীবন দানের প্রেরণা ও চেতনা
সমগ্র জীবনে জাগ্রত রাখার জন্যে নবী সা. কে
আরো নির্দেশ দিয়ে বলেছেন :
ﻗُﻞْ ﺍِﻥَّ ﺻَﻠﻮﺗِﻰْ ﻭَﻧُﺴُﻜِﻰْ ﻭَﻣَﺤْﻴَﺎﻯَ ﻭَﻣَﻤَﺎﺗِﻰْ ﻟِﻠّﻪِ ﺭَﺏِّ ﺍﻟْﻌﻠَﻤِﻴْﻦَ – ﻟَﺎ َﺷَﺮِﻳْﻚَ ﻟَﻪ ﻭَﺑِﺬ
ﻟِﻚَ ﺍُﻣِﺮْﺕُ ﻭَﺍَﻧَﺎ ﺍَﻭَّﻝُ ﺍﻟْﻤُﺴْﻠِﻤِﻴْﻦَ -
“বলুন! হে মুহাম্মদ! আমার নামায, আমার কুরবানী,
আমার জীবন ও আমার মরণ সব কিছুই আল্লাহ রাব্বুল
আলামীনের জন্যে। তাঁর কোন শরীক নেই। আমাকে
তাঁরই নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং আমি সকলের আগে
তাঁর অনুগত ও ফরমাবরদার”। (সূরা আল আনআম-১৬২)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত যে, নবী
করীম সা. মদীনায় দশ বৎসর অবস্থান করেন। এ সময়
তিনি প্রতি বছর কুরবানী করতেন।(সুনানে আত
তিরমিযী)

ঈদুল আযহার গুরুত্ব : ঈদুল আযহার গুরুত্ব অপরিসীম।
কুরআন-হাদীসে এ ব্যাপারে যথেষ্ট তাকীদ দেওয়া
হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ﻭَﺍﻟْﺒُﺪْﻥَ ﺟَﻌَﻠْﻨَﺎﻫَﺎ ﻟَﻜُﻢ ﻣِّﻦْ ﺷَﻌَﺎﺋِﺮِ
ﺍﻟﻠﻪِ ﻟَﻜُﻢْ ﻓِﻴْﻬَﺎ ﺧَﻴْﺮٌ - ‘আর কুরবানীর পশু সমূহকে আমরা
তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শন সমূহের অন্তর্ভুক্ত
করেছি। এর মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যাণ
রয়েছে’ (হজ্জ ৩৬)। আল্লাহ আরও বলেন, ﻭَﻓَﺪَﻳْﻨَﺎﻩُ ﺑِﺬِﺑْﺢٍ
ﻋَﻈِﻴْﻢٍ - ﻭَﺗَﺮَﻛْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺂﺧِﺮِﻳْﻦَ - ‘আর আমরা তাঁর (ইসমাঈলের)
পরিবর্তে যবহ করার জন্য দিলাম একটি মহান
কুরবানী। আমরা এটিকে পরবর্তীদের মধ্যে রেখে
দিলাম’ (ছাফফাত ১০৭-১০৮)। আল্লাহ বলেন, ﻓَﺼَﻞِّ ﻟِﺮَﺑِّﻚَ
ﻭَﺍﻧْﺤَﺮْ ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ছালাত
আদায় কর এবং কুরবানী কর’ (কাওছার ২)। কাফির-
মুশরিকরা তাদের দেব-দেবী ও বিভিন্ন কবর ও
বেদীতে পূজা দেয় এবং মূর্তির উদ্দেশ্যে কুরবানী
করে থাকে। তার প্রতিবাদ স্বরূপ মুসলমানকে
আল্লাহর জন্য ছালাত আদায়ের ও তাঁর উদ্দেশ্যে
কুরবানী করার হুকুম দেওয়া হয়েছে। আমাদের প্রিয়
নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) বলেছেন, ﻣَﻦْ ﻛَﺎﻥَ ﻟَﻪُ ﺳَﻌَﺔً ﻭَﻟَﻢْ ﻳُﻀَﺢِّ ﻓَﻼَ
ﻳَﻘْﺮِﺑَﻦَّ ﻣُﺼَﻼَّﻧَﺎ ‘সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানী
করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না
হয়’। এটি ইসলামের একটি ‘মহান নিদর্শন’ যা ‘সুন্নাতে
ইবরাহীম’ হিসাবে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজে মদীনায়
প্রতি বছর আদায় করেছেন এবং সাহাবীগণও
নিয়মিতভাবে কুরবানী করেছেন। অতঃপর অবিরত
ধারায় মুসলিম উম্মাহ সামর্থ্যবানদের মধ্যে এটি
চালু আছে।

ঈদুল আযহার তাৎপর্য : ঈদুল আযহা ইবরাহীম (আঃ),
বিবি হাজেরা ও ইসমাঈলের পরম ত্যাগের স্মৃতি
বিজড়িত উৎসব। ইবরাহীম (আঃ)-কে আল-কুরআনে
মুসলিম জাতির পিতা বলে উল্লেখ করা হয়েছে (সূরা
আল হজ্জ ৭৮)। এ পরিবারটি বিশ্ব মুসলিমের জন্য
ত্যাগের মহত্তম আদর্শ। তাই ঈদুল আযহার দিন সমগ্র
মুসলিম জাতি ইবরাহীমী সুন্নাত পালনের মাধ্যমে
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের প্রাণপণ চেষ্টা করে।
কুরবানীর স্মৃতিবাহী যিলহজ্জ মাসে হজ্জ উপলক্ষে
সমগ্র পৃথিবী থেকে লাখ লাখ মুসলমান সমবেত হয়
ইবরাহীম (আঃ)-এর স্মৃতি বিজড়িত মক্কা-মদীনায়।
তাঁরা ইবরাহীমী আদর্শে আদর্শবান হওয়ার জন্য
জীবনের সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করেন। হজ্জ মুসলিম
উম্মাহর ঐক্য, সংহতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক অনন্য
উদাহরণ। যা প্রতি বছরই আমাদেরকে তাওহীদী
প্রেরণায় উজ্জীবিত করে। আমরা নিবিড়ভাবে অনুভব
করি বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্ব। ঈদের উৎসব একটি
সামাজিক উৎসব, সমষ্টিগতভাবে আনন্দের
অধিকারগত উৎসব। ঈদুল আযহা উৎসবের একটি অঙ্গ
হচ্ছে কুরবানী। কুরবানী হ’ল চিত্তশুদ্ধির এবং
পবিত্রতার মাধ্যম। এটি সামাজিক রীতি হ’লেও
আল্লাহর জন্যই এ রীতি প্রবর্তিত হয়েছে। তিনিই
একমাত্র বিধাতা প্রতিমুহূর্তেই যার করুণা লাভের
জন্য মানুষ প্রত্যাশী। আমাদের বিত্ত, সংসার এবং
সমাজ তাঁর উদ্দেশ্যেই নিবেদিত এবং কুরবানী হচ্ছে
সেই নিবেদনের একটি প্রতীক। মানুষ কুরবানীর
মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভে ধন্য হ’তে চায়।

আল্লাহর জন্য মানুষ তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস
ত্যাগ করতে রাযী আছে কি-না সেটাই পরীক্ষার
বিষয়। কুরবানী আমাদেরকে সেই পরীক্ষার কথাই
বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। ইবরাহীম (আঃ)-এর কাছে
আল্লাহর পরীক্ষাও ছিল তাই। আমাদেরকে এখন আর
পুত্র কুরবানী দেওয়ার মত কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি
হ’তে হয় না। একটি ‘মুসিন্নাহ’ হালাল পশু কুরবানী
করেই আমরা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হ’তে পারি।
কুরবানীর ঈদ প্রসঙ্গে স্বভাবতই একটি প্রশ্ন এসে
যায়। আমরা কি শুধু কুরবানীর সময়েই গরীব-দুঃখী
মানুষ আহার করানোর কথা ভাবব? আর বছরের বাকি
দিনগুলো কি তাদেরকে ভুলে থাকব? না, অবশ্যই না।
কুরবানী একটি প্রতীকী ব্যাপার। আল্লাহর জন্য
আত্মত্যাগের একটি দৃষ্টান্ত মাত্র। সারা বছরই
আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রত্যাশায় নিজ সম্পদ অন্য
মানুষের কল্যাণে ত্যাগ করতে হবে। এই ত্যাগের
মনোভাব যদি গড়ে ওঠে। তবে বুঝতে হবে, কুরবানীর
ঈদ স্বার্থক হয়েছে, কুরবানী স্বার্থক হয়েছে। নইলে
এটি নামমাত্র একটি ভোগবাদী অনুষ্ঠানই থেকে
যাবে চিরকাল। আল-কুরআনে আল্লাহ বারবার
ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘হে
ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের উপার্জিত হালাল
মালের কিছু অংশ এবং আমি যা তোমাদের জন্য
যমীন হ’তে বের করেছি তার অংশ ব্যয় কর’ (সূরা আল
বাক্বারাহ ২৬৭)। আমাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত
সম্পদ মানবতার সেবায় ব্যয় করতে হবে। দরিদ্র
মানুষের সহযোগিতায় সরকারের পাশাপাশি সকল
বিত্তশালী লোককে এগিয়ে আসতে হবে। সারা বছর,
সারা জীবন সাধ্যমত আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য
লাভের কথা বিবেচনা করে মানুষকে সাহায্য করতে
হবে। চিত্ত আর বিত্তের মিল ঘটানোর জন্যই আল্লাহ
পবিত্র কুরআনে বারবার মানুষকে আহবান করেছেন।
ঈদুল আযহার লক্ষ্য হচ্ছে সকলের সাথে সদ্ভাব,
আন্তরিকতা এবং বিনয়-ন¤্র আচরণ করা।
মুসলমানদের জীবনে এই সুযোগ সৃষ্টি হয় বছরে মাত্র
দু’বার। ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা একই কাতারে
দাঁড়িয়ে পায়ে পা এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুই
রাক‘আত ছালাত আদায়ের মাধ্যমে মানুষে মানুষে
ভেদাভেদ ভুলে যায়। পরস্পরে কুশল বিনিময় করে
আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়, জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যময়
এবং আন্তরিক মহানুভবতায় পরিপূর্ণ করে। মূলতঃ
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে দৈন্য, হতাশা তা
দূরীকরণের জন্য ঈদুল আযহার সৃষ্টি হয়েছে। যারা
অসুখী এবং দরিদ্র তাদের জীবনে সুখের প্রলেপ
দেওয়া এবং দারিদ্রের কষাঘাত দূর করা
সামর্থ্যবান মুসলমানদের কর্তব্য।

মানবপুত্রের কোন সৎ কর্মই আল্লাহর কাছে কুরবানীর
দিনে রক্ত প্রবাহিত করার চাইতে অধিকতর প্রিয়
নয়। ক্বিয়ামতের দিনে কুরবানীর পশুর শিং, লোম আর
ক্ষুর সমূহ নিয়ে হাজির করা হবে। কুরবানীর রক্ত
মাটি স্পর্শ করার পূর্বেই আল্লাহর কাছে তার
ছওয়াব গ্রাহ্য হয়ে যায়। আল্লাহর কাছে কুরবানীর
ছওয়াব গ্রাহ্য হওয়ার তাৎপর্য কি? যে অকুণ্ঠ ঈমান
আর ত্যাগের মহিমায় উদ্দীপ্ত হয়ে ইবরাহীম
খলীলুল্লাহ (আঃ) স্বীয় প্রাণাধিক পুত্রের স্কন্ধে
ছুরি উত্তোলিত করেছিলেন, কুরবানীর পশুর গলায়
ছুরি দেওয়ার সময়ে ইবরাহীমের মানস সন্তানদের
হৃদয়তন্ত্রী সেই ঈমান ও ত্যাগের সুরে যদি অনুরণিত
না হয়ে উঠে, তাদের দেহ আর মনের পরতে পরতে
আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের আকুল আগ্রহ যদি
উদ্বেলিত না হয়, তাহ’লে তাদের এই কুরবানীর উৎসব
গোশতখুরীর পর্বেই পর্যবসিত হবে। আল্লাহ
দ্ব্যর্থহীন ভাষায় কুরবানীদাতাদের সাবধান করে
দিয়েছেন, ‘কুরবানীর পশুর রক্ত, গোশত কোন কিছুই
আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, পৌঁছে কেবল তোমাদের
তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি’ (সূরা আল হজ্জ ৩৭)।
অর্থাৎ কুরবানীদাতা যেন আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে
তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই কুরবানী করে। পরিশেষে বলতে
চাই, আল্লাহর রাহে জীবন উৎসর্গ করার জাযবা
সৃষ্টি করা, ইবরাহীমের পুত্র কুরবানীর ন্যায় ত্যাগ-
পূত আদর্শকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং আল্লাহর
অনুগ্রহকে স্মরণ করা ও তাঁর বড়ত্ব প্রকাশ করাই
কুরবানী প্রকৃত তাৎপর্য।

ঈদুল আযহার শিক্ষা: জাতীয় কবি কাজী নজরুল
ইসলামের ভাষায় বলতে হয়, ‘তোরা ভোগের পাত্র
ফেলরে ছুঁড়ে, ত্যাগের তরে হৃদয় বাঁধ’। মানুষ আল্লাহর
জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করবে, এই শিক্ষাই
ইবরাহীম (আঃ) আমাদের জন্য রেখে গেছেন।
মহানবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) আমাদের জন্য ঐ ত্যাগের
আনুষ্ঠানিক অনুসরণকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন।
আর ঈদুল আযহার মূল আহবান হ’ল সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর
প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য প্রকাশ করা। সকল দিক হ’তে
মুখ ফিরিয়ে এক আল্লাহর দিকে রুজু হওয়া। সম্পদের
মোহ, ভোগ-বিলাসের আকর্ষণ, সন্তানের স্নেহ,
স্ত্রীর মুহাববত সবকিছুর ঊর্ধ্বে আল্লাহর সন্তুষ্টি
প্রতি আত্মসমর্পণ করে দেওয়াই হ’ল ঈদুল আযহার মূল
শিক্ষা। স্বামী, স্ত্রী ও শিশুপুত্রের গভীর
আত্মবিশ্বাস, অতলান্তিক ঈমানী প্রেরণা, আল্লাহর
প্রতি নিশ্চিন্ত নির্ভরতা ও অবশেষে আল্লাহকে
খুশী করার জন্য তাঁর হুকুম মোতাবেক জীবনের
সর্বাধিক প্রিয় একমাত্র সন্তানকে নিজ হাতে যবহ
করার কঠিনতম পরীক্ষায় উত্তরণ-এসবই ছিল আল্লাহর
প্রতি অটুট আনুগত্য, গভীর আল্লাহভীতি এবং নিজের
তাওহীদ ও তাকওয়ার সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা। ইবরাহীম
(আঃ) আল্লাহর হুকুমে পুত্র কুরবানী করেছিলেন।
মূলতঃ তিনি এর দ্বারা পুত্রের মুহাববতকে কুরবানী
করেছিলেন। আল্লাহর ভালোবাসার চাইতে যে
পুত্রের ভালোবাসা বড় নয়, এটিই প্রমাণিত হয়েছে
তাঁর আচরণে। আল্লাহ এটাই চেয়েছিলেন। আর এটাই
হ’ল প্রকৃত তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি। ইবরাহীম
(আঃ) তাঁর প্রিয়পুত্র ইসমাঈল (আঃ)-কে কুরবানী
করে এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যাতে
অনাগত ভবিষ্যতের অগণিত মানুষ আল্লাহর নিকট
আত্মসমর্পণের বাস্তব শিক্ষা লাভ করতে পারে।
প্রতি বছর যিলহজ্জ মাসে মুসলিম জাতি পশু
কুরবানীর মাধ্যমে ইবরাহীম (আঃ)-এর স্মৃতি স্মরণ
করে এবং পশু কুরবানীর সাথে সাথে নিজেদের
পশুবৃত্তিকে কুরবানী দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি
অর্জনের চেষ্টা করে। ইসমাঈল নবীন বয়সেই
বিশ্ববাসীকে আত্মসমর্পণের এক বাস্তব ও জ্বলন্ত
শিক্ষা প্রদান করেন। মূলতঃ আল্লাহর রাহে নিজের
সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়ার নামই হ’ল আত্মসমর্পণ।

পিতা-পুত্র আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের যে
অনুপম আদর্শ স্থাপন করে গেছেন, তা যেমন অতুলনীয়,
তেমনি চির অনুকরণীয়। আজকে ইবরাহীমী আদর্শে
অনুপ্রাণিত হয়ে পশু কুরবানীর সাথে সাথে আমাদের
দৃপ্ত শপথ নিতে হবে যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির
উদ্দেশ্যে জান, মালসহ যেকোন ত্যাগ স্বীকার
করতে আমরা প্রস্ত্তত আছি। আর এটিই হ’ল কুরবানীর
শিক্ষা। এই স্বর্ণোজ্জ্বল আদর্শ যুগে যুগে
বিশ্ববাসীকে বারবার এই পরম সত্যটিকেই হৃদয়ঙ্গম
করাতে চেয়েছে যে, আল্লাহই একমাত্র সার্বভৌম
ক্ষমতার মালিক, তাঁর ইচ্ছা ও সন্তুষ্টির প্রতি
আনুগত্য প্রদর্শনই প্রকৃত মুমিনের কাজ এবং তাতেই
নিহিত রয়েছে অশেষ কল্যাণ ও প্রকৃত সফলতা।
ইবরাহীম (আঃ) সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করেছিলেন, হয়েছিলেন
স্বয়ং আল্লাহ ঘোষিত মানবজাতির ইমাম। তিনি
মানবজাতির আদর্শ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যারা
আল্লাহ ও পরকালের ভয় কর তাদের জন্যে ইবরাহীম
ও তাঁর অনুসারীদের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ’ (সূরা
মুমতাহিনা ৪-৬)।

আদম (আঃ)-এর সময় থেকেই চলে আসা কুরবানীর
প্রথা পরবর্তীকালের সকল নবী-রাসূল, তাঁদের উম্মত
আল্লাহর নামে, কেবল তাঁরই সন্তুষ্টির জন্য কুরবানী
করে গেছেন। এ কুরবানী কেবল পশু কুরবানী নয়।
একদল কোরবানির ভাবাদর্শ না বোঝে একে ‘পশুবধ'
মনে করে বিভ্রান্তির পথে চলেছে, আরেক দল লোক
দেখানোর জন্যে বড় বড় পশু কোরবানি করে নাম
কামানোর চেষ্টা করছে। বাজারের সবচেয়ে দামি
ও বিশাল পশুটিকে কিনে, সেটাকে সাজিয়ে মিছিল
করে শহরময় প্রচার করলে কোরবানির অন্তর্নিহিত
আদর্শ চরম অবমাননার মধ্যে নিপতিত হয়। কোরবানির
উদ্দেশ্য আল্লাহ সোবহানাহু তায়ালার সন্তুষ্টি
অর্জন, তাঁর প্রতি আনুগত্য ও মান্যতা প্রদর্শন-নিজের
বড়াই নয়। ব্যক্তিগত কোনো উদ্দেশ্য মিশ্রিত হয়ে
গেলে কোরবানির আমলই বরবাদ হয়ে যেতে পারে।
নিজের পশুত্ব, নিজের ক্ষুদ্রতা, নীচতা, স্বার্থপরতা,
হীনতা, দীনতা, আমিত্ব ও অহংকার ত্যাগের
কুরবানী। নিজের ছালাত, কুরবানী, জীবন-মরণ ও
বিষয়-আশয় সব কিছুই কেবল আল্লাহর নামে, শুধু তাঁরই
সন্তুষ্টির জন্য চূড়ান্তভাবে নিয়োগ ও ত্যাগের মানস
এবং বাস্তবে সেসব আমল করাই হচ্ছে প্রকৃত
কুরবানী। এই কুরবানীর পশু যবেহ থেকে শুরু করে
নিজের পশুত্ব যবেহ বা বিসর্জন এবং জিহাদ-
কিতালের মাধ্যমে আল্লাহর রাস্তায় শাহাদতবরণ
পর্যন্ত সম্প্রসারিত। এই কুরবানী মানুষের তামান্না,
নিয়ত, প্রস্ত্ততি, গভীরতম প্রতিশ্রুতি থেকে আরম্ভ
করে তার চূড়ান্ত বাস্তবায়ন পর্যন্ত সম্প্রসারিত।
ঈদুল আযহার সময়, হজ্জ পালনকালে মুসলিমের পশু
কুরবানী উপরোক্ত সমগ্র জীবন ও সম্পদের কুরবানীর
তাওহীদী নির্দেশের অঙ্গীভূত এবং তা একই সঙ্গে
আল-কুরআনে আল্লাহ কর্তৃক ঘোষিত মানব জাতির
ইমাম ইবরাহীম (আঃ)-এর পুত্র কুরবানীর চরম পরীক্ষা
প্রদান ও আদর্শ চেতনার প্রতীকী রূপ।

শেষকথা : মুসলিম পরিবারের প্রতিটি মানুষেরই
একমাত্র আদর্শ হবে আল্লাহর হুকুমের কাছে মানা নত
না করা। বরং আল্লাহর হুকুমের কাছে আত্মসমর্পণ
করাই হবে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। মুসলিম জাতির
পিতা ইবরাহীম (আঃ) এ শিক্ষাই দিয়ে গেছেন তাঁর
সন্তানদের। পবিত্র ঈদুল আজহার শিক্ষাই হচ্ছে
আত্মত্যাগে উজ্জীবিত হওয়া, মানবিক কল্যাণ সাধন
করা, সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সৌভ্রাতৃত্বের
বাঁধনকে আরো সুদৃঢ় করা। জনৈক উর্দূ কবি বলেন, ‘যদি
আমাদের মাঝে ফের ইবরাহীমের ঈমান পয়দা হয়,
তাহ’লে অগ্নির মাঝে ফের ফুলবাগানের নমুনা সৃষ্টি
হ’তে পারে’। সুতরাং আমরা যেন নিছক লৌকিকতা,
আত্মম্ভরিতা, বাহাদুরি ও প্রতিযোগিতামূলক
রক্তক্ষরণ ও গোশত ভক্ষণ করে মহান ঈদুল আজহার
তাৎপর্য ও শিক্ষাকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত না করি।
ইবরাহীমী ঈমান ও ইসমাঈলী আত্মত্যাগের উত্থান
যদি আবার জাগ্রত হয়, তবে আধুনিক জাহেলিয়াতের
গাঢ় তমিশ্রা ভেদ করে পুনরায় মানবতার বিজয়
নিশান উড্ডীন হবে। সমাজে শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরে
আসবে। তাই কুরবানীর পশুর গলায় ছুরি দেওয়ার পূর্বে
নিজেদের মধ্যে লুক্কায়িত পশুত্বের গলায় ছুরি
দিতে হবে। মহান আল্লাহর দরবারে আত্মসমর্পণকারী
ও আত্মত্যাগী হ’তে হবে। তাকওয়া ও আল্লাহভীতি
অর্জনের মাধ্যমে প্রকৃত মুমিন বা মুত্তাকী হ’তে
হবে। আমাদের ছালাত, কুরবানী, জীবন-মরণ সবকিছু
আল্লাহর জন্যই উৎসর্গ হোক, ঈদুল আযহায় বিধাতার
নিকট এই থাকুক প্রার্থনা। তাইতো আমাদের প্রিয়
কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর ‘কুরবানী’ কবিতায়
লিখেছেন:
“ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন
ঐ খুনের খুঁটিতে কল্যাণকেতু লক্ষ্য ঐ তোরণ
আজি আল্লাহর নামে জান কোরবানে
ঈদের পূত বোধন।
ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন॥”

ইসলাম ধর্মে জন্মদিন পালনের বিধান কি?

আসসালামু আলাইকুম!

আশা করি সবাই ভালো আছেন। মাঝে মাঝে কিছু
ব্লগার ধর্মীয় ব্যপারে এমন কিছু পোষ্ট দেন যা
সাধারনত সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্যে
পরিনত করেন। এটা একটা বড় ধরনের গোনাহের কাজ,
যদি ধর্ম সম্পর্কে সঠিক এবং সহীহ কোন দলীল খুঁজে
না পাওয়া যায় তার প্রচার এবং প্রসার থেকে
আমাদের অবশ্যই সাবধান থাকা উচিত। মনে রাখতে
হবে যে ইসলাম পরিপূর্ণ ধর্ম এবং এখানে কোন কিছুর
নতুন সংযোজন বা বিয়োজনের সুযোগ নাই। সত্যের
জয় সর্বদাই হবে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হবেই কারন
মিথ্যা বিলুপ্ত হবার জন্যই।

আসুন মিলাদ এবং ঈদে মিলাদুন্নবীর ইতিহাস
সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি। অতঃপর সিদ্ধান্ত নেই
কোনটা সঠিক এবং বেঠিক। ইতিহাস না জানলে এই
সিদ্ধান্তে আসা বড়ই কষ্টকর।আমাদের সমাজে
বিদআ’ত এমন ভাবে ঢুকে গেছে যে তার বিরূদ্ধে কথা
বললে আলিম সমাজ ‘অমুসলিম’ বলে গালি দিতে
এবং ‘ইসলাম থেকে খারিজ’ করতে ডানে বায়ে
তাকায় না। এসব বিদআ’ত শরীরে টিউমারের মতো
জেগে উঠেছে আর আমাদের আলিম সমাজ এসকল
টিউমার অপারেশনের পরিবর্তে স্বাস্থ্যের অংশ
বলে প্রচার প্রসার করে বেড়াচ্ছেন, আর সাধারন
মুসলমানগণ ভাবছেন ‘আরে তাইতো, নিশ্চই টিউমার
সুস্বাস্থের অংশ!!”

আল কুরআনের কোন আয়াত বা কোন হাদীস দ্বারা
কারো জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালনের কোনই প্রমাণ
পাওয়া যায় না।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে যাঁর সবচেয়ে বেশী
ভালোবাসতেন সে সব সাহাবাগণ বিশ্বনবী (সাঃ)
এর জীবিতকালে অথবা তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর জন্ম বা
মৃত্যু বার্ষিকী পালন করেননি। এমনকি রাসূল (সাঃ)
এর একমাত্র পূত্র ইবরাহীম ছাড়া বাকী পুত্রগণ
তাদের জন্মের এক বছরের মধ্যেই মারা যায়। শুধু
মাত্র ইবরাহীম ষোল মাস বয়সে মারা যায়।এজন্য
নাবী (সাঃ) এতই দুঃখিত হন যে, তাঁর চোখ দিয়ে
পানি ঝরতে থাকে। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত) কিন্তু
এই আদরের ছেলেটির জন্মের দ্বিতীয় বছরে
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তার “মৃত্যু” অথবা “জন্মোৎসব
পালন করেননি।

ইসলামের দৃষ্টিতে জন্ম দিবস,মৃত্যু দিবস পালন করা
এবং এ উপলক্ষে যে সমস্ত আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন
করা হয় তা হারাম এবং বিদআত।জন্ম দিবস এবং মৃত্যু
দিবস পালনের কোন প্রমাণ কিংবা চর্চা রাসুল সা.
কিংবা তাঁর সাহাবী (রাঃ) দের মাধ্যমে হয়েছিল
বলে কোন প্রমাণ নাই।
ইসলামে সকল হুকুম আহকাম, আচার-অনুষ্ঠান
সুনির্ধারিত ও কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস দ্বারা
প্রমাণিত।কিন্তু নবী কারীম সা.এর জন্ম দিবস,মৃত্যু
দিবস পালনের কথা কোথাও নেই। এমনকি নবী
প্রেমের নজীরবিহীর দৃষ্টান স্থাপনকারি সাহাবায়ে
কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমদের কেহ এ ধরনের কাজ
করেছেন বলে কোন প্রমাণ নেই।

ইসলামে কম হলেও একলাখ চব্বিশ হাজার নবী,
তারপরে খুলাফায়ে রাশেদীন ও অসংখ্য সাহাবা,
মনীষি আওলিয়ায়ে কেরাম জন্ম গ্রহণ করেছেন ও
ইন্তেকাল করেছেন। যদি তাদের জন্ম বা মৃত্যু দিবস
পালন ইসলাম সমর্থিত হত বা সওয়াবের কাজ হত
তাহলে বছরব্যাপী জন্ম-মৃত্যু দিবস পালনে ঘূর্ণাবর্তে
আবদ্ধ হয়ে যেতে হত আমাদের সকল মুলমানদের।
রাসূলুল্লাহ সা. এর সাহাবাগন ছিলেন
সত্যিকারার্থে নবীপ্রেমিক ও সর্বোত্তম অনুসারী।
নবী প্রেমের নজীর ও দৃষ্টান্ত তারাই স্থাপন
করেছেন। তারা কখনো নবী কারীম সা. এর জন্মদিনে
অনুষ্ঠান পালন করেননি। যদি এটা করা ভাল হত ও
মহব্বতের পরিচায়ক হত তবে তারা তা অবশ্যই করতেন।
আর জন্মোৎসব পালন করার কালচার সম্পর্কে তাদের
কোন ধারণা ছিল না তা বলা যায় না। কেননা তাদের
সামনেই তো খৃষ্টানরা ঈসা আলাইহিস সালাম-এর
জন্মদিন ( বড়দিন) উদযাপন করত।
তাছাড়া নবী কারীম সা. এর জন্মদিন পালনের
প্রস্তাব সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম
কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। যেমন হিজরী
ক্যালেন্ডার প্রবর্তিত হওয়া সময় উমার
রাদিয়াল্লাহু আনহু সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে
বৈঠকে বসলেন। কোন এক স্মরনীয় ঘটনার দিন থেকে
একটি নতুন বর্ষগণনা পদ্ধতি প্রবর্তন করা হবে বলে
সিদ্ধান- নেয়া হয়। কেউ কেউ প্রস্তাব করলেন
রাসূলুল্লাহ সা. এর জন্ম তারিখ থেকে সন গণনা শুরু
করা যেতে পারে। উমর রাঃ এ প্রস্তাব বাতিল করে
দিয়ে বললেন যে এ পদ্ধতি খৃষ্টানদের। উমার রাঃ এর
এ সিদ্ধানে-র সাথে সকল সাহাবায়ে কেরাম একমত
পোষণ করলেন। এবং রাসূলে কারীম সা. এর হিজরত
থেকে ইসলামী সন গণনা আরম্ভ করলেন।
যেহেতু রাসুল সা. এর জন্ম দিবস এবং মৃত্যু দিবস
পালন করা জায়েয নয় সেহেতু অন্য কারো
জন্মদিসবস,মৃত্যু দিবস পালন করা শরিয়ত সম্মত নয়।
কিন্তু দুঃখের বিষয় এগুলো ধর্মের নামে চালু করা
হয়েছে কিন্তু এসব আনুস্থানিকতা পালনে ইসলামের
কোন সমর্থন নেই।আমাদের সমাজে সমাজে পিতা-
মাতা, দাদা-দাদী সন্তান-সন্ততি,নেতা নেত্রীর
জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকী নানা আনুস্থানিকতা এবং
অত্যন্ত জমজমাট ভাবে পালন করা হয়ে থাকে।
সেখানে অনেক টাকা-পয়সা খরচ করে বিশাল
খাবার-দাবারের আয়োজন ও অন্যান্য আনুস্থানিকতা
করা হয়ে থাকে,কিন্তু আমরা কজনে জানি বা
জানার চেষ্টা করি যে,জন্ম বার্ষিকী এবং
মৃত্যুবার্ষিকী আনন্দ উৎসব বা শোক পালন করা
ইসলামি চেতনার পরিপন্থি।

জন্ম দিবস বা মৃত্যু দিবস কেন্দ্রিক আচার অনুষ্ঠান
খৃষ্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও অন্যান্য অমুসলিমদের
ধর্মীয়রীতি।তাই এটা মুসলিমদের জন্য পরিত্যাজ্য।
বিধর্মীদের ধর্মীয় রীতি-নীতি, আচার-অনুষ্ঠান যতই
ভাল দেখা যাক না কখনো তা মুসলিমদের জন্য গ্রহণ
করা জায়েয নয়।
রাসূলে কারীম সা. বলেছেন – “যে ব্যক্তি কোন
জাতির সাদৃশ্যতা গ্রহণ করবে সে তাদের অনর্ভূক্ত
বলে গণ্য হবে।”
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর জীবিতকালে ওয়াহী দিবস,
কুরআন নাযিল দিবস, পৃথিবীর প্রথম মানুষ আদম (আঃ)
এর জন্ম বা মৃত্যু দিবস, মুসলিম জাতির পিতা
ইবরাহীম (আঃ) এর জন্ম বা মৃত্যু দিবস এসেছে কিন্তু
রাসূল (সাঃ) এভাবে কোন নবীর স্মরণে বা কোন
সাহাবার শাহাদাত দিবস অথবা কোন জিহাদের
দিবস পালন করেন নাই এবং নির্দেশও দেন নাই। বরং
তিনি বলে গেছেন , আমার পরে আমার শরীআ’তের
মধ্যে যে সকল নতুন কাজকর্ম আবিষ্কার হবে, আমি
তা হতে সম্পর্কহীন এবং ঐ সকল কাজকর্ম মারদূদ
পরিত্যাজ্য ও ভ্রষ্ট। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত) তাই
মীলাদুন্নবী ও মৃত্যুবার্ষিকী কিংবা কোন জীবিত ও
মৃত ব্যক্তির জন্মবার্ষিকী বা মৃত্যুবার্ষিকী পালন
করা কুরআন ও হাদীসের দৃষ্টিতে বিদ’আত তথা
মনগড়া কাজ। আর ইতিহাসের দৃষ্টিতে ইয়াহুদী,
খৃষ্টান ও অগ্নিপুজকদের অন্ধ অনুসরণ তথা ইসলাম
বিরোধী কাজ। আর এসব জন্ম-মৃত্যু বার্ষিকী পালন
কার তো বৈধ নয়ই বরং এগুলো থেকে অবশ্যই বিরত
থাকা জরুরী।