Fetching data...

Tuesday, 20 March 2018

নবী করিম (সাঃ) এর বাণী হাদীস ৩১-৪০

হাদিস নং৩১

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- যে উত্তমরুপে অযু করে তাহার সমস্ত গুনাহ শরীরর হইতে বাহির হইয়া যায়। এমননি নখর হইতেও বাহির হইয়া যায়।
হাদিস নং৩২

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- আল্লাহর তায়ালার নিকট জামায়াতের নামায খুবই পছন্দনীয়।
হাদিস নং৩৩

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- যে ব্যক্তি এলেমের একটি অধ্যায় এই নিয়তে শিক্ষা করিল যে, তদ্বারা লোকদিগকে শিক্ষা দিবে তাহাকে ৭০ জন শহিদের নেক দান করা হইবে।
হাদিস নং৩৪

যে ব্যক্তি দ্বীনের এলেম দুনিয়া কামাইর উদ্দেশ্যে হাসিল করে কেয়ামতের দিন ঐ ব্যক্তি জান্নাতের গন্ধ ও পাইবে না।
হাদিস নং৩৫

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- আলেকদের মুখ দর্শন করাও নেকের কাজ।
হাদিস নং৩৬

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- যে গৃহে আল্লাহর যিকির হয় আকাশ হইতে ফেরেস্তারা তাকে এতই উজ্জল দেখেন, আমরা দুনিয়াবাসীরা আকাশের তারকারাশি যেমন উজ্জল দেখি।
হাদিস নং৩৭

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- যাহাদের চেহারা দেখিলেই আল্লাহর কথা স্মরন হয় তাহারই আল্লাহর ওলী।
হাদিস নং৩৮

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- যে আল্লাহর নিকট কিছু চায়না আল্লাহ তাহার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকেন।
হাদিস নং৩৯

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- দেহের জন্য যেরুপ মস্তক, দীনের জন্য সেরুপ নামায।
হাদিস নং৪০

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- হারামের গন্ধ নাই এমন হালাল বস্তু যে ৪০ দিন খায় আল্লাহ তাহার দিলকে দীনের নূরে নূরানী করিয়া দেন এবং তাহার দিলে হেকমতের (জ্ঞানের) ঝর্না যারী করিয়া দেন।

নবী করিম (সাঃ) এর বাণী হাদীস ২১-৩০

হাদিস নং২১

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- যে ব্যক্তি গরীব ও বিধবার সাহায্যে দৌড়ায় সে ঐ ব্যক্তির ন্যয় যে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য দৌড়ায়।
হাদিস নং২২

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- যে কেহ জুমুআর দিন ১ হাজার বার দুরুদ শরীফ পাঠ করিবে সে মৃত্যুর পূর্বে তাহার বাসস্থান বেহেস্ত দেখিয়া লইবে।
হাদিস নং২৩

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- তোমরা কবর যিয়ারত করিও কারন ইহা মানুষকে মৃত্যু স্মরন করাইয়া দেয়।
হাদিস নং২৪

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- আল্লাহ তায়ালা আমার সকল উম্মতকে ক্ষমা করিবেন কিন্তু যে সকল লোক বাহাদুরীর সহিত প্রকাশ্যে পাপ করে তাহাদিগকে ক্ষমা করিবেন না।
হাদিস নং২৫

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- যে ব্যক্তি পিতা মাতা বা কোন একজনের কবর সপ্তাহে একবার জিয়ারত করে তাহার গুনাহ মাফ করিয়া দেওয়া হয় এবং বাধ্য সন্তান বলিয়া তাহার নাম লিখা হয়।
হাদিস নং২৬

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- পেশাব সম্পর্কে খুব সতর্কতা অবলম্বন কর। কেন না অধিকতর কবরেরর আযাব ইহার জন্যই হইবে।
হাদিস নং২৭

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- যে ব্যক্তি আমার উপর দুরুদ পড়া ভুলে গিয়েছে সে বেহেস্তের পথ ভুলিয়া গিয়াছে।
হাদিস নং২৮

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- যাহারা স্ত্রী লোকদের পর্দায় রাখেনা বা পর্দায় রাখতে শাসন করে না এবং তাহাদিগকে কোন কুকার্য করিতে দেখিলেও মানা করেনা তাহারাই দাইউছ। দাইউছ বেহেস্তের সুগন্ধি কিছুই পাইবে না। তাহাকে ৫০০ বৎসর দূর হইতে দোযখে ফেলিয়া দিবে। তাহাদের জন্য বেহেস্ত হারাম।
হাদিস নং২৯

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- যাহার অন্তরের মধ্যে সরিষা পরিমান অহংকার থাকিবে সে বেহেস্তে যাইবে না।
হাদিস নং৩০

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- যেরুপ পানি দ্বারা শস্য উৎপাদন হয় সেরুপ গান বাজনা দ্বারা মানুষের মনে মোনাফেকী ও কপটতার বীজ অংকুরীত হয়।

হযরত মোহাম্মদ সাঃ এর বাণী হাদীস ১১-২০

হাদিস নং১১

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- যে কোরআন পড়িয়া ভুলিয়া যায় কেয়ামতের দিন সে আল্লাহর সহিত কান ও নাক কাটা অবস্থায় সাক্ষাৎ করিবে।।
হাদিস নং১২

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- বসিয়া থাকার মধ্যে সবচেয়ে উত্তম হল কেবলামুখী হইয়া বসা।
হাদিস নং১৩

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- মুমিনকে চিনিবার উপায় এই যে, সে হবে দাতা ও সাদা সিধা দরনের লোক।
হাদিস নং১৪

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- এক ঘন্টা আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করা ৭০ বৎসরের ইবাদত অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।
হাদিস নং১৫

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- যখন কোন বান্দা সেজদাতে থাকে তখন সে আল্লাহর অতি নিকটে থাকে। সুতরাং বেশী করিয়া দোয় চাও।
হাদিস নং১৬

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- যে মদ পান করেন আল্লাহ তায়ালা তাহার ৪০ দিনের নামায কবুল করেন না।
হাদিস নং১৭

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- যাহার দুই বিবি অথচ উভয়ের সাথে ন্যায় বিচার করে নাই কেয়ামতের দিন তাহার বাহু বিচ্ছিন্ন হইয়া যাইবে।
হাদিস নং১৮

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- গরীব লোক ধনবান লোকদের চাইতে ৫০০ বৎসর আগে বেহেস্তে যাইবে আর ৫০০ বৎসর কেয়ামতের অর্ধ দিবসের সমান।
হাদিস নং১৯

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- তোমাদের পিতা মাতার নিকট হতে ফিরিয়া যাইওয়া। যে পিতা মাতার নিকট হইতে ফিরিয়া যায় সে কাফেরে গন্য।
হাদিস নং২০

নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- তিনটি বিষয়ের জন্য আরববাসীকে ভালবাস। কেননা আমি আরববাসী, কুরআন আরবী ভাষায় এবং জান্নাতবাসীদের ভাষা আরবী।

Tuesday, 13 February 2018

জুমু‘আর দিনের নিষিদ্ধ কার্যাদি

দ্বিতীয় আযানের পরে বেচা-কেনা:

আল্লাহ তা‘আলা-এর বাণী:

‘‘হে ঈমানদারগণ! জুমু‘আর দিনে যখন সালাতের আযান দেওয়া হয়, তখন আল্লাহর যিকিরের দিকে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ছেড়ে দাও। এটিই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা তা জানো।” [সূরা আল-জুমু‘আ, আয়াত: ৯]

মানুষের কাঁধের পর দিয়ে অতিক্রম করা এবং দুই জনকে বিচ্ছিন্ন করা।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খুৎবারত অবস্থায় এক ব্যক্তি এসে লোকদের কাঁধের ওপর দিয়ে অতিক্রম করছিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, ‘‘তুমি আসতে দেরীও করলে এবং (মানুষকে) কষ্টও দিলে।”

কাউকে উঠিয়ে দিয়ে তার স্থানে বসা।

ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাউকে উঠিয়ে দিয়ে তার স্থানে বসতে নিষেধ করেছেন। ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমার ছাত্র নাফে‘ কে জিজ্ঞাসা করা হলো- এটা কি জুমু‘আর সালাতের ব্যাপারে? তিনি উত্তরে বললেন: জুমু‘আ হোক বা অন্য কিছু হোক

জুমু‘আর সালাতের পূর্বে মসজিদে দলবদ্ধ হয়ে বসা।

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমু‘আর সালাতের পূর্বে মসজিদে দলবদ্ধ হয়ে বসতে নিষেধ করেছেন।”

খুৎবা অবস্থায় বৃষ্টির জন্য দো‘আ ব্যতীত অন্য কোনো দো‘আতে হাত না উঠানো (ইমাম হোক বা মুক্তাদি হোক)।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সাব্যস্ত আছে যে: তিনি যখন জুমু‘আর খুৎবাতে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করেন, তখন তিনি তাঁর দুহাত উঠান এবং সাহাবায়ে কেরামগণও তাঁদের দু’হাত উঠান।

জুমু‘আর দিনকে বিশেষ কোনো সালাত ও সাওমের জন্য নির্দিষ্ট করা।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘‘অন্যান্য দিনসমূহের মধ্যে জুমু‘আর দিনকে বিশেষ কোনো সাওমের জন্য এবং জুমু‘আর রাতকে বিশেষ কোনো সালাতের জন্য নির্দিষ্ট করো না। তবে যদি তোমাদের কারো কোনো (নফল) সাওমের দিন সেই দিনেই পড়ে যায় (তাহলে তাতে কোনো আপত্তি নেই)।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন: ‘‘তোমাদের কেউ জুমু‘আর দিনে রোযা রেখো না। তবে তার আগের একদিন অথবা পরের একদিন সহ রাখতে পার।”

সালাম আদান-প্রদানে ভুল করা উচিত নয়

সালাম আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে অনেকেই বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল করে থাকেন। একটু সতর্ক হলেই এসব ভুল এড়িয়ে সুন্দরভাবে সালাম আদান-প্রদান করা সম্ভব। কিন্তু আমরা অনেকেই এসব ভুলকে গুরুত্ব দিই না। তবে অনাকাঙ্ক্ষিত এসব ভুলের জন্য সালাম দিয়ে সওয়াব অর্জনের বিপরীতে আমাদের গুনাহ হয়।

ফলে সঠিকভাবে সালাম দেওয়ার জন্য ভুলগুলো জেনে তা থেকে আমাদের মুক্ত থাকা উচিত।

১. অশুদ্ধ উচ্চারণে সালাম দেওয়া: এটি মারাত্মক ভুল কাজ। আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ হচ্ছে পূর্ণ সালাম। শুধু আসসালামু আলাইকুম বললেও চলবে। তবে উচ্চারণে ভুল করা যাবে না।

২. ছোটদের প্রতি বড়দের সালাম না দেওয়া: এটিও ভুল প্রচলন। বড় বা বয়স্ক মানুষ ছোটদের সালাম দিতে কোনো বাধা নেই। যেমন- শিক্ষক ছাত্রদের এবং বাবা-মা সন্তানদের সালাম দেবেন। আগে সালামকারী বেশি সওয়াব ও মর্যাদার অধিকারী হয়ে থাকেন।

৩. অপরিচিত কাউকে সালাম না দেওয়া: পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দেওয়ার নির্দেশ এসেছে। তাই পরিচিত ও মুখ চিনে সালাম দেওয়া গর্হিত ও নিন্দিত কাজ।

৪. সালাম দেওয়ার সময় মাথা ও বুক ঝুঁকে নিচু করা: সালাম দেওয়ার সময় মাথা ও বুক ঝুঁকে নিচু হয়ে সালাম দেওয়া নিষেধ। অনেকে পদস্থ বা বড় কোনো ব্যক্তিকে সালাম দেওয়ার সময় এমন করে থাকে। হাদিসে এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। এ থেকে বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়।

৫. সালামের উত্তর দিয়ে আবার সালাম: আপনাকে কেউ সালাম দিল, আপনি উত্তর দেওয়ার পর ওই সালামকারীকে আবার সালাম দিলেন। অনেকে এ কাজটি অজ্ঞতাবশত করে থাকেন। উত্তম হলো, কারো সালামের অপেক্ষা না করে নিজেই আগে সালাম দেওয়া। কিন্তু কেউ আগে সালাম দিয়ে ফেললে তার সালামের উত্তর দেওয়াই নিয়ম। তাকে আবার সালাম দিতে হবে না।

৬. সালামের উত্তর না দিয়ে আবার সালাম: সালাম পাওয়ার পর উত্তর দেওয়াই বিধান। কিন্তু অনেকে সালাম দেওয়ার পর উত্তর না দিয়ে সালামদাতাকে আবার সালাম দেয়। এমনটি ঠিক নয়। দুজনের একজন সালাম দেবেন, অপরজন সালামের উত্তর দেবেন এটাই বিধান।

৭. সালাম দেওয়ার পর সালাম দিয়েছি বলা: কাউকে সালাম দেওয়ার পর সালাম না শুনলে বা উত্তর না-দিলে আমরা বলি, ‘আপনাকে সালাম দিয়েছি’। এভাবে বলা ঠিক নয়। তাকে আবার পূর্ণ সালাম দেওয়াই নিয়ম।

৮. কতক্ষণ বসার পর সালাম দেওয়া: সাক্ষাতের শুরুতেই সালাম দেওয়া সুন্নত। কতক্ষণ বসার পর সালাম করা অনুচিত।

৯. সালাম পাঠানোর পদ্ধতি: কারো কাছে সালাম পাঠানোর দরকার হলে আমরা বলি, অমুককে গিয়ে আমার সালাম দেবেন/বলবেন। এভাবে বলা ঠিক নয়। নিয়ম হল এভাবে বলা, অমুককে আমার পক্ষ থেকে আসসালামু আলাইকুম… বলবেন। তেমনি, সালাম পৌঁছানোর পরও ‘অমুকে আপনাকে সালাম দিয়েছেন’ এ রকম না বলে বলা উচিত, অমুক আপনাকে আসসালামু আলাইকুম… বলেছেন।  এক্ষেত্রে সালামের উত্তরদাতাও কেবল প্রেরককে উত্তর দেবেন না। বরং প্রেরক ও বাহক উভয়কে দোয়ায় শরিক করবেন। তিনি এভাবে উত্তর দেবেন, ওয়া আলাইকা ওয়া আলাইহিস সালাম।

১০. ফোনে বা সাক্ষাতে সালামের আগে হ্যালো বা অন্যকিছু বলা: ফোন বা মোবাইল ফোনে সালাম দেওয়ার আগে হ্যালো বা অন্য কোনো কথা বলা ঠিক নয়। আগে সালাম দিয়ে তারপর অন্য কথা বলবেন। হ্যালো বলার দরকার হলে সালাম দেওয়ার পর বলবেন। ফোন ছাড়া সাক্ষাতের বেলায়ও কথাবার্তার আগেই সালাম দেওয়াই সুন্নত। কেননা রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কথাবার্তা বলার আগে সালাম দিতে হয়। (তিরমিযি, হাদিস নং- ২৬৯৯)

১১. অনুষ্ঠান শেষে বা বিয়ের আকদ হওয়ার পর সালাম: অনেক জায়গায় দেখা গেছে, কোনো অনুষ্ঠান- বিশেষত দোয়া বা এ ধরনের কোনো মজলিস শেষ হওয়ার পর সালাম দেন অনেকে। এছাড়া বিয়ের আকদ হওয়ার পর বর উপস্থিত সবাইকে সালাম দেন। বর সালাম না দিতে চাইলে বা ভুলে গেলে অন্যরা তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সালাম দাও। না দিলে খারাপ এবং বেয়াদবি মনে করা হয়। এসব কুসংস্কার ও ভুল প্রচলন। সালাম হবে সাক্ষাতের সময়। সুতরাং কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার পর কারো সঙ্গে দেখা হলে তাকে সালাম করবেন। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষে সালামের প্রথা বর্জন করা উচিত।

১২. বক্তব্যে প্রথমেই সালাম দেওয়া: সাক্ষাতের শুরুতেই সালাম দিয়ে কথাবার্তা শুরু হবে- এটিই ইসলামের নিয়ম। কিন্তু আজকাল বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা যায়, বক্তা বিভিন্ন কথা বলার পর সালাম দেন। যেমন তিনি বলেন, মঞ্চে উপবিষ্ট মান্যবর সভাপতি, অতিথিরা… সবাইকে আমার সালাম আসসালামু আলাইকুম। এভাবে সালাম বলা ইসলামী রীতির পরিপন্থি। শ্রোতা ও দর্শকদের মুখোমুখি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই  সালাম দেওয়া নিয়ম।

লিখেছেন:  মুহিউদ্দীন

গিবত : এক ব্যাপক সামাজিক ব্যাধি

গিবত একটি আরবি শব্দ। গিবত অর্থ পরোক্ষ নিন্দা বা কারো অনুপস্থিতিতে তার দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করা। রাসূলে আকরাম সা: বলেন, ‘গিবত হচ্ছে কারো অসাক্ষাতে তার সম্পর্কে এমনসব কথাবার্তা বলা যেগুলো শুনলে সে অপছন্দ করবে’। সাহাবাকিরাম রাসূলুল্লাহ সা:-এর কাছে জানতে চাইলেন : ‘বাস্তবে যদি ওই ব্যক্তির মধ্যে সেসব দোষ-ত্রুটি থেকে থাকে, তাহলেও কি গিবত হবে!’ রাসূল সা: বলেন, ‘বাস্তবে তার মধ্যে সেসব দোষ-ত্রুটি থেকে থাকলেই তো তা হবে গিবত; আর যদি সেসব দোষ-ত্রুটি তার মধ্যে না-ই থেকে থাকে তা হলেতো তা হবে মিথ্যা অপবাদ আরবিতে যাকে বলা হয় বুহতান।’ তার মানে বুহতান গিবতের চেয়েও বড় অপরাধ। আর বুহতানের চেয়েও জঘন্য অপরাধ হলো ইফ্ক। ইফ্ক হলো মিথ্যা অপবাদকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দেয়া।

একদা এক বেঁটে মহিলা কোনো প্রয়োজনে হুজুর সা:-এর খেদমতে উপস্থিত হয়। প্রয়োজন শেষে মহিলা বিদায় নেয়ার পর হজরত আয়েশা (রা:) বললেন, ‘মহিলাটি কত বেঁটে’! তখন হুজুর সা: বললেন, ‘হে আয়েশা, এর দ্বারা তুমি সেই মহিলার গিবত করলে’। তার মানে গিবত এতটাই সূক্ষ্ম ব্যাপার যেকোনো ব্যক্তি সম্পর্কে এমন ক্ষুদ্রতম মন্তব্যও যা’ কিনা সে ব্যক্তি শুনতে পছন্দ করবে না, তা করাটা গিবতই হয়ে যাবে। আর আমরা অহরহ এমন গিবতের মধ্যে ডুবে আছি; বস্তুত আরো বড় ধরনের গিবতে লেগে আছি। বুহতান ও ইফ্কের মতো জঘন্য অপরাধের মধ্যে জড়িয়ে আছি। কারণ গিবত করতে যেমন আমাদের মজা লাগে, শুনতেও তেমনি আমরা আনন্দ পাই। তাই গিবত প্রতিহত করার ব্যাপারে আমাদের কোনো উদ্যোগ বা ভূমিকা লক্ষ করা যায় না।
গিবত এমনই এক সামাজিক অপরাধ যাকে স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আপন মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সাথে তুলনা করেছেন (সূরা- হুজুরাত : ১২)। আল্লাহর রাসূল সা: বলেছেন, ‘তোমরা গিবত থেকে বেঁচে থাক, কেননা গিবত জেনার চেয়েও জঘন্য’। কারণ গিবত হলো বান্দাহর হক । তাই গিবতের অপরাধ হতে মুক্ত হতে হলে গিবতকৃত ব্যক্তির কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়া ও ক্ষমা অর্জন করে নেয়া আবশ্যক।
গিবতের মধ্যে তিনটি মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে- ১. গিবতকারী ব্যক্তির দোয়া কবুল হয় না; ২. তার নেক আমল আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না; ৩. তাকে অসংখ্য পাপরাশীর বোঝা বহন করতে হবে। তবে যদি কারো মধ্যে এমন দোষ-ত্রুটি থাকে যা ধর্ম, রাষ্ট্র, দেশ, জাতি ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর তা প্রকাশ করা গিবতের অন্তর্ভুক্ত নয়।
এ ছাড়া গিবত জাতীয় আর একটা জঘন্য অপরাধের নাম হলো নামীমাহ বা চোগলখোরি। নামীমাহ হচ্ছে ফাসাদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একের কথা অপরের কাছে ছড়িয়ে বেড়ানো। কোনো ব্যক্তির কাছে অন্য ব্যক্তির বিরুদ্ধে গোপনে এমন কিছু বলা বা এমন কথা লাগানো যার ফলে আলোচ্য দুই ব্যক্তির মধ্যে দীর্ঘ দিনের ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়; এবং তদস্থলে তাদের মধ্যে দা-কুড়াল সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। এ হলো নামীমাহ বা চোগলখোরির কুফল। রাসূল সা: বলেন, চোগলখোর ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
অনেকে মনে করে থাকে, কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে শুধু তার পেছনে কিছু বলা বা মন্তব্য করাই অন্যায়; কিন্তু সামনা-সামনি বলাতে কোনো দোষ নেই। এটা অত্যন্ত ভুল ধারণা। সামনা-সামনি কোনো লোককে ভর্ৎসনা করা, কটাক্ষ করা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, অপমান-অপদস্থ করাকে কুরআন পাকে হুমাজাহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে; দাম্ভিকতা বা অহঙ্কার হলো হুমাজাহকারী ব্যক্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আর পেছনে পরনিন্দা, কুৎসা রটনা, চোগলখোরি করা তথা সব মাত্রার গিবতকে লুমাজাহ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। হুমাজাহ ও লুমাজাহ-এ উভয় প্রকারের অপরাধের শাস্তি হিসেবে কুরআন পাকে নিশ্চিত ধংস বা ওয়াইল নামীয় দোজখ সাব্যস্ত করা হয়েছে (সূরা-হুমাযাহ : ০১)।
আমাদের মনে রাখতে হবে- মানুষের মুখ থেকে এমন কোনো কথা বের হয় না যা রেকর্ড হয় না (সূরা-ক্বা’ফ : ১৮)। তাই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে প্রতিটি মন্দ কথা, প্রতিটি মিথ্যা কথা, প্রতিটি অন্যায় কথার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। অন্যথায় কাল কিয়ামতে-হাশরে এ সবের জবাব দিতে হবে। জবাব দেয়ার মতো আসলে কিছু থাকবে না; ফলে বিপদগ্রস্তই হতে হবে।
ইসলামী শরিয়াহর বিধান অনুযায়ী গিবত বা পরনিন্দা তথা গিবত সংশ্লিষ্ট সব অপরাধকবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত যা মূলত হারাম। গিবত একটা সামাজিক ব্যাধি। গিবতের মাধ্যমে সমাজে ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি হয়, বন্ধুত্ব ও আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট হয়, পরস্পরে ভুল বোঝাবুঝি ও শত্রুতার সৃষ্টি হয়, মানব জীবনে শান্তিশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়। গিবত করা যেমন হারাম, গিবত শ্রবণ করাও তেমনি হারাম। তাই গিবতকারীকে গিবতের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সজাগ করত তাকে গিবত থেকে বিরত রাখা শ্রবণকারীর কর্তব্য। মুসনাদ আহমদে বর্ণিত একটি হাদিসে উল্লেখ আছে, যে ব্যক্তি তার অপর ভাইয়ের গিবতকারীকে বাধা দেয় বা প্রতিরোধ করে তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ওপর বর্তায়।
লেখক : সাবেক সরকারি কর্মকর্তা

লোক দেখানোর জন্য দান

কিন্তু বর্তমান যুগে অনেক মানুষ এমন আছে, যারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে দান করে এবং তা মানুষকে দেখানোর জন্য। মানুষের ভালবাসা নেয়ার জন্য। মানুষের প্রশংসা কুড়ানোর জন্য। মানুষের মাঝে গর্ব অহংকার প্রকাশ করার জন্য। অনেকে দুনিয়াবি স্বার্থ সিদ্ধির জন্যও দান করে থাকে। যেমন, চেয়ারম্যান বা এমপি নির্বাচনে জেতার উদ্দেশ্য দান করে। কিন্তু দান যদি একনিষ্ঠ ভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না হয় তা দ্বারা হয়ত দুনিয়াবি কিছু স্বার্থ হাসিল হতে পারে কিন্তু আখেরাতে তার কোন প্রতিদান পাওয়া যাবে না।
হাদীছে কুদসীতে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন আল্লাহ বলেন:
“আমি শির্ক কারীদের শিরক থেকে মুক্ত। যে ব্যক্তি কোন আমল করে তাতে আমার সাথে অন্যকে শরীক করবে, তাকে এবং তার শির্কী আমলকে আমি পরিত্যাগ করব।” (মুসলিম)
বরং যারা মানুষের প্রশংসা নেয়ার উদ্দেশ্যে দান করবে, তাদের দ্বারাই জাহান্নামের আগুনকে সর্বপ্রথম প্রজ্বলিত করা হবে।

রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
“সর্বপ্রথম তিন ব্যক্তিকে দিয়ে জাহান্নামের আগুনকে প্রজ্বলিত করা হবে।… তম্মধ্যে (সর্ব প্রথম বিচার করা হবে) সেই ব্যক্তির, আল্লাহ যাকে প্রশস্ততা দান করেছিলেন, দান করেছিলেন বিভিন্ন ধরনের অর্থ-সম্পদ। তাকে সম্মুখে নিয়ে আসা হবে। অতঃপর (আল্লাহ) তাকে প্রদত্ত নেয়ামত রাজীর পরিচয় করাবেন। সে উহা চিনতে পারবে। তখন তিনি প্রশ্ন করবেন, কি কাজ করেছ এই নেয়ামত সমূহ দ্বারা? সে জবাব দিবে, যে পথে অর্থ ব্যয় করলে আপনি খুশি হবেন এ ধরনের সকল পথে আপনার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে অর্থ-সম্পদ ব্যয় করেছি। তিনি বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। বরং তুমি এরূপ করেছ এই উদ্দেশ্যে যে, তোমাকে বলা হবে, সে দানবীর। আর তা তো বলাই হয়েছে। অতঃপর তার ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হবে। তখন তাকে মুখের উপর উপুড় করে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” (মুসলিম)

অমুসলিম সংখ্যালঘুদের প্রতি ইসলামের উদারতা

একটি মুসলিম দেশে ইসলাম মুসলিমকে শুধু অমুসলিমদের সঙ্গে শান্তিতে বসবাস করতেই বলে না, রাষ্ট্রে তাদের সার্বিক নিরাপত্তা এবং সুখ-সমৃদ্ধিও নিশ্চিত করে। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহয় একাধিক স্থানে অমুসলিম সংখ্যালঘুদের অধিকার তুলে ধরা হয়েছে। অমুসলিমরা নিজ নিজ উপাসনালয়ে উপাসনা করবেন। নিজ ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মালয়কে সুরক্ষিত রাখবেন। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে তারা সমান। তাদের প্রতি কোনো প্রকার বৈষম্য ইসলাম বরদাশত করে না। যেসব অমুসলিমের সঙ্গে কোনো সংঘাত নেই, যারা শান্তিপূর্ণভাবে মুসলিমদের সঙ্গে বসবাস করেন তাদের প্রতি বৈষম্য দেখানো নয়; ইনসাফ করতে বলা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
‘আল্লাহ নিষেধ করেন না ওই লোকদের সঙ্গে সদাচার ও ইনসাফপূর্ণ ব্যবহার করতে যারা তোমাদের সঙ্গে ধর্মকেন্দ্রিক যুদ্ধ করে নি এবং তোমাদের আবাসভূমি হতে তোমাদের বের করে দেয় নি। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন। {সূরা আল-মুমতাহিনা, আয়াত : ৮}
কোনো বিধর্মী উপসনালয়ে সাধারণ অবস্থা তো দূরের কথা যুদ্ধাবস্থায়ও  হামলা করা যাবে না। কোনো পুরোহিত বা পাদ্রীর প্রতি অস্ত্র তাক করা যাবে না। কোনো উপসনালয় জ্বালিয়ে দেয়া যাবে না। হাবীব ইবন অলীদ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সৈন্যদল প্রেরণকালে বলতেন,

‘তোমরা আল্লাহ ও আল্লাহর নামে আল্লাহর পথে যাত্রা কর। তোমরা আল্লাহর প্রতি কুফরকারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। আমি তোমাদের কয়েকটি উপদেশ দিয়ে প্রেরণ করছি : (যুদ্ধক্ষেত্রে) তোমরা বাড়াবাড়ি করবে না, ভীরুতা দেখাবে না, (শত্রুপক্ষের) কারো চেহারা বিকৃতি ঘটাবে না, কোনো শিশুকে হত্যা করবে না, কোনো গির্জা জ্বালিয়ে দেবে না এবং কোনো বৃক্ষও উৎপাটন করবে না।’ [আবদুর রাযযাক, মুসান্নাফ : ৯৪৩০]

আরেক হাদীসে আছে, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের কোনো বাহিনী প্রেরণ করলে বলতেন, ‘তোমরা গির্জার অধিবাসীদের হত্যা করবে না।’ [ইবন আবী শাইবা, মুসান্নাফ : ৩৩৮০৪; কিতাবুল জিহাদ, যুদ্ধক্ষেত্রে যাদের হত্যা করা নিষেধ অধ্যায়]
আবূ বকর রাদিআল্লাহু আনহুও একই পথে হাঁটেন। আপন খিলাফতকালে প্রথম যুদ্ধের বাহিনী প্রেরণ করতে গিয়ে তিনি এর সেনাপতি উসামা ইবন যায়েদ
কোনো মুসলিম যদি কোনো অমুসলিমের প্রতি অন্যায় করেন, তবে রোজ কিয়ামতে খোদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বিপক্ষে লড়বেন বলে হাদীসে এসেছে। একাধিক সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‘সাবধান! যদি কোনো মুসলিম কোনো অমুসলিম নাগরিকের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে তার অধিকার খর্ব করে, তার ক্ষমতার বাইরে কষ্ট দেয় এবং তার কোনো বস্তু জোরপূর্বক নিয়ে যায়, তাহলে কিয়ামতের দিন আমি তার পক্ষে আল্লাহর দরবারে অভিযোগ উত্থাপন  করব।’ [আবূ দাঊদ : ৩০৫২]
অপর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আবদুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‘যে মুসলিম কর্তৃক নিরাপত্তা প্রাপ্ত কোনো অমুসলিমকে হত্যা করবে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ তার ঘ্রাণ পাওয়া যায় চল্লিশ বছরের পথের দূরত্ব থেকে’। [বুখারী : ৩১৬৬]
আরেক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আবী বাকরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‘যে ব্যক্তি চুক্তিতে থাকা কোনো অমুসলিমকে অসময়ে (অন্যায়ভাবে) হত্যা করবে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন’। [আবূ দাঊদ : ২৭৬০; নাসাঈ : ৪৭৪৭, শাইখ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।]
ঐতিহাসিক বিদায় হজের দীর্ঘ ভাষণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমাজ ও রাষ্ট্রের সব দিক ও বিভাগ সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি মাতাপিতার হক, সন্তান-সন্ততির হক, আত্মীয়-স্বজনদের হক, অনাথ ও দরিদ্রদের হক, প্রতিবেশীর হক, মুসাফিরের হক, চলার পথের সঙ্গী বা পথচারীর হক, দাস-দাসী বা চাকর-চাকরানীর  হক এমনকি ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমের হক সম্পর্কেও নির্দেশনা দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজে মুসলিমদের কাছে অমুসলিমদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে আমানত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মুসলিমদের তিনি অমুসলিমদের নিরাপত্তা দানের নির্দেশ দিয়েছেন।
সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে প্রয়োজনে অমুসলিমদের জান-মালের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাদের ইজ্জত-আব্রু ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তার জন্য প্রহরীর দায়িত্ব পালন করতে হবে। কারণ অমুসলিম জনগোষ্ঠী তারাও মানুষ, তারাও আল্লাহর বান্দা। ইসলাম সম্পর্কে তারা ভুল বা বিভ্রান্তির শিকার হলে তাদের প্রতি আক্রমণ না করে তাদেরকে মূল সত্য এবং ইসলামের মহানুভবতা সম্পর্কে অবহিত করতে হবে।
ইসলামের দৃষ্টিকোণে দুনিয়ায় মানুষের প্রাণ হরণ কিংবা জীবন নাশের চেয়ে বড় অপরাধ আর হয় না। পবিত্র কুরআনে তাই একজন মানুষের হত্যাকে পুরো মানবজাতির হত্যা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
মানুষের প্রাণহানী ঘটানোকে যেখানে বলা হয়েছে পুরো মানব জাতিকে হত্যার সমতুল্য, সেখানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকে গণ্য করা হয়েছে হত্যার চেয়েও জঘন্য অপরাধ হিসেবে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
‘আর ফিতনা হত্যার চেয়ে কঠিনতর’। {সূরা আল-বাকারা, আয়াত : ১৯১}
অতএব বাংলাদেশের রামুতে একটি অন্যায়কে কেন্দ্র করে যা করা হয়েছে, তাও ন্যায়সঙ্গত হয়নি। একজনের অপরাধে দশজনকে শাস্তি প্রদান কোনো মুসলিমের কাছে সমর্থনযোগ্য নয়। বিভিন্ন সময় দেশের কিছু কিছু অঞ্চলে পূজোমণ্ডপে অনাকাঙ্ক্ষিত হামলা হয়। প্রতিমা ভাংচুর করে দুষ্কৃতকারীরা। এসব কখনো ভালো ফল বয়ে আনে না। শান্তি ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ নষ্ট করে। পৃথিবীর কাছে একটি মুসলিম সংখ্যাগুরু দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে ছোট করে। ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমরা ভুল বার্তা পান।
জানা যায়, গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১২ ইং রাতে কক্সবাজারের রামু উপজেলায় দুষ্কৃতকারীদের একাধিক দল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ১২টি বৌদ্ধবিহার ও মন্দিরে অগ্নিসংযোগ করে। পুড়িয়ে দেয় বৌদ্ধ পল্লীর ৪০টির মতো বসতবাড়ি। ভাংচুর চালায় আরও কিছু বাড়িঘরে। টেকনাফ, উখিয়া, পটিয়াতেও এমন সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, শনিবার রাত ১০টার কাছাকাছি সময় থেকে বৌদ্ধ মন্দির, স্থানীয় ভাষায় যাকে কিয়াং বলা হয়, তার ওপর আক্রমণ হয়েছে। কিছু হিন্দু মন্দিরও এ আক্রমণের আওতায় পড়েছে এবং একই সঙ্গে আগুন লাগানো ও লুটতরাজের মতো ঘটনাও ঘটেছে। টেকনাফের হোয়াইক্যং নামের একটি জায়গায় পুলিশের গুলি চালাতে হয়েছে এবং উখিয়ায় দু’জন পুলিশসহ ১২ জন আহত হন। এসব স্থানে কর্তৃপক্ষকে ১৪৪ ধারা জারি করতে হয়েছে।
ঘটনার পর থেকেই দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। সব রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী এর নিন্দা জানিয়েছে। দেশের শীর্ষ উলামায়ে কিরাম এবং ধর্মপ্রাণ মুসলিমরাও এ কাজের নিন্দা জানিয়েছেন। আমরাও মনে করি এ ঘটনা চরম নিন্দনীয়। ইসলামের আদর্শই হচ্ছে সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে সম্প্রীতি। এ সম্প্রীতি ধ্বংসের কোনো উস্কানি আর অন্যায় প্রতিক্রিয়া সবই শাস্তিযোগ্য।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ইসলামের শান্তিপূর্ণ ও উদারনৈতিক শিক্ষার সৌজন্যেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পরমতসহিষ্ণুতার জন্য বরাবর সারা বিশ্বের সুনাম কুড়িয়েছে। এ দেশের মুসলিম সবসময় তাদের ধর্মের শিক্ষা অনুযায়ী অন্য ধর্মের লোকদের সঙ্গে শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এ দেশে মসজিদ-মন্দিরে পাশাপাশি স্ব-স্ব ধর্মের ইবাদত হয়। পবিত্র মাহে রমজানে হিন্দুরা সাড়ম্বরে অষ্টমী পালন করে। খ্রিস্টানরা জাঁকজমকভাবে বড়দিন উদযাপন করেন। বৌদ্ধ ও অন্য ধর্মাবলম্বীরাও নিজ নিজ ধর্মীয় উত্সব নির্বিবাদে পালন করেন।
পক্ষান্তরে আমাদের নিকট প্রতিবেশী ভারতে ক’দিন পরপরই সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু কর্তৃক মুসলিমরা আক্রান্ত হন, আরেক প্রতিবেশী মিয়ানমারে এই সেদিনও রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ইন্ধনে সাধারণ বৌদ্ধ থেকে নিয়ে শান্তিপ্রিয় হিসেবে খ্যাত ভিক্ষুরা পর্যন্ত নির্বিচার হামলা ও হত্যাযজ্ঞ চালাল মুসলিমের বিরুদ্ধে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। নারী-শিশু-বৃদ্ধকে অকাতরে হত্যা করা হয়েছে। এ দেশের কোটি মুসলিমের হৃদয় কেঁদেছে তখন, তবে কেউ এ দেশের সংখ্যালঘু হিন্দু বা বৌদ্ধদের ওপর সে ক্ষোভ দেখান নি।
আমেরিকায় মহানবীকে সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবমাননা করে চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘটনায় যখন সারা বিশ্ব উত্তাল, বিশ্বের দুইশ’ কোটি মুসলিমের হৃদয়ে যখন জ্বলছে ক্ষোভের দাবানল, তখন একের পর এক ফ্রান্সের সাপ্তাহিকে, তারপর স্পেনের একটি ম্যাগাজিনে মহানবীর ব্যঙ্গ কার্টুন প্রকাশের ঘটনা বিশ্ব মুসলিমকে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ করেছে। বাকস্বাধীনতার নামে অন্যের পবিত্র ধর্মানুভূতিতে আঘাত কোনো ধর্মই অনুমোদন করে না। তারপরও ঘটছে এমন ঘটনা। স্বল্প বিরতিতে ক’দিন পরপরই ঘটছে এর পুনরাবৃত্তি। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল রামুতে শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উত্তম বড়ুয়া নামের এক অখ্যাত কুলাঙ্গার এমন এক ঘটনা ঘটিয়েছে যা এ অঞ্চলের সর্বশ্রেণীর মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
উত্তম বড়ুয়ার বর্বর ঘটনার পর নিন্দা ও প্রতিবাদের বিষয়টি স্বাভাবিক, সমর্থনযোগ্য এবং করণীয়ও বটে। কিন্তু আইন হাতে তুলে নিয়ে নির্বিচারে সহিংসতা অন্যায়। একজনের অপরাধে দশজনকে শাস্তি দেওয়া অনুমোদিত নয়।
এমন ঘটনার পর সর্বপ্রথম দায়িত্ব হলো ঘটনার শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানানো এবং ওই ব্যক্তিকে আইনের কাছে সোপর্দ করা। এ ধরনের অপরাধের ভয়াবহতা, পবিত্র কুরআনের মাহাত্ম্য, মহানবীর মহানুভবতা এবং ইসলামের উদারতা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন ও ওয়াকিফ করা।
কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, উত্তম কুমার বড়ুয়া অনুত্তম কাজ করলেও রাষ্ট্র্র ও আন্তর্জাতিক সাহায্যপুষ্ট এনজিও, বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়া এ কাজের যথাযথ নিন্দা জানায় নি। তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করার কথা বলে নি। আরও দুঃখজনক ব্যাপার হলো, উত্তমের বর্বর কাণ্ডের পর যে সহিংস প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়েছে, তা থেকেও রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করে গেছে। আর সব রাজনৈতিক ইস্যুর মতো এ নিয়েও পরস্পরকে দোষারোপের চর্চা চলেছে। ইসলামকে রাজনীতির বলি বানানো হয়েছে!
পশ্চিমা বিশ্ব যেমন যে কোনো দুর্ঘটনার পেছনে জঙ্গিবাদ খুঁজে বেড়ায়, ক্ষমতাসীনরা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চান, সন্ত্রাসের মূল কারণ উদ্ঘাটন ও উত্পাটন না করে ছায়া শত্রুর পেছনে লেগে থেকে শত্রু বৃদ্ধি করেন। আমরাও কেন যেন এমন ঘটনার পেছনে না গিয়ে ছায়া শত্রুদের গালাগাল করছি। বাংলাদেশে সর্বশেষ এক বছরে মানিকগঞ্জে, তারপর মৌলভীবাজারে এবং সর্বশেষ রামুতে মুসলিমের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের ঘটনা ঘটল। ঘটনাগুলোর যথাযথ প্রতিকার, অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা হলে হয়তো পরবর্তী ঘটনার অবতারণা হতো না।

কুরআনুল কারিমের কসম করার বিধান

কারো নামে কসম করার অর্থ তাকে সম্মান দেওয়া ও তার সত্তাকে পবিত্র জ্ঞান করা। এ জাতীয় সম্মানের হকদার একমাত্র আল্লাহ ‘তাআলা। যে আল্লাহ ‘তাআলা ব্যতীত কোনো সত্তার নামে কসম বা শপথ করল সে মূলত আল্লাহর সম্মান ও অধিকারে ঐ সত্তাকে শরিক ও অংশীদার করল। অতএব এটা শিরক। আল্লাহর নামে মিথ্যা কসম করা কবিরা গুনাহ, তবে তা শিরক নয়। শিরক কবিরা গুনা থেকেও বড়, হোক সেটা ছোট শিরক। যে পীরের নামে কসম করল, সে পীরকে আল্লাহর সমকক্ষ স্থির করল; যে নবী-অলি-বুজর্গের নামে কসম করল সে তাদেরকে আল্লাহর সমকক্ষ নির্ধারণ করল; অনুরূপ আল্লাহ ও তার গুণাগুণ ব্যতীত কোনো বস্তুর নামে যে কসম করল, সে আল্লাহর অধিকার তথা বিশেষ সম্মানে ঐ বস্তুকে শরিক করল। ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

“যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত কারো নামে শপথ করল সে কুফরি করল, অথবা শিরক করল”।



ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

“তোমরা তোমাদের পিতাদের নামে কসম কর না। যে আল্লাহর নামে কসম করে তার উচিত সত্য বলা, আর যার জন্য আল্লাহর নামে কসম করা হল তার উচিত সন্তুষ্টি প্রকাশ করা, আর যে আল্লাহর নামে সন্তুষ্টি প্রকাশ করল না, তার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক নেই”।

যদি কেউ কুরআনুল কারিম কিংবা তার কোনো আয়াতের কসম করে, যা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর নাযিল করা হয়েছে, তবে তার এ কসম বৈধ। কারণ, কুরআন আল্লাহর কালাম, যা তার সিফাতের অন্তর্ভুক্ত। আর আল্লাহর সকল সিফাত দ্বারা কসম করা যায়, তাই কুরআনুল কারিম দ্বারা কসম করাও বৈধ। কেউ যদি কুরআন দ্বারা উদ্দেশ্য করে কাগজ, কালি ও আরবি বর্ণমালা, তাহলে এটা জায়েয নয়, বরং শিরকের অন্তর্ভুক্ত; কারণ, কাগজ-কালি ও আরবি বর্ণমালা মাখলুক তথা সৃষ্টিজীব। তাই কুরআনুল কারিমের কসম না করাই ভালো, কারণ তাতে যেরূপ আল্লাহর কালাম রয়েছে, অনুরূপ কাগজ-কালি এবং আরবি বর্ণমালাও রয়েছে।

কসম ও মান্নতের ক্ষেত্রে সাধারণত কসম ও মান্নতকারীর নিয়ত গ্রহণযোগ্য হয়, কারণ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

“সকল আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তাই রয়েছে যা সে নিয়ত করেছে”।

তবে কসমের সাথে যদি অপরের হক জড়িত হয়, তাহলে অপর ব্যক্তি তথা কসম গ্রহণকারী ও বিচারকের নিয়ত গ্রহণযোগ্য হবে। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

“তোমার সাথী যার উপর তোমাকে সত্যারোপ করছে তার উপর তোমার কসম সংগঠিত হবে”। অপর বর্ণনায় আছে, “কসম গ্রহণকারীর নিয়তের উপর কসম সংগঠিত হয়”।
অতএব কসমকারী যদি ভিন্ন কিছু নিয়ত করে, তার সে নিয়ত গ্রহণযোগ্য নয়। হ্যাঁ, কসমকারী যদি মজলুম হয়, তাহলে তার নিয়ত গ্রহণযোগ্য হবে। আর যদি কসমের সময় কোনো নিয়ত না থাকে, তাহলে কসমের প্রতি উদ্বুদ্ধকারী বস্তু ও তার কারণ নিয়ত হিসেবে গণ্য হবে।

কুরআনুল কারিমের উপর কিংবা তার ভিতর হাত রেখে কসম করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত; তবে কসমের কঠোরতা বুঝানো ও মিথ্যা কসমকারীকে ভীতি প্রদর্শন স্বরূপ কেউ কেউ তার অনুমতি প্রদান করেছেন।

শায়খ উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহুকে কুরআনুল কারিমের কসম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি উত্তরে বলেন: “আল্লাহ তা‘আলার নাম কিংবা তার সিফাত ব্যতীত কোনো বস্তুর কসম করা বৈধ নয়, ব্যক্তি যখন আল্লাহর নামে কসম করে, তখন তার সামনে কুরআনুল কারিম উপস্থিত করা জরুরি নয়। কুরআনুল কারিমের কসম করার রীতি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে, কিংবা তার সাহাবীদের যুগে, এমন কি কুরআন লিপিবদ্ধ হওয়ার পরও ছিল না। তাই প্রয়োজনের মুহূর্তে কুরআনুল কারিম উপস্থিত করা ছাড়া আল্লাহর নামে কসম করাই শ্রেয়”।

ইবনে কুদামাহ মাকদিসি- রাহিমাহুল্লাহ, কুরআনুল কারিমের উপর হাত রেখে কসম করার রীতিকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন: “শাফেঈ বলেন: আমি তাদেরকে দেখেছি মুসহাফের উপর হাত রেখে কসম মজবুত করতেন। সানা এর কাদি-বিচারক ইবনে মাজিনকে দেখেছি কুরআনুল কারিম দ্বারা কসম মজবুত করতেন। শাফেঈ রাহিমাহুল্লাহর সাথীগণ বলেন: কুরআনুল কারিম উপস্থিত করে কসম মজবুত করা জরুরি, কারণ তাতে আল্লাহর কালাম ও তার নামসমূহ রয়েছে। ইবনে কুদামাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন: কসমের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যার নির্দেশ প্রদান করেছেন এবং তার খোলাফায়ে রাশেদাহ ও তাদের বিচারকগণ যা করেছেন তার উপর এটা সীমালঙ্ঘন ও বাড়াবাড়ি, যার পশ্চাতে মজবুত ভিত্তি ও কোনো দলিল নেই। অতএব ইবনে মাজিন কিংবা কারো কর্মের কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাথীদের কর্ম কখনো ত্যাগ করা যায় না”

কসম করার জন্য কুরআনুল কারিম কেন, আল্লাহ তা‘আলার নাম কিংবা তার সিফাতের কসম করা হয় না কেন, যা বৈধ এবং যাতে পাপের কোনো আশঙ্কা নেই!? তাই কসমের প্রয়োজন হলে আল্লাহর নামে কসম করুন। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

“যার কসম করতে হয়, সে যেন আল্লাহর নামে কসম করে, অথবা চুপ থাকে”

Monday, 12 February 2018

আসমানের সব ফেরেশতারা যে দুটি আমলের কারণে হযরত আবু যর গিফারী (রা:) কে চিনতেন

হযরত আবু যর গিফারী (রা:) ছিলেন বিশ্বনবীর একজন কাছের সাহাবী। তিনি বিশ্বনবীর আশেপাশে সবসময় থাকতেন বলে নিজের জন্য একটি ঘরও তৈরী করার সময় পাননি।

একদিন হযরত জিবরাইল আ: বিশ্বনবীকে কে বললেন, ঐ যে চাদর গায়ে দেওয়া আপনার সাহাবী, উনাকে আমি চিনি।বিশ্বনবী বললেন, তুমি কিভাবে উনাকে চিন? হযরত জিবরাইল আ: বললেন, শুধু আমি নই, আসমানের সব ফেরেশতারা উনাকে চিনে। বিশ্বনবী জিজ্ঞাসা করলেন কেন আসমানের সব ফেরেশতারা হযরত আবু যর গিফারীকে চিনে? তখন জিবরাইল আ: বললেন, উনার দুইটি আমলের কারণে আসমানের সব ফেরেশতারা উনাকে চিনে।

১. “লিসসিগারীহি আলা নাফসিহি” অর্থ নিজেরে নিজে খুব ছোট মনে করে।

২. “লিকাসরাতি তিলাওয়াতে সুরা ইখলাস” অর্থ বেশী বেশী সুরা ইখলাস পড়ে।

আমরা এই দুটি আমল বেশী বেশী করার চেষ্টা করবো, ইনশাআল্লাহ।

শেয়ার করুন:

মহানবী সা:-এর আদর্শ ও আমাদের দায়িত্ব

যত নবী আ: দুনিয়ায় এসেছিলেন, তাদের সবার একটিই কাজ ছিল মানুষকে ধর্মীয় দিকে থেকে মূর্তি পূজা, সামাজিক দিক থেকে জুলুম-শোষণ এবং রাজনৈতিক দিক থেকে মানুষের নেতৃত্ব ও প্রভুত্ব থেকে মুক্ত করে আল্লাহর প্রভুত্বের অধীনে নিয়ে আসা। কারণ আল্লাহ ছাড়া মানুষকে প্রভু বানানো, আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে অন্যের বিধান মতো চলা শিরক। রাসূল সা:-এর নেতৃত্ব ছাড়া অন্য মানুষের নেতৃত্বের অধীনে থাকা ভ্রষ্টতা। রাসূল সা: বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের রাসূলদের নিয়মমতো চলা ছেড়ে দিলে গুমরাহ হয়ে যাবে।’ মানুষের ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির চেষ্টা করা, সব ভ্রান্ত মতবাদের ওপর ইসলামকে বিজয়ী করাই নবী জীবনের মিশন। ইসলামের বৈশিষ্ট্য হলো- ইসলাম মানুষকে সব ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে। ইসলাম আল্লাহ প্রদত্ত এবং রাসূল সা: প্রদর্শিত পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। সব নবী আ: এ পথেই আমরণ প্রাণপণ জিহাদ চালিয়ে গেছেন। নবীগণ আ: এভাবে দায়িত্ব পালন করার কারণে সমসাময়িক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কায়েমি শক্তির সাথে তাঁদের যুদ্ধ ও সঙ্ঘাত হয়েছে। নবীগণ আ: এভাবে দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে তাঁদের অনুসারীদের আমাদের প্রিয় নবী সা:-এর আগমনি বার্তাও শুনিয়েছিলেন।

দুনিয়া যখন জাহিলিয়াতে ছেয়ে গিয়েছিল, তখন পৃথিবীর কেন্দ্র স্থান আরব ভূমিও অন্যায়-অবিচার আর বর্বরতায় পরিপূর্ণ ছিল। ঈসা নবীর আ: শিক্ষাও মানুষ ভুলে, খুনখারাবি, রাহাজানিসহ হাজারো অনাচারে নিমজ্জিত ছিল। এমন এক ক্রান্তিকালে পুরো দুনিয়ার হেদায়াতের জন্য আল্লাহ আমাদের নবী সা:-কে রাহমাতুল্লিল আলামিন করে সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হিসেবে, সারা বিশ্বের সব মানুষের ত্রাণকর্তাস্বরূপ পৃথিবীর কেন্দ্রীয় ভূমি মক্কায় প্রেরণ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি’। ৬৩ বছর নবুয়াতি দায়িত্ব সুনিপুণভাবে রাসূল সা: পালন শেষে তার অনুসারী এবং মুক্তিকামী, শান্তিপ্রিয় মানুষের জন্য বিরাট ইসলামি রাষ্ট্র এবং তার পরিচালনার জন্য কুরআন-সুন্নাহর সংবিধান ও গাইডলাইন রেখে, একাদশ হিজরি সনের ১২ রবিউল আওয়ালে উম্মতদের শোকসাগরে ভাসিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আর বলে যান, ‘আমি তোমাদের জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রেখে যাচ্ছি, যতক্ষণ এই দুটিকে আঁকড়িয়ে ধরে থাকবে, ততক্ষণ তোমরা (সুখ, শান্তি ও জান্নাতের) পথ থেকে বিচ্যুত হবে না। তার একটি হলো- আল্লাহর কিতাব, অন্যটি হলো- আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহ (আল হাদিস)। প্রিয় নবী সা:-এর কথামতো কুরআন-সুন্নাহকে সংবিধান ও গাইডলাইন হিসেবে গ্রহণ না করার কারণেই আজ মুসলিম বিশ্বে অশান্তি। জর্জ বার্নার্ড শ বলেছিলেন, ‘মোহাম্মদ সা:-কে শাসক হিসেবে গ্রহণ করলে বিশ্ববাসী শান্তি পেতে পারে।’

প্রিয় নবী সা: কিভাবে ধর্মীয় কাজ সম্পাদন করেছেন, কিভাবে ইবাদতবন্দেগি করেছেন, সামাজিক বিষয় কিভাবে আনজাম দিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় এবং রাজনৈতিক ব্যাপারে কী করেছেন এবং কী নির্দেশনা দিয়েছেন, তা জানা এবং মানা প্রতিটি উম্মতের জন্য ফরজ। সব ব্যাপারে প্রিয় নবী সা:-এর নীতিমালার বাস্তবায়নই মুসলমানদের কাছে নবী সা: দিবসের দাবি। এর উল্টা চলা, এর বিরোধিতা করা, এ পথে যারা চলে বা চলতে বলে, তাদের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করা। এই অবস্থায় প্রিয় নবী সা:-এর ধর্মীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক নীতিমালাকে সর্বস্তরে, রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিকভাবে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে মানবতার ইহকালীন সুখ শান্তি ও পরকালীন মুক্তির পথ সুগম করে, প্রিয় নবীর সা: নেতৃত্বকে যথাযথ মর্যাদা দিতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি তার রাসূলকে সা: প্রেরণ করেছেন সব ধর্ম, মতবাদের ওপর ইসলামকে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য, যদিও শিরককারীরা এটা পছন্দ করে না’ (সূরা ছফ, আয়াত নং-০৯)। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূল সা:-এর জীবনে (সব ব্যাপারে) উত্তম আদর্শ আছে’। তিনি প্রিয় নবী সা:-কে আদেশ দিয়ে বলেন, হে নবী সা: আপনি তাদের বলে দেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস আমাকে অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন’(আল-কুরআন)।
মহান নবী সা: দিবসে মুসলমান, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নেতাদের ঈমানি দায়িত্ব হলো, প্রিয় নবী সা:-এর জীবনী আলোচনা করে তার থেকে শিক্ষা নিয়ে আল্লাহর গজব থেকে পাপ ও নাফরমানি থেকে নিজেরা বাঁচা এবং নিজেদের অধীনস্থ লোকজন ও জাতিকে বাঁচানোর চেষ্টা করা।

মিয়ানমারে মজলুম মুসলমানসহ দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে মুসলমানদের যে অবস্থা চলছে, তা আল্লাহর নাফরমানি এবং প্রিয় নবী সা:-এর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ার ফল। এই ধরনের গজব থেকে আল্লাহ আমাদের দেশ ও জাতিকে হেফাজত করুন, আমিন। নেতাদের দায়িত্ব হলো প্রিয় নবী সা:-এর নির্দেশমতো পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর পথে চলা। মুসলমান হয়ে থাকলে, ঈমানি দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হওয়া। পরিবারে, প্রতিষ্ঠানে, অফিসে, সমাজে ও দেশে নামাজ প্রতিষ্ঠা করা, সৎ কাজ চালু এবং অসৎ কাজ বন্ধ করাই নেতাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ (সূরা হজ, আয়াত নং-৪১)। এই নির্দেশ অমান্য করা বড় ধরনের পাপ। আল্লাহর বিধান ও প্রিয় নবী সা:-এর কথামতো চলা, জাতিকে পরিচালনা করাই নেতাদের দায়িত্ব। এটা সাম্প্রদায়িকতা, নারী নির্যাতন, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলের এবং ধর্ষণ, খুন, গুম ও নারী নির্যাতন বন্ধের পথ। এ পথে এলে নিজেরা শান্তি পাবেন, জাতিও শান্তি পাবে। আল্লাহর গজব ও আজাব থেকে সবাই বাঁচবে। আল্লাহর রহমত ও বরকতের দরজা খুলে যাবে। অন্যথায় জাতির সব পাপের জন্য আল্লাহর কাছে নেতারাই বেশি দায়ী হবেন। কারণ জনগণ নেতাদেরই বেশি মানে। আল্লাহর নবী সা:-এর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিধানমতো জনগণ যেন চলে, তা নিশ্চিত করা নেতাদের দায়িত্ব। আল্লাহ বলেন, ‘এলাকার লোকেরা যদি ঈমান এনে আল্লাহকে ভয় করে চলে, তাদের জন্য আসমান-জমিনের বরকতের সব দরজা খুলে দেবো।’

নেতারা যখন দুনিয়ায় সম্মানিত, আখিরাতেও যেন সম্মানিত থাকতে পারেন তার চিন্তা করা উচিত। আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর নাজিল করা বিধানমতো শাসন ও হুকুম চালায় না, তারা কাফের (সূরা মায়েদা, আয়াত নং-৪৪)। কুফরি থেকে মুক্ত হওয়া সব মুসলমানের দায়িত্ব। আল্লাহ আর বলেন, ‘যারা কুফরি করে এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তাদের উপর আল্লাহর লানত, ফেরেশতাদের লানত এবং সব অভিশাপ মানুষের লানত’ (সূরা বাকারা, আয়াত নং-১৬১)। পাপ ও কুফরির কারণে দেশে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অশান্তি হয় না, ব্যক্তিগত, পারিবারিক, পেশাগত ও রাষ্ট্রীয় জীবনে যে বিপদ আসে, তাও পাপের ফল। নবী সা: দিবসে সবার উচিত নিজে পাপ থেকে বাঁচার এবং অধীনস্থকে পাপ থেকে বাঁচানোর শপথ নেয়া।

চিন্তার বিষয় হলো, জনগণ ধর্মীয় নেতাদের ওয়াজ শুনে কিন্তু নেতা ও কর্মকর্তারা চলে রাজনীতির হিসাবমতো। দেশ ও জাতি আল্লাহর বিধানমতো না চলার কারণে দেশে শরিয়তবিরোধী কাজ কত যে বেড়ে গেছে। জাতিকে বাঁচাতে হলে ধর্মীয় নেতারা আল্লাহর ওয়াস্তে ইত্তেহাদ মায়াল ইখলিলাফের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত। প্রিয় নবী সা:-এর প্রতিনিধি হিসেবে সর্বস্তরের মুসলমানকে বছরব্যাপী ব্যাপক অনুষ্ঠান আয়োজন করে নবীজীকে জানা, মানা এবং প্রিয় নবী সা:-এর আদর্শকে বাস্তবায়নের জন্য উৎসাহিত ও সহযোগিতা করা ধর্মীয় নেতাদের দায়িত্ব। আল্লাহর বিধান এবং প্রিয় নবী সা: প্রদত্ত রাজনীতি, বিচারনীতি, শাসননীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি ও সংস্কৃতি ত্যাগ করার কারণেই দেশের এই দূরবস্থা। তা জনগণকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক নেতাদের বুজিয়ে বলা ধর্মীয় নেতাদের দায়িত্ব। অন্যথায় ধর্মীয় নেতারা আল্লাহর আদালতে প্রধান আসামি হবেন। যদি শুধু নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, তাসবিহ-তাহলিল আর ইসলামি লেবাস সুরতের ফজিলতের বয়ান দেন, ইসলামবর্জিত শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, বিচারনীতি ও শাসননীতি জাতিকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তা না বলেন, তারা আল্লাহর নিকট কি জবাব দেবেন? আল্লাহ বলেন, ‘তার চাইতে বড় জালেম কে, তার কাছে থাকা আল্লাহর সাক্ষ্য গোপন করে যে’ (সূরা বাকারা, আয়াত নং-১৪০)। তিনি আরো বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা অল্প মূল্যের জন্য আল্লাহর কিতাবে নাজিল করা বিষয় গোপন করে, তারা পেটে জাহান্নামের আগুন ঢুকায়’ (সূরা বাকারা আয়াত নং-১৭৪)। নাউজুবিল্লাহ।

যদি নামাজ, রোজা, হজ, জাতাক, দাড়ি, টুপি, লেবাস, সুরত, জিকির-আসকার তাসবিহ-তাহলিলের ব্যাপারে আল্লাহ ও রাসূল সা:-এর বিধান মেনে চলেন, আর আল্লাহ প্রদত্ত, রাসূল সা: প্রদর্শিত ইসলামি সাংস্কৃতি ও রাজনীতি, কুরআনভিত্তিক শিক্ষানীতি, শাসননীতি ও বিচারনীতি এবং জাকাত ভিত্তিক অর্থনীতি বাদ দিয়ে যদি এ সব ব্যাপারে অন্যদের বিধান মেনে চলেন, তাহলে আপনারা মুসলমান কি আসলেই হলেন? আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ইসলামকে পুরোপুরি মেনে চলো। আমি তোমাদের জন্য ইসলামকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছি। তোমরা কি কুরআনের কিছু মানবে, কিছু অমান্য করবে? যারা এমন করবে, তারা দুনিয়ায় লাঞ্ছিত হবে, পরকালে জাহান্নামের কঠিন আজাবে নিক্ষিপ্ত হবে।’ আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহ এবং রাসূলের কথা মেনে চলো; তোমাদের আমল (নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ও দানখয়রাত) বরবাদ করিও না।’ আপনাদের উচিত, আপনাদের নিজেদের এবং বংশধরদের দুনিয়ার শান্তি এবং আখিরাতের মুক্তির জন্য নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতের সাথে সাথে আল্লাহ প্রদত্ত রাসূল সা: প্রদর্শিত রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি, শাসননীতি ও সংস্কৃতিকে নিজের নীতি হিসেবে গ্রহণ করা এবং নিজেদের বংশধরকে সেভাবে গড়ে তোলা। অন্যথায় যারা কিয়ামতের দিন আপনাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়ে বলবে, ‘হে আল্লাহ, আমরা আমাদের মুরব্বি এবং নেতাদের কথামতো চলতাম। তারাই আমাদরে জাহান্নামি বানিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘যে বা যারা ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুকে বিধান হিসেবে গ্রহণ ও কামনা করবে, তা (তাদের কোনো কিছুই) কবুল করা হবে না।’ মুসলমানদের উচিত, আল্লাহর দেয়া বিধান মতো চলা এবং নবী সা:-এর প্রদর্শিত ইসলামি রাজনীতিকে গ্রহণ করা। নামাজ আদায় করা, হালাল-হারাম মেনে চলা; পর্দা রক্ষা করা; অশ্লীলতা বন্ধ করা; শরিয়তের বিধান পালন করা। নিজেদের বংশধরদের সেভাবে গড়ে তোলা। প্রিয় নবী সা: বলেন, ‘তোমাদের কেউ ঈমানদার হবে না, যদি আমি তার নিকট তার মাতা-পিতা, ছেলেমেয়ে এবং অন্য সব মানুষের চাইতে বেশি প্রিয় না হই।’

আল-কুরআন ও তার সুমহান মর্যাদা

প্রশংসা করছি সেই মহান আল্লাহর, যিনি তাঁর বান্দার উপর সত্য মিথ্যার পার্থক্যকারী মহাগ্রন্থ আল কুরআন নাযিল করেছেন, যা সৃষ্টিকুলের জন্য ভয় প্রদর্শনকারী। দরূদ ও সালাম আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর যিনি হিদায়েত ও রহমত নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন। তিনি  সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী, আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী তিনি তাঁর পথে আহ্বানকারী এবং আলোকোজ্জ্বল প্রদীপ, আল্লাহ তা‘আলা তার উপর ও তার পরিবার পরিজন, সাহাবায়ে কিরাম ও কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণকারী সকলের উপর সালাত প্রেরণ করুন।

আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সৃষ্টিকূলের উপর বিশেষ করে মু’মিনের উপর অনুগ্রহ দান করেছেন যে, তিনি তাদের মধ্য থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করেছেন। তিনি তার সাথে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, যা অন্যান্য সব কিতাবের রক্ষক। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

﴿ لَقَدۡ مَنَّ ٱللَّهُ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِينَ إِذۡ بَعَثَ فِيهِمۡ رَسُولٗا مِّنۡ أَنفُسِهِمۡ يَتۡلُواْ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتِهِۦ وَيُزَكِّيهِمۡ وَيُعَلِّمُهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ وَإِن كَانُواْ مِن قَبۡلُ لَفِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٍ ١٦٤ ﴾ [ال عمران: ١٦٤]

“অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের উপর অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকে তাদের প্রতি একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যে তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করে আর তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেয়। যদিও তারা ইতঃপূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে ছিল।”  [সূরা আলে-ইমরান: ১৬৪]

সহীহ মুসলিমে এসেছে:

عَنْ عِيَاضِ بْنِ حِمَارٍ الْمُجَاشِعِيِّ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ ذَاتَ يَوْمٍ فِي خُطْبَتِهِ: «أَلَا إِنَّ رَبِّي أَمَرَنِي أَنْ أُعَلِّمَكُمْ مَا جَهِلْتُمْ، مِمَّا عَلَّمَنِي يَوْمِي هَذَا، كُلُّ مَالٍ نَحَلْتُهُ عَبْدًا حَلَالٌ، وَإِنِّي خَلَقْتُ عِبَادِي حُنَفَاءَ كُلَّهُمْ، وَإِنَّهُمْ أَتَتْهُمُ الشَّيَاطِينُ فَاجْتَالَتْهُمْ عَنْ دِينِهِمْ، وَحَرَّمَتْ عَلَيْهِمْ مَا أَحْلَلْتُ لَهُمْ، وَأَمَرَتْهُمْ أَنْ يُشْرِكُوا بِي مَا لَمْ أُنْزِلْ بِهِ سُلْطَانًا، وَإِنَّ اللهَ نَظَرَ إِلَى أَهْلِ الْأَرْضِ، فَمَقَتَهُمْ عَرَبَهُمْ وَعَجَمَهُمْ، إِلَّا بَقَايَا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ، وَقَالَ: إِنَّمَا بَعَثْتُكَ لِأَبْتَلِيَكَ وَأَبْتَلِيَ بِكَ، وَأَنْزَلْتُ عَلَيْكَ كِتَابًا لَا يَغْسِلُهُ الْمَاءُ، تَقْرَؤُهُ نَائِمًا وَيَقْظَانَ…… »

সহীহ মুসলিমে ‘ইয়াদ ইবন হিমার আল-মুজাশি‘য়ী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর খুতবায় বলেছেন, জেনে রাখো, আমার রব আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা যা কিছু জানো না তা যেন তোমাদেরকে শিখিয়ে দেই, যে ইলম আল্লাহ তা‘আলা আমাকে আজ পর্যন্ত জানিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যেসব সম্পদ আমি আমার বান্দাহকে দান করেছি তা হালাল এবং নিশ্চয়ই আমি আমার সকল বান্দাহকে  জন্মগতভাবেই নিষ্কলুষ তথা সরল সঠিক পথের অনুসারী করে সৃষ্টি করেছি। এরপরে শয়তান তাদের নিকট এসে তাদেরকে বিভ্রান্ত করে সঠিক পথ থেকে সরিয়ে দিয়েছে এবং আমি যা তাদের জন্য হালাল করেছি শয়তান তা তাদের উপর হারাম করে দিয়েছে। তদুপরি শয়তান আমার সাথে এমন কিছুকে শরীক করতে আদেশ দেয় যে সম্পর্কে আমি কোনো দলিল প্রমাণ অবতীর্ণ করি নি। আর আল্লাহ তা‘আলা জমিনের অধিবাসীদের প্রতি দৃষ্টিপাত করে আরব অনারব সবার প্রতি (তাদের কার্যকলাপের কারণে) ক্রোধান্বিত হলেন। কেবল আহলে কিতাবের কিছু সংখ্যক লোক যারা সঠিক পথকে ধরে রেখেছে (তারা স্রষ্টার রোষ থেকে রক্ষা পেলো)। আর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, নিশ্চয় আমি আপনাকে পরীক্ষা করা ও আপনার দ্বারা সৃষ্টিকুলকে পরীক্ষা করা এ দু’উদ্দেশ্যে আপনাকে জগতে প্রেরণ করেছি। এবং আমি আপনার উপর এমন কিতাব নাযিল করেছি যা পানি ধুয়ে মুছে ফেলতে পারে না। তা আপনি শয়নে জাগরণে সর্বাবস্থায় তিলাওয়াত করতে পারেন ।

এ কিতাব পূর্ববর্তী সব কিতাবের রক্ষাকারী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَأَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ بِٱلۡحَقِّ مُصَدِّقٗا لِّمَا بَيۡنَ يَدَيۡهِ مِنَ ٱلۡكِتَٰبِ وَمُهَيۡمِنًا عَلَيۡهِۖ ٨ ﴾ [المائ‍دة: ٤٨]

“আর আমি তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি যথাযথভাবে, এর পূর্বের কিতাবের সত্যায়নকারী ও এর উপর তদারককারীরূপে।” [সূরা আল-মায়েদা: ৪৮]

অর্থাৎ এটি পূর্ববর্তী সব কিতাব থেকে সুউঁচু ও মর্যাদাবান। অন্যান্য কিতাবের রক্ষাকারী, ফয়সালাকারী, সাক্ষ্যদানকারী ও মূল্যায়ণকারী।

ইবন জারীর রহ. বলেন, আল কুরআন পূর্ববর্তী সব কিতাবের আমানতদার ও নিরাপত্তাদাতা। সুতরাং যা কিছু কুরআনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে তা সঠিক, আর যা কুরআনের সাথে বিরোধপূর্ণ হবে তা বাতিল।

সব মুসলিমের অন্তরে আল কুরআনের রয়েছে বিশেষ মর্যাদা। এটি নিজেই মহিমান্বিত, সম্মানিত, মর্যাদাবান ও শক্তিশালী।

আমরা এ পুস্তিকাতে ইশারা ইঙ্গিতে সংক্ষেপে এ বিষয়ে আলোকপাত করব। আশা করি আল্লাহ তা‘আলা এর দ্বারা আমাদেরকে উপকৃত করবেন, সম্মানিত পাঠক পাঠিকাগণ ও যার কাছে এ বাণী পৌঁছবে সকলেই উপকৃত হবেন। নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা সর্বশ্রোতা ও দো‘আ কবুলকারী।

আল্লাহর সাহায্য সহযোগিতায় শুরু করছি:

القرآن (আল কুরআন) শব্দটি قرأ মূলধাতুর মাসদার। এ শব্দ থেকেই আল্লাহর বাণী:

﴿ إِنَّ عَلَيۡنَا جَمۡعَهُۥ وَقُرۡءَانَهُۥ ١٧ فَإِذَا قَرَأۡنَٰهُ فَٱتَّبِعۡ قُرۡءَانَهُۥ ١٨ ثُمَّ إِنَّ عَلَيۡنَا بَيَانَهُۥ ١٩ ﴾ [القيامة: ١٧،  ١٩]

“এর সংরক্ষণ ও পাঠ আমাদেরই দায়িত্ব। অতঃপর আমরা যখন তা পাঠ করি, তখন আপনি সেই পাঠের অনুসরণ করুন। এরপর বিশদ বর্ণনা আমারই দায়িত্ব”। [সূরা আল-কিয়ামাহ: ১৭-১৮]

পঠিত বাক্যকে কুরআন বলা হয়, যেমন আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত বাণী:

﴿ فَإِذَا قَرَأۡتَ ٱلۡقُرۡءَانَ فَٱسۡتَعِذۡ بِٱللَّهِ مِنَ ٱلشَّيۡطَٰنِ ٱلرَّجِيمِ ٩٨ ﴾ [النحل: ٩٨]

“অতএব, যখন আপনি কুরআন পাঠ করেন তখন বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করুন।” [সূরা আন-নাহল: ৯৮]

আল-কুরআন প্রকৃতভাবেই আল্লাহর বাণী, এর শব্দাবলী ও অর্থও আল্লাহ তা‘আলার তরফ থেকেই এসেছে। তিনি তা তাঁর বান্দা মুহাম্মদ ইবন আব্দুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর ওহী আকারে নাযিল করেছেন।

এটা নাযিলকৃত কিন্তু মাখলুক নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ تَنزِيلُ ٱلۡكِتَٰبِ مِنَ ٱللَّهِ ٱلۡعَزِيزِ ٱلۡحَكِيمِ ١ ﴾ [الزمر: ١]

“কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে।” [সূরা আয-যুমার: ১]

﴿ قُلۡ نَزَّلَهُۥ رُوحُ ٱلۡقُدُسِ مِن رَّبِّكَ ١٠٢ ﴾ [النحل: ١٠٢]

“বলুন, একে পবিত্র ফেরেশতা আপনার রবের পক্ষ থেকে নাযিল করেছেন”। [সূরা আন-নাহল: ১০২]

﴿ حمٓ ١ تَنزِيلُ ٱلۡكِتَٰبِ مِنَ ٱللَّهِ ٱلۡعَزِيزِ ٱلۡعَلِيمِ ٢ ﴾ [غافر: ١،  ٢]

“হা-মীম। কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে, যিনি পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ”। [সুরা গাফির: ১-২]

﴿ تَنزِيلٞ مِّنَ ٱلرَّحۡمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ ٢ ﴾ [فصلت: ٢]

“এটা অবতীর্ণ পরম করুণাময়, দয়ালুর পক্ষ থেকে”। [সূরা ফুসসিলাত: ২]

﴿وَقُرۡءَانٗا فَرَقۡنَٰهُ لِتَقۡرَأَهُۥ عَلَى ٱلنَّاسِ عَلَىٰ مُكۡثٖ وَنَزَّلۡنَٰهُ تَنزِيلٗا ١٠٦﴾ [الاسراء: ١٠٦]

“আর আমরা কুরআনকে নাযিল করেছি কিছু কিছু করে, যেন আপনি তা মানুষের কাছে পাঠ করতে পারেন ধীরে ধীরে এবং আমরা তা নাযিল করেছি যথাযথভাবে।” [সূরা বনী ইসরাঈল: ১০৬]

এ ব্যাপারে অনেক আয়াত রয়েছে। উম্মতের সকল উলামা কিরাম এ মতের উপর ঐকমত্য পোষণ করেছে।

আল্লাহ তা‘আলা এ কিতাবকে বিভিন্ন নামে নামকরণ করেছেন। আবার তিনি সেটাকে নানা বিশেষণে বিশেষিত করেছেন। এর দ্বারাই এ কিতাবের সুমহান সম্মান ও মর্যাদা প্রমাণিত হয়। কুরআনের নামসমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে: আল কুরআন, আল-ফুরকান, আল-কিতাব, আল-হুদা (হিদায়েতের পথ প্রদর্শনকারী), নূর (আলো), শিফা (আরোগ্যকারী), বায়ান (বর্ণনাকারী) মাও‘য়েযা (সুপদেশ), রহমত, বাসায়ের (অন্তর্দৃষ্টি দানকারী), বালাগ (প্রজ্ঞাপন), আরবী, মুবীন (স্পষ্টকারী), কারীম (অতি সম্মানিত), আযীম (মহান), মাজীদ (সম্মানিত), মুবারক (বরকতময়), তানযীল (অবতীর্ণ), সিরাতুম-মুসতাকিম (সরল সঠিক পথ), যিকরুল হাকীম (প্রজ্ঞাময় বাণী), হাবলুল্লাহ (আল্লাহর রশি), যিকরা (উপদেশ), তাযকিরা (স্মরণিকা), বুশরা (সুসংবাদ), পূর্ববর্তী কিতাবের সত্যায়নকারী, পূর্ববর্তী কিতাবের রক্ষাকারী, মাসানী, সব বিষয়ের ব্যাখ্যাকারী, সব বিষয়ের বর্ণনাকারী, সন্দেহাতীত ও বক্রহীন কিতাব ইত্যাদি নামে পরিচিত। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

﴿ قُرۡءَانًا عَرَبِيًّا غَيۡرَ ذِي عِوَجٖ لَّعَلَّهُمۡ يَتَّقُونَ ٢٨ ﴾ [الزمر: ٢٨]

“আরবী ভাষায় এ কুরআন বক্রতামুক্ত, যাতে তারা সাবধান হয়ে চলে।”[ সূরা যুমার:২৮]

﴿ تَبَارَكَ ٱلَّذِي نَزَّلَ ٱلۡفُرۡقَانَ عَلَىٰ عَبۡدِهِ ﴾ [الفرقان: ١]

“পরম কল্যাণময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফয়সালার গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন।” [সূরা আল-ফুরকান: ১]

﴿ الٓمٓ ١ ذَٰلِكَ ٱلۡكِتَٰبُ لَا رَيۡبَۛ فِيهِۛ هُدٗى لِّلۡمُتَّقِينَ ٢ ﴾ [البقرة: ١،  ٢]

“আলিফ লাম মীম, এ সেই কিতাব যাতে কোনোই সন্দেহ নেই। পথ প্রদর্শনকারী মুত্তাকীদের জন্য।” [সূরা আল-বাকারা: ১-২]

﴿ قُلۡ مَن كَانَ عَدُوّٗا لِّـجِبۡرِيلَ فَإِنَّهُۥ نَزَّلَهُۥ عَلَىٰ قَلۡبِكَ بِإِذۡنِ ٱللَّهِ مُصَدِّقٗا لِّمَا بَيۡنَ يَدَيۡهِ وَهُدٗى وَبُشۡرَىٰ لِلۡمُؤۡمِنِينَ ﴾ [البقرة: ٩٧]

“আপনি বলে দিন, যে কেউ জিবরাঈলের শত্রু হয়-যেহেতু তিনি আল্লাহর আদেশে এ কালাম আপনার অন্তরে নাযিল করেছেন, যা সত্যায়নকারী তাদের সম্মুখস্থ কালামের এবং মুমিনদের জন্য পথপ্রদর্শক ও সুসংবাদদাতা।” [সুরা বাকারা: ৯৭]

﴿ ذَٰلِكَ نَتۡلُوهُ عَلَيۡكَ مِنَ ٱلۡأٓيَٰتِ وَٱلذِّكۡرِ ٱلۡحَكِيمِ ٥٨ ﴾ [ال عمران: ٥٨]

এটা তো তা-ই যা আমরা আপনাকে পড়ে শুনাই, আয়াত এবং প্রজ্ঞাময় যিকির থেকে।” [সূরা আলে-ইমরান: ৫৮]

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ قَدۡ جَآءَكُم بُرۡهَٰنٞ مِّن رَّبِّكُمۡ وَأَنزَلۡنَآ إِلَيۡكُمۡ نُورٗا مُّبِينٗا ١٧٤ ﴾ [النساء: ١٧٤]

“হে লোকসকল, তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট দলীল-প্রমাণাদি পৌঁছে গেছে। আর আমরা তোমাদের প্রতি প্রকৃষ্ট আলো অবতীর্ণ করেছি।” [সূরা আন-নিসা: ১৭৪]

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ قَدۡ جَآءَتۡكُم مَّوۡعِظَةٞ مِّن رَّبِّكُمۡ وَشِفَآءٞ لِّمَا فِي ٱلصُّدُورِ وَهُدٗى وَرَحۡمَةٞ لِّلۡمُؤۡمِنِينَ ٥٧ ﴾ [يونس: ٥٧]

“হে লোকসকল, তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে উপদেশবাণী এবং অন্তরের রোগের নিরাময়, হেদায়েত ও রহমত মুসলিমদের জন্য।” [সূরা ইউনুস: ৫৭]

﴿ إِنَّ هَٰذَا ٱلۡقُرۡءَانَ يَهۡدِي لِلَّتِي هِيَ أَقۡوَمُ وَيُبَشِّرُ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٱلَّذِينَ يَعۡمَلُونَ ٱلصَّٰلِحَٰتِ أَنَّ لَهُمۡ أَجۡرٗا كَبِيرٗا ٩ ﴾ [الاسراء: ٩]

“নিশ্চয় এ কুরআন প্রদর্শন করে সর্বাধিক সরল পথের দিকে এবং সৎকর্ম পরায়ণ মুমিনদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্যে রয়েছে মহা পুরস্কার।” [সূরা বনী ইসরাঈল: ৯]

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِ ٱلَّذِيٓ أَنزَلَ عَلَىٰ عَبۡدِهِ ٱلۡكِتَٰبَ وَلَمۡ يَجۡعَل لَّهُۥ عِوَجَاۜ ١ قَيِّمٗا لِّيُنذِرَ بَأۡسٗا شَدِيدٗا مِّن لَّدُنۡهُ وَيُبَشِّرَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٱلَّذِينَ يَعۡمَلُونَ ٱلصَّٰلِحَٰتِ أَنَّ لَهُمۡ أَجۡرًا حَسَنٗا ٢ ﴾ [الكهف: ١،  ٢]

“সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাঁর বান্দার উপর কিতাব নাযিল করেছেন এবং তাতে রাখেন নি কোনো বক্রতা। সরলরূপে, যাতে সে তাঁর পক্ষ থেকে কঠিন আযাব সম্পর্কে সতর্ক করে এবং সুসংবাদ দেয়, সেসব মুমিনকে, যারা সৎকর্ম করে, নিশ্চয় তাদের জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান।” [সূরা কাহাফ, আয়াত ১-২]

﴿ بَلۡ هُوَ قُرۡءَانٞ مَّجِيدٞ ٢١ فِي لَوۡحٖ مَّحۡفُوظِۢ ٢٢ ﴾ [البروج: ٢١،  ٢٢]

“বরং এটা মহান কুরআন, লওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ”। [সূরা বুরূজ, আয়াত ২১-২২]

﴿ إِنَّهُۥ لَقُرۡءَانٞ كَرِيمٞ ٧٧ فِي كِتَٰبٖ مَّكۡنُونٖ ٧٨ لَّا يَمَسُّهُۥٓ إِلَّا ٱلۡمُطَهَّرُونَ ٧٩ تَنزِيلٞ مِّن رَّبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٨٠ ﴾ [الواقعة: ٧٧،  ٨٠]

“নিশ্চয় এটা সম্মানিত কুরআন, যা আছে এক গোপন কিতাবে, যারা পাক-পবিত্র, তারা ব্যতীত অন্য কেউ একে স্পর্শ করবে না, এটা সৃষ্টিকুলের রবের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।” [সূরা ওয়াক্বি‘আ, আয়াত ৭৭-৮০]

এগুলো ছাড়াও আরো অনেক আয়াতে এই মহাগ্রন্থের নানা নাম ও গুণাবলীর কথা উল্লেখ হয়েছে, যা এর সুমহান মর্যাদা, সর্বোচ্চ সম্মানের প্রমাণিত হয়। কেনইবা হবে না? এর কথক হলেন স্বয়ং মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন, যিনি গোপন ও প্রকাশ্য সব বিষয়ের সর্বজ্ঞানী। তিনি বলেনঃ

﴿ وَلَوۡ أَنَّمَا فِي ٱلۡأَرۡضِ مِن شَجَرَةٍ أَقۡلَٰمٞ وَٱلۡبَحۡرُ يَمُدُّهُۥ مِنۢ بَعۡدِهِۦ سَبۡعَةُ أَبۡحُرٖ مَّا نَفِدَتۡ كَلِمَٰتُ ٱللَّهِۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٞ ٢٧ ﴾ [لقمان: ٢٧]

“পৃথিবীতে যত বৃক্ষ আছে, সবই যদি কলম হয় এবং সমুদ্রের সাথেও সাত সমুদ্র যুক্ত হয়ে কালি হয়, তবুও তাঁর বাক্যাবলী লিখে শেষ করা যাবে না। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়”। [সূরা লোকমান, আয়াত ২৭]

﴿ إِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا ٱلذِّكۡرَ وَإِنَّا لَهُۥ لَحَٰفِظُونَ ٩ ﴾ [الحجر: ٩]

“নিশ্চয় আমরা স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমরা নিজেই এর সংরক্ষক”। [সূরা হিজর, আয়াত ৯]

এখানে উল্লেখযোগ্য যে, কুরআনের যে সব নাম বা সিফাত রয়েছে তার প্রত্যেকটি বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আলোচনা অতিদীর্ঘ হওয়ার ভয় না হলে বাকী নামসমূহ বিস্তারিতভাবে এখানে আলোচনা করতাম। এ সম্মানিত কিতাবের সবচেয়ে বড় মহত্ব হলো এর সংরক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজেই নিয়েছেন। কোনো সৃষ্ট জীবের কাছে এর হিফাযতের দায়িত্ব দেননি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ بَلۡ هُوَ قُرۡءَانٞ مَّجِيدٞ ٢١ فِي لَوۡحٖ مَّحۡفُوظِۢ ٢٢ ﴾ [البروج: ٢١،  ٢٢]

“বরং এটা মহান কুরআন, লওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ”। [সূরা বুরুজ, আয়াত ২১-২২]

ইবনুল কাইয়্যেম (রহ.) বলেছেন: আল্লাহ তা‘আলা নিন্মোক্ত আয়াতে

﴿ بَلۡ هُوَ قُرۡءَانٞ مَّجِيدٞ ٢١ فِي لَوۡحٖ مَّحۡفُوظِۢ ٢٢ ﴾ [البروج: ٢١،  ٢٢]

“আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।” [সূরা হিজর, আয়াত ৯] কুরআনের সংরক্ষণ ও সূরায়ে বুরুজে সংরক্ষণের জায়গা সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনকে কোনো ধরণের সংযোজন ও বিয়োজন থেকে মুক্ত রেখেছেন, এর অর্থ বিকৃতি, শব্দ পরিবর্তন ও সংরক্ষণ করেছেন। এর হরফসমূহ সব ধরণের বাড়ানো বা কমানো থেকে এবং অর্থসমূহ বিকৃতি ও পরিবর্তন থেকে হেফাযত করেছেন।

আল্লাহর কিতাব আল কুরআন সব ফিতনা ফাসাদ থেকে মুক্ত, তা মু’মিনের নিত্যসঙ্গী, অন্তরের আলো, হৃদয়ের বসন্ত, দুঃশ্চিন্তা দুর্ভাবনা দূরকারী। আল্লাহর কিতাব আমাদের পূর্ববর্তীদের ও পরবর্তীদের সংবাদদাতা, পরস্পরের মাঝে ফয়সালাকারী। তা চিরন্তন ফয়সালা, কোনোরূপ হাসি তামাশার জিনিস নয়। যেসব আল্লাহদ্রোহীরা তাকে ত্যাগ করেছে আল্লাহ তার প্রতিশোধ নিয়েছেন, কেউ তাকে বাদ দিয়ে অন্য কোথাও হিদায়াত অন্বেষণ করলে আল্লাহ তা‘আলা তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তা আল্লাহ তা‘আলার শক্ত রজ্জু, প্রজ্ঞাময় উপদেশবাণী, সরল সঠিক পথ, যা কখনো পথভ্রষ্ট করে না, কাউকে দ্বিধা সংকোচে ফেলে না, উলামায়ে কিরামগণ কখনো এর মহাজ্ঞান বিজ্ঞান অর্জনে পরিতুষ্ট হতে পারবে না (তারা আরো বেশি বেশি অর্জন করতে চাইবে), অধিক উত্তর প্রদানের পরও তা পুরাতন হয় না। এর বিস্ময় শেষ হবার নয়, এর উপদেশ চিরন্তন। তা জ্বীন সম্প্রদায়কে বিরত রাখতে পারেনি যখন তারা এর তিলাওয়াত শ্রবন করেছিল, তখন তারা বলেছিল,

﴿ إِنَّا سَمِعۡنَا قُرۡءَانًا عَجَبٗا ١ ﴾ [الجن: ١]

“আমরা (জ্বিন জাতি) বিস্ময়কর কুরআন শ্রবণ করেছি।” [সূরা আল জিন: ১]

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَا مِنَ الْأَنْبِيَاءِ مِنْ نَبِيٍّ إِلَّا قَدِ اُعْطِيَ مِنَ الْآيَاتِ مَا مِثْلُهُ آمَنَ عَلَيْهِ الْبَشَرُ، وَإِنَّمَا كَانَ الَّذِي أُوتِيتُ وَحْيًا أَوْحَى اللهُ إِلَيَّ، فَأَرْجُو أَنْ أَكُونَ أَكْثَرَهُمْ تَابِعًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ»

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “প্রত্যেক নবীকে তাঁর পূর্ববর্তী নবীদের প্রায় অনুরূপ মু‘জিযা দেওয়া হয়েছিল। অতঃপর লোকেরা তাঁর উপর ঈমান এনেছে। কিন্তু আমাকে যে মু‘জিযা দেওয়া হয়েছে তা হলো অহী (আল কুরআন), যা আল্লাহ তা‘আলা আমার উপর নাযিল করেছেন। আমি আশা করি কিয়ামতের দিবসে তাঁদের অনুসারীদের তুলনায় আমার অনুসারীর সংখ্যা সর্বাধিক হবে।”

অহংকার থেকে মুক্তির উপায়


অহংকার একটি খারাপ গুণ। এটি ইবলিস ও দুনিয়ায় তার সৈনিকদের বৈশিষ্ট্য; আল্লাহ যাদের অন্তর আলোহীন করে দিয়েছেন।সর্বপ্রথম আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টির উপর যে অহংকার করেছিল সে হচ্ছে— লানতপ্রাপ্ত ইবলিস। যখন আল্লাহ তাকে নির্দেশ দিলেন— আদমকে সেজদা কর; তখন সে অসম্মতি জানিয়ে বলল: “আমি তার চেয়ে উত্তম। আমাকে বানিয়েছেন আগুন দিয়ে; তাকে বানিয়েছেন মাটি দিয়ে।”

আল্লাহ তাআলা বলেন:

“আর আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করলাম, এরপর আকার-অবয়ব তৈরি করেছি। অতঃপর আমি ফেরেশতাদেরকে বললাম – আদমকে সেজদা কর; তখন সবাই সেজদা করল। কিন্তু ইবলিস সেজদাকারীদের মধ্যে ছিল না। আল্লাহ বললেন: আমি যখন তোকে সেজদা করার আদেশ দিলাম তখন কিসে তোকে সেজদা করতে বাধা দিল? সে বলল: আমি তার চেয়ে উত্তম। আমাকে বানিয়েছেন আগুন দিয়ে; তাকে বানিয়েছেন মাটি দিয়ে।” [ সূরা আরাফ, আয়াত: ১১-১২ ]

তাই অহংকার ইবলিসি চরিত্র। যে ব্যক্তি অহংকার করতে চায় সে জেনে রাখুক সে শয়তানের চরিত্র গ্রহণ করেছে। সে সম্মানিত ফেরেশতাদের চরিত্র গ্রহণ করেনি, যারা আল্লাহর আনুগত্য করে সেজদায় লুটিয়ে পড়েছিল।

অহংকার অহংকারীর জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ, ইজ্জতের মালিক আল্লাহকে সরাসরি দেখতে না পাওয়ার কারণ। দলিল হচ্ছে এ দুইটি হাদিস:

আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন তিনি বলেন: “যার অন্তরে বিন্দু পরিমাণ অহংকার আছে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। একলোক বলল: যে কোন লোক পছন্দ করে তার জামাটা ভাল হোক, তার জুতাটা ভাল হোক? তিনি বললেন: নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর; তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। অহংকার হচ্ছে – সত্যকে উপেক্ষা করা এবং মানুষকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা।” [ সহিহ মুসলিম ]

সত্যকে উপেক্ষার অর্থ: সত্য জেনেও সেটাকে প্রত্যাখ্যান করা।

মানুষকে তুচ্ছ করার অর্থ: মানুষকে ছোট করা, হেয় করা।

আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি অহংকারবশতঃ কাপড় ঝুলিয়ে হাঁটবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দিকে তাকাবেন না। আবু বকর (রাঃ) বললেন: আমার কাপড়ের একটা অংশ ঝুলে পড়ে যায়; আমি বারবার সেটাকে টেনে নেই। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: তুমি তো অহংকারবশতঃ সেটা কর না।” [ সহিহ বুখারী – ৩৪৬৫]

অহংকার এমন একটি গুণ যা শুধু আল্লাহর জন্যই প্রযোজ্য। যে ব্যক্তি এ গুণ নিয়ে আল্লাহর সাথে টানাটানি করে আল্লাহ তাকে ধ্বংস করে দেন, তার প্রতাপ নস্যাৎ করে দেন ও তার জীবনকে সংকুচিত করে দেন।
আবু সাঈদ খুদরি (রাঃ) ও আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন: সম্মান হচ্ছে- আল্লাহর পরনের কাপড়; আর অহংকার হচ্ছে- আল্লাহর চাদর। যে ব্যক্তি এটা নিয়ে আমার সাথে টানাটানি করে আমি তাকে শাস্তি দেই।” [ সহিহ মুসলিম – ২৬২০]

নববী বলেন:

সহিহ মুসলিমের সব কপিতে এভাবে আছে। ازاره ও رداؤه শব্দদ্বয়ের ه জমির (সর্বনাম) দ্বারা আল্লাহকে বুঝানো হচ্ছে। এখানে বাক্যের কিছু অংশ উহ্য রয়েছে সেটা হচ্ছে-قال الله تعالى : ومن ينازعني ذلك أعذبه ( অর্থঃ আল্লাহ বলেন: যে ব্যক্তি সেটা নিয়ে আমার সাথে টানাটানি করবে আমি তাকে শাস্তি দিব)

আমার সাথে ‘টানাটানি’ করবে এর অর্থ- এ গুণ লালন করবে; ফলে সে অংশীদার এর পর্যায়ে পড়বে। এটি অহংকারের কঠিন শাস্তি ও অহংকার হারাম হওয়ার স্পষ্ট ঘোষণা।[ শারহু মুসলিম (১৬/১৭৩)]

যে ব্যক্তি অহংকার করতে চায় ও বড়ত্ব দেখাতে চায় আল্লাহ তাকে নীচে ছুড়ে ফেলে দেন ও বেইজ্জত করেন। যেহেতু সে তার মূলপরিচয়ের বিপরীতে গিয়ে কিছু করার চেষ্টা করেছে তাই আল্লাহ তাকে তার ইচ্ছার বিপরীতে শাস্তি দিয়ে দেন। বলা হয়: শাস্তি আমলের সম জাতীয় হয়ে থাকে।

যে ব্যক্তি মানুষের উপর অহংকার করে কিয়ামতের দিন তাকে মানুষের পায়ের নীচে মাড়ানো হবে। এভাবে আল্লাহ তাআলা অহংকারের কারণে তাকে লাঞ্ছিত করবেন।

আমর ইবনে শুয়াইব তার পিতা থেকে তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন তিনি বলেন: “কিয়ামতের দিন অহংকারীদেরকে ছোট ছোট পিপীলিকার ন্যায় মানুষের আকৃতিতে হাশরের ময়দানে উপস্থিত করা হবে। অপমান ও লাঞ্ছনা তাদেরকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলবে। তাদেরকে জাহান্নামের একটি জেলখানায় একত্রিত করা হবে, যার নাম হবে “বুলাস। আগুন তাদেরকে চতুর্দিক থেকে ঢেকে ফেলবে। জাহান্নামীদের শরীরের ঘাম তাদেরকে পান করতে বাধ্য করা হবে।”। [সুনানে তিরমিজি – ২৪৯২, আলবানী সহিহ তিরমিজি গ্রন্থে – ২০১৫ এ হাদিসটিকে ‘হাসান’ বলেছেন]

অহংকারের নানান রূপ রয়েছে:
১. সত্যকে গ্রহণ না করা; অন্যায়ভাবে বিতর্ক করা। যেমনটি আমরা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের হাদিসে উল্লেখ করেছি। “অহংকার হচ্ছে- সত্যকে উপেক্ষা করা এবং মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা।”

২. নিজের সৌন্দর্য্য, দামী পোশাক ও দামী খাবার ইত্যাদি দ্বারা অভিভূত হয়ে পড়া এবং মানুষের উপর দাম্ভিকতা ও অহংকার প্রকাশ করা।

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অথবা আবুল কাসেম বলেছেন: একদা এক ব্যক্তি হুল্লা পরে, আত্মম্ভরিতা নিয়ে, মাথা আঁচড়িয়ে হাঁটছিল এমতাবস্থায় আল্লাহ তাকে সহ ভূমি ধ্বস করে দিলেন এবং এভাবে কিয়ামত পর্যন্ত সে নীচের দিকে যেতে থাকবে।”[সহিহ বুখারি – ৩২৯৭ ও সহিহ মুসলিম – ২০৮৮]

এ ধরণের অহংকারের মধ্যে ঐ ব্যক্তির আচরণও পড়বে যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

“সে ফল পেল। অতঃপর কথা প্রসঙ্গে সঙ্গীকে বললঃ আমার ধন-সম্পদ তোমার চাইতে বেশী এবং জনবলে আমি অধিক শক্তিশালী।” [ সূরা কাহাফ, আয়াত: ৩৪]

কখনো কখনো আত্মীয়স্বজন ও বংশধরদের নিয়ে গৌরবের মাধ্যমেও অহংকার হতে পারে.

অহংকার প্রতিরোধ করার উপায় হল- নিজেকে অন্য দশজন মানুষের মত মনে করা। অন্যসব লোককে নিজের সমতুল্য মনে করা। তারাও এক বাপ-মা থেকে জন্মগ্রহণ করেছে। যেভাবে আপনিও এক বাপ-মা এর ঘরে জন্মগ্রহণ করেছেন। আর আল্লাহভীতি ব্যক্তির মর্যাদা পরিমাপের মানদণ্ড। আল্লাহ তাআলা বলেন:
“নিশ্চয় তোমাদের যে ব্যক্তি বেশি তাকওয়াবান সে আল্লাহর নিকট বেশি সম্মানিত।” [ সূরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩]

অহংকারী মুসলিমের জানা থাকা উচিত সে যতই বড় হোক না কেন পাহাড় সমান তো আর হতে পারবে না; জমিন ছিদ্র করে তো বেরিয়ে যেতে পারবে না। যেমনটি আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

“অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোন দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না। পদচারণায় মধ্যবর্তিতা অবলম্বন কর এবং কণ্ঠস্বর নীচু কর। নিঃসন্দেহে গাধার স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।” [ সূরা লোকমান, আয়াত: ১৭-১৮]

ইমাম কুরতুবী বলেন:

“পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণ করো না” এখানে অহংকার থেকে বারণ করা হয়েছে এবং বিনয়ী হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আয়াতে المرح শব্দের অর্থ- তীব্র আনন্দ। কেউ কেউ বলেছেন: হাঁটার মধ্যে অহংকার করা, কেউ বলেছেন: কোন মানুষের তার মর্যাদার সীমা অতিক্রম করে যাওয়া।

কাতাদা বলেছেন: হাঁটার ক্ষেত্রে অহংকার। কেউ কেউ বলেছেন: প্রত্যাখান। কেউ কেউ বলেছেন: উদ্যম।

এ উক্তিগুলো সমার্থবোধক। কিন্তু এগুলো দুইভাগে বিভক্ত:

একটি: নন্দিত অপরটি: নিন্দিত।

অহংকার, প্রত্যাখান, দাম্ভিকতা এবং কোন মানুষের তার সীমা অতিক্রম করা: নিন্দিত।

আর আনন্দ ও উদ্যমতা: নন্দিত। [ তাফসিরে কুরতুবী ১০/২৬০]

অহংকার প্রতিরোধ করার আরেকটি উপায় হলো- এটি মনে রাখা যে, অহংকারীকে কিয়ামতের দিন পিঁপড়ার ন্যায় ছোট করে হাশর করা হবে মানুষের পায়ের নীচে মাড়ানো হবে। অহংকারী মানুষের নিকট অপছন্দীয় যেমনিভাবে সে আল্লাহর নিকটও অপছন্দনীয়। মানুষ বিনয়ী, নম্র, ভদ্র, সহজ, সরল মানুষকে ভালবাসে। আর কঠিন ও রুঢ় স্বভাবের মানুষকে ঘৃণা করে।

অহংকার প্রতিরোধ করার আরেকটি উপায় হলো- অহংকারী যে পথ দিয়ে বের হয়েছে পেশাবও সে পথ দিয়ে বের হয়। তার সৃষ্টির সূচনা হয়েছে নাপাক বীর্য থেকে। তার সর্বশেষ পরিণতি হচ্ছে- পচা লাশ। এ দুই অবস্থার মাঝখানে সে পায়খানা বহন করে চলছে। সুতরাং অহংকার করার মত কী আছে?!!আমরা আল্লাহর নিকটে প্রার্থনা করছি তিনি যেন আমাদেরকে অহংকার থেকে মুক্তি দেন এবং আমাদেরকে বিনয় দান করেন।

আল্লাহই ভাল জানেন।

Friday, 9 February 2018

জানাজা নিয়ে ইসলামিক হাদীস-১ [ বুখারী শরীফ ]

জানাজা নিয়ে ইসলামিক হাদীস-১ [ বুখারী শরীফ ]

১১৬৫ মূসা ইবনু ইসমায়ীল (রহঃ) আবূ যার্‌ (গিফারী) (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একজন আগন্তুক [হযরত জিব্‌রীল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম)] আমার রব-এর কাছ থেকে এসে আমাকে খবর দিলেন অথবা তিনি বলেছিলেন, আমাকে সুসংবাদ দিলেন, আমার উম্মাতের মধ্যে যে ব্যাক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক না করা অবস্থায় মারা যাবে, সে জান্নাতে দাখিল হবে। আমি বললাম, যদিও সে যিনা করে থাকে এবং যদিও সে চুরি করে থাকে? তিনি বললেনঃ যদিও সে যিনা করে থাকে এবং যদিও সে চুরি করে থাকে।

১১৬৬ উমর ইবনু হাফ্‌স (রহঃ) আবদুল্লাহ‌ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যাক্তি আল্লাহর সঙ্গে শির্‌ক করা অবস্থায় মারা যায়, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আমি বললাম, যে আল্লাহর সঙ্গে কোন কিছুর শির্‌ক না করা অবস্থায় মারা যায়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

১১৬৭ আবূল ওয়ালীদ (রহঃ) বারাআ ইবনু আযিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাতটি বিষয়ে আমাদের আদেশ করেছেন এবং সাতটি বিষয়ে আমাদের নিষেধ করেছেন। তিনি আমাদের আদেশ করেছেন- ১ জানাযায় অনুগমন করতে, ২ অসুস্থ ব্যাক্তির খোঁজ-খবর নিতে, ৩ দাওয়াত দাতার দাওয়াত কবূল করতে, ৪ মাযলূমকে সাহায্য করতে, ৫ কসম থেকে দায়মুক্ত করতে, ৬ সালামের জওয়াব দিতে এবং ৭ হাঁচিদাতাকে (ইয়ারহামুকাল্লাহু বলে) খুশি করতে। আর তিনি নিষেধ করেছেন- ১ রুপার পাত্র, ২ সোনার আংটি, ৩ রেশম, ৪ দীবাজ, ৫ কাস্‌সী (কেস্‌রেশম), ৬ ইস্‌তিব্‌রাক (তসর জাতীয় রেশম) ব্যবহার করতে।
** এ হাদীসে নিষেধকৃত ছয়টির উল্লেখ করা হয়েছে। সপ্তম বিষয়টি এই কিতাবের 'সোনার আংটি' অনুচ্ছেদে বর্ণিত আছে।

১১৬৮ মুহাম্মদ (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে আমি বলতে শুনেছি যে, এক মুসলিমের প্রতি অপর মুসলিমের হক্‌ পাঁচটিঃ ১ সালামের জওয়াব দেওয়া, ২ অসুস্থ ব্যাক্তির খোঁজ-খবর নেওয়া, ৩ জানাযার অনুগমন করা, ৪ দাওয়াত কবূল করা এবং ৫ হাঁচিদাতাকে খুশি করা। আবদুর রায্‌যাক (রহঃ) আমর ইবনু আবূ সালামা (রহঃ) এর অনুসরণ করেছেন। আবদুর রায্‌যাক (রহঃ) বলেন, আমাকে মা'মার (রহঃ)-এরূপ অবহিত করেছেন এবং এ হাদীস সালামা (রহঃ) উকাইল (রহঃ) থেকে রিওয়ায়াত করেছেন।

১১৬৯ বিশ্‌র ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) আবূ সালামা (রহঃ) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সহধর্মিণী আয়িশা (রাঃ) আমাকে বলেছেন, [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর ওফাতের খবর পেয়ে] আবূ বক্‌র (রাঃ) 'সুন্‌হ'-এ অবস্থিত তাঁর বাড়ি থেকে ঘোড়ায় চড়ে চলে এলেন এবং নেমে মসজিদে প্রবেশ করলেন। সেখানে লোকদের সাথে কোন কথা না বলে আয়িশা (রাঃ)-এর ঘরে প্রবেশ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দিকে অগ্রসর হলেন। তখন তিনি একখানি 'হিবারাহ' ইয়ামানী চাঁদর দ্বারা আবৃত ছিলেন। আবূ বক্‌র (রাঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মুখমণ্ডল উম্মুক্ত করে তাঁর উপর ঝুকে পড়লেন এবং চুমু খেলেন, তারপর কাঁদতে লাগলেন এবং বললেন, ইয়া নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ! আমার পিতা আপনার জন্য কুরবান হোক। আল্লাহ আপনার জন্য দুই মৃত্যু একত্রিত করবেন না। তবে যে মৃত্যু আপনার জন্য নির্ধারিত ছিল তা তো আপনি কবুল করেছেন। আবূ সালামা (রহঃ) বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) আমাকে খবর দিয়েছেন যে, (তারপর) আবূ বক্‌র (রাঃ) বেরিয়ে এলেন। তখন উমর (রাঃ) লোকদের সাথে কথা বলছিলেন। আবূ বক্‌র (রাঃ) তাঁকে বললেন, বসে পড়ুন। তিনি তা মানলেন না। আবূ বক্‌র (রাঃ) তাঁকে বললেন, বসে পড়ুন , তিনি তা মানলেন না। তখন আবূ বক্‌র (রাঃ) কালিমা-ই-শাহাদাতের দ্বারা (বক্তব্য) আরম্ভ করলেন। লোকেরা উমর (রাঃ)-কে ছেড়ে তাঁর দিকে আকৃষ্ট হন। আবূ বক্‌র (রাঃ) বললেন আম্‌মা বা'দু, তোমাদের মধ্যে যারা মুহাম্মদ এর ইবাদত করতে, মুহাম্মদ সত্যই ইন্‌তিকাল করেছেন। আর যারা মহান আল্লাহর ইবাদত করতে, নিশ্চয়ই আল্লাহ চিরঞ্জিব, অমর। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেনঃ অর্থাৎ মুহাম্মদ একজন রাসূল মাত্র শাকিরীন পর্যন্ত। (৩ : ১১৪) আল্লাহর কসম, মনে হচ্ছিল যেন আবূ বক্‌র (রাঃ)-এর তিলাওয়াত করার পূর্ব পর্যন্ত লোকদের জানাইছিল না যে, আল্লাহপাক এ আয়াত নাযিল করেছেন। এখনই যেন লোকেরা আয়াতখানি তার কাছ থেকে পেলেন। প্রতিটি মানুষকেই তখন ঐ আয়াত তিলাওয়াত করতে শোনা গেল।

১১৭০ ইয়াহ্‌ইয়া ইবনু বুকাইর (রহঃ) আনসারী মহিলা ও নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে বাই'আতকারী উম্মুল আলা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, (হিজরতের পর) কুরআর মাধ্যমে মুহাজিরদের বণ্টন করা হচ্ছিল। তাতে উসমান ইবনু মাযঊন (রাঃ) আমাদের ভাগে পড়লেন, আমরা (সা’দরে) তাঁকে আমাদের বাড়িতে স্থান দিলাম। এক সময় তিনি সেই রোগে আক্রান্ত হলেন, যাতে তাঁর মৃত্যু হল। যখন তাঁর মৃত্যু হল এবং তাঁকে গোসল করিয়ে কাফনের কাপড় পরানো হল, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবেশ করলেন। তখন আমি বললাম, হে আবূস্‌-সায়িব, আপনার উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক! আপনার সম্বন্ধে আমার সাক্ষ্য এই যে, আল্লাহ আপনাকে সম্মানিত করেছেন। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি কি করে জানলে যে, আল্লাহ তাঁকে সম্মানিত করেছেন? আমি বললাম, আমার পিতা আপনার জন্য কুরবান, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‌! তাহলে আল্লাহ আর কাকে সম্মানিত করবেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাঁর ব্যাপার তো এই যে, নিশ্চয় তাঁর মৃত্যু হচ্ছে এবং আল্লাহর কসম! আমি তাঁর জন্য মঙ্গল কামনা করি। আল্লাহর কসম! আমি জানিনা আমার সঙ্গে কী ব্যবহার করা হবে, অথচ আমি আল্লাহর রাসূল। সেই আনসারী মহিলা বললেন, আল্লাহর কসম! এরপর আর কোন দিন আমি কোন ব্যাক্তি সম্পর্কে পবিত্র বলে মন্তব্য করব না।

১১৭১ সায়ীদ ইবনু উফাইর (রহঃ) লায়স (রহঃ) সূত্রে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। আর নাফি' ইবনু ইয়াযীদ (রহঃ) উকাইল (রহঃ) সূত্রে বলেন- তার সঙ্গে কি ব্যবহার করা হবে?১ শু'য়াইব, আমর ইবনু দীনার ও মা'মার (রহঃ) উকাইল (রহঃ)-এর অনুসরণ করেছেন।
১ অর্থাৎ প্রথম বর্ণনায় রয়েছে -আমার সঙ্গে কি ব্যবহার করা হবে? আর দ্বিতীয় বর্ণনায় রয়েছে তার সঙ্গে কি ব্যবহার করা হবে?

১১৭২ মুহাম্মদ ইবনু বাশ্‌শার (রহঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (উহুদ যুদ্ধে) আমার পিতা [আবদুল্লাহ‌ (রাঃ)] শহীদ হয়ে গেলে আমি তাঁর মুখমণ্ডল থেকে কাপড় সরিয়ে কাঁদতে লাগলাম। লোকেরা আমাকে নিষেধ করতে লাগল। কিন্তু নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নিষেধ করেন নি। আমার ফুফী ফাতিমা (রাঃ)ও কাঁদতে লাগলেন। এতে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কাঁদ বা না-ই কাঁদ (উভয় সমান) তোমরা তাকে তুলে নেওয়া পর্যন্ত ফিরিশ্‌তাগণ তাঁদের ডানা দিয়ে ছায়া বিস্তার করে রেখেছেন। ইবনু জুরাইজ (রহঃ) মুহাম্মাদ ইবনু মুন্‌কাদির (রহঃ) সূত্রে জাবির (রাঃ) থেকে হাদীস বর্ণনায় শু'বা (রাঃ)-এর অনুসরণ করেছেন।

১১৭৩ ইসমায়ীল (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাজাশী যে দিন মারা যান সেদিন-ই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মৃত্যু সংবাদ দেন এবং জানাযার স্থানে গিয়ে লোকদের কাতারবদ্ধ করে চার তাক্‌বির আদায় করলেন।

১১৭৪ আবূ মা'মার (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ল্লহা্‌ (মূতা যুদ্ধের অবস্থা বর্ণনায়) বললেনঃ যায়দ (রাঃ) পতাকা বহন করেছে তারপর শহীদ হয়েছে। তারপর জা'ফর (রাঃ) (পতাকা) হাতে নিয়েছে; সেও শহীদ হয়। তারপর আবদুল্লাহ‌ ইবনু রাওয়াহা (রাঃ) (পতাকা) ধারন করে এবং সেও শহীদ হয়। এ সংবাদ বলেছিলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর দু' চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল। এরপর খালিদ ইবনু ওয়ালিদ (রাঃ) পরামর্শ ছাড়াই (পতাকা) হাতে তুলে নেয় এবং তাঁর দ্বারা বিজয় সূচিত হয়।

১১৭৫ মুহাম্মদ (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যাক্তি মারা গেল। যার অসুস্থতার সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খোঁজ-খবর নিতেন। তাঁর মৃত্যু হয় এবং রাতেই তাঁকে দাফন করেন। সকাল হলে তাঁরা (এ বিষয়ে) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে অবহিত করেন। তিনি বললেনঃ আমাকে সংবাদ দিতে তোমাদের কিসে বাধা দিল? তারা বলল, তখন ছিল রাত এবং ঘোর অন্ধকার। তাই আপনাকে কষ্ট দেওয়া আমরা পছন্দ করিনি। তিনি ঐ ব্যাক্তির কবরের কাছে গেলেন এবং তাঁর উপর সালাত (নামায/নামাজ) জানাযা আদায় করলেন।

১১৭৬ আবূ মা'মার (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন মুসলিমের তিনটি সন্তান সাবালিগ হওয়ার আগে মারা গেলে তাদের প্রতি রহমত স্বরূপ অবশ্যই আল্লাহ তা'আলা ঐ ব্যাক্তিকে জান্নাতে দাখিল করবেন।

১১৭৭ মুসলিম (রহঃ) আবূ সায়ীদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, মহিলাগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে আরয করলেন, আমাদের জন্য একটি দিন নির্ধারিত করে দিন। তারপর তিনি একদিন তাদের ওয়ায-নসীহত করলেন এবং বললেনঃ যে স্ত্রীলোকের তিনটি সন্তান মারা যায়, তারা তার জন্য জাহান্নামের প্রতিবন্ধক হবে। তখন এক মহিলা প্রশ্ন করলেন, দু' সন্তান মারা গেলে? তিনি বললেন, দু' সন্তান মারা গেলেও। শরীক (রহঃ) আবূ সায়ীদ ও আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, যারা বালিগ হয়নি।

১১৭৮ আলী (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন মুসলিমের তিনটি (নাবালিগ) সন্তান মারা গেলে, তারপরও সে জাহান্নমে প্রবেশ করবে-এমন হবে না। তবে শুধু কসম পূর্ণ হওয়ার পরিমাণ পর্যন্ত। আবূ আবদুল্লাহ‌ [ইমাম বুখারী (রাঃ)] বলেন- আল্লাহ তা'আলার ইরশাদঃ "তোমাদের প্রত্যেকেই তা অতিক্রম করবে"।

১১৭৯ আদম (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি কবরের কাছে উপস্থিত এক মহিলার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, সে তখন কাঁদছিল। তখন তিনি বললেনঃ আল্লাহকে ভয় কর এবং সবর কর।

১১৮০ ইসমায়ীল ইবনু আবদুল্লাহ‌ (রহঃ) উম্মে আতিয়্যাহ্‌ আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কন্যা [যায়নাব (রাঃ)] এর ইন্তেকাল হলে তিনি আমাদের কাছে এসে বললেনঃ তোমরা তাকে তিন, পাঁচ প্রয়োজন মনে করলে তার চাইতে অধিকবার বরই পাতাসহ পানি দিয়ে গোসল দাও। শেষবার কর্পূর বা (তিনি বলেছেন) কিছু কর্পূর ব্যবহার করবে। তোমরা শেষ করে আমাকে জানাও। আমরা শেষ করার পর তাঁকে জানালাম। তখন তিনি তাঁর চাঁদরখানি আমাদের দিয়ে বললেনঃ এটি তাঁর গায়ের সাথে জড়িয়ে দাও।

১১৮১ মুহাম্মদ (রহঃ) উম্মে আতিয়্যাহ্‌ আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কন্যা [যায়নাব (রাঃ)] এর ইন্তেকাল হলে তিনি আমাদের কাছে এসে বললেনঃ তোমরা তাঁকে তিন, পাঁচ প্রয়োজন মনে করলে তার চাইতে অধিকবার বরই পাতাসহ পানি দিয়ে গোসল দাও। শেষবার কর্পূর বা (তিনি বলেছেন) কিছু কর্পূর ব্যবহার করবে। তোমরা শেষ করে আমাকে জানাও। আমরা শেষ করার পর তাঁকে জানালাম। তখন তিনি তাঁর চাঁদরখানি আমাদের দিকে দিয়ে বললেনঃ এটি তাঁর ভিতরে কাপড় হিসেবে পরাও। আইয়ূব (রহঃ) বলেছেন, হাফ্‌সা (রহঃ) আমাকে মুহাম্মদ বর্ণিত হাদীসের অনুরূপ হাদীস শুনিয়েছেন। তবে তাঁর হাদীসে রয়েছে যে, তাকে বে-জোড় সংখ্যায় গোসল দিবে। আরও রয়েছে, তিনবার, পাঁচবার অথবা সাতবার করে আরো তাতে রয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ "তোমরা তার ডান দিন থেকে এবং তাঁর উযূ (ওজু/অজু/অযু)র স্থানসমূহ থেকে শুরু করবে। " তাতে একথাও রয়েছে- (বর্ণনাকারীণী) উম্মে আতিয়্যাহ্‌ (রাঃ) বলেছেন, আমরা তাঁর চুলগুলি আঁচড়ে তিনটি বেনী করে দিলাম।

১১৮২ আলী ইবনু আবদুল্লাহ‌ (রহঃ) উম্মে আতিয়্যাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কন্যার গোসলের ব্যাপারে ইরশাদ করেনঃ তোমরা তাঁর ডান দিক থেকে এবং উযূ (ওজু/অজু/অযু)র স্থানসমূহ থেকে শুরু করবে।

১১৮৩ ইয়াহ্‌ইয়া ইবনু মূসা (রহঃ) উম্মে আতিয়্যাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কন্যা [যায়নাব (রাঃ)]-কে গোসল দিতে যাচ্ছিলাম, গোসল দেওয়ার সময় তিনি আমাদের বলেনঃ তোমরা তাঁর ডান দিক থেকে এবং উযূ (ওজু/অজু/অযু)র স্থানসমূহ থেকে শুরু করবে।

১১৮৪ আবদুর রহমান ইবনু হাম্মাদ (রহঃ) উম্মে আতিয়্যাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কন্যার ইন্‌তিকাল হলে তিনি আমাদের বলেনঃ তোমরা তাকে তিনবার পাঁচবার অথবা যদি তোমরা প্রয়োজনীয় মনে কর, তবে তার চাইতে অধিকবার গোসল দাও। তোমরা শেষ করে আমাকে জানাবে। আমরা শেষ করে তাঁকে জানালাম। তখন তিনি তাঁর কোমর থেকে তাঁর চাঁদর (খুলে দিয়ে) বললেনঃ এটি তাঁর ভিতরের কাপড় হিসেবে পরিয়ে দাও।

১১৮৫ হামিদ ইবনু উমর (রহঃ) উম্মে আতিয়্যাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কন্যাগণের মধ্যে একজনের ইন্‌তিকাল হলে। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে গেলেন এবং বললেনঃ তোমরা তাকে তিনবার পাঁচবার অথবা যদি তোমরা প্রয়োজনীয় মনে কর, তবে তার চাইতে অধিকবার বরই পাতাসহ পানি দিয়ে গোসল দাও। শেষবারে কর্পূর (অথবা তিনি বলেন) 'কিছু কর্পূর' ব্যবহার করবে। গোসল শেষ করে আমাকে জানাবে। উম্মে আতিয়্যাহ্‌ (রাঃ) বলেন, আমরা শেষ করে তাঁকে জানালাম। তখন তিনি তাঁর চাঁদর আমাদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেনঃ এটি তাঁর ভিতরের কাপড় হিসেবে পরাও। আইয়ূব (রহঃ) হাফসা (রহঃ) সূত্রে উম্মে আতিয়্যাহ্‌ (রাঃ) থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেন এবং তাতে তিনি [উম্মে আতিয়্যাহ্‌ (রাঃ)] বলেছেন, তিনি ইরশাদ করেছিলেনঃ তাঁকে তিন, পাঁচ, সাত বা প্রয়োজনবোধে তার চাইতে অধিকবার গোসল দাও। হাফসা (রহঃ) বলেন, আতিয়্যাহ্‌ (রাঃ) বলেন, আমরা তাঁর মাথার চুলকে তিনটি বেনী বানিয়ে দেই।

১১৮৬ আহ্‌মদ (রহঃ) উম্মে আতিয়্যাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কন্যার মাথা তিনটি বেণী করে দেন। তাঁরা তা খুলেছেন, এরপর তা ধুয়ে তিনটি বেণী করে দেন।

১১৮৭ আহ্‌মদ (রহঃ) আইয়্যুব (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইবনু সীরীন (রহঃ)-কে বলতে শুনেছি, আনসারী মহিলা উম্মে আতিয়্যাহ্‌ (রাঃ) আসলেন, যিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে বাইয়াতকারীদের অন্যতম। তিনি তাঁর এক ছেলেকে দেখার জন্য দ্রুততার সাথে বাসরায় এসেছিলেন, কিন্তু তিনি তাকে পাননি। তখন তিনি আমাদের হাদীস শোনালেন। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে তাশরীফ নিয়ে আসেন, তখন আমরা তাঁর কন্যাকে গোসল দিচ্ছিলাম। তিনি বলেনঃ তোমরা তাঁকে তিনবার, পাঁচবার অথবা প্রয়োজনবোধে তার চাইতে অধিকবার বরই পাতাসহ পানি দ্বারা গোসল দাও। আর শেষবার কর্পূর দিও। তোমরা শেষ করে আমাকে জানাবে। তিনি বলেন, আমরা যখন শেষ করলাম, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাহ্‌ তাঁর চাঁদর আমাদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেনঃ এটাকে তাঁর গায়ের সাথে জড়িয়ে দাও। উম্মে আতিয়্যাহ্‌ (রাঃ)-এর বেশী বর্ণনা করেননি। [আইয়্যুব (রহঃ) বলেন, ] আমি জানিনা, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কোন কন্যা ছিলেন? তিনি বলেন, অর্থ গায়ের সাথে জড়িয়ে দেওয়া। সীরীন (রহঃ) মহিলা সম্পর্কে এইরূপ আদেশ করতেন যে, ভিতরের কাপড় (চাঁদরের মত পূর্ণ শরীরে) জড়িয়ে দিবে ইযারের মত ব্যবহার করবে না।

১১৮৮ কাবীসা (রহঃ) উম্মে আতিয়্যাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কন্যার কেশগুচ্ছ বেণী পাকিয়ে দিয়েছিলাম, অর্থাৎ তিনটি বেণী। ওয়াকী' (রহঃ) বলেন, সুফিয়ান (রহঃ) বলেছেন, মাথার সামনের অংশে একটি বেণী এবং দু' পাশে দু'টি বেণী।

১১৮৯ মূসা’দ্দাদ (রহঃ) উম্মে আতিয়্যাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কন্যাগণের মধ্যে একজনের ইন্‌তিকাল হলে। তিনি আমাদের নিকট এসে বললেনঃ তোমরা তাকে বরই পাতার পানি দিয়ে বে-জোড় সংখ্যক তিনবার পাঁচবার অথবা প্রয়োজনবোধে ততোধিকবার গোসল দাও। শেষবারে কর্পূর অথবা তিনি বলেছিলেন কিছু কর্পূর ব্যবহার করবে। তোমরা গোসল শেষ করে আমাকে জানাবে। আমরা শেষ করে তাঁকে জানালাম। তখন তিনি তাঁর চাঁদর আমাদের দিকে এগিয়ে দিলেন, আমরা তাঁর মাথার চুলগুলো তিনটি বেণী করে পিছনে রেখে দিলাম।

১১৯০ মুহাম্মদ ইবনু মুকাতিল (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে তিনখানা ইয়ামানী সাহুলী সাদা সূতী কাপড় দিয়ে কাফন দেওয়া হয়। তাঁর মধ্যে কামীস এবং পাগড়ী ছিল না।

১১৯১ আবূ নু'মান (রহঃ) আবদুল্লাহ‌ ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যাক্তি আরাফাতে ওয়াকূফ অবস্থায় হঠাৎ তার উট্‌নী থেকে পড়ে যায়। এতে তার ঘার মটকে গেল অথবা রাবী বলেছেন, তাঁর ঘাড় মটকিয়ে দিল। (এতে সে মারা যায়)। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাকে বরই পাতাসহ পানি দিয়ে গোসল করাও এবং দু' কাপড়ে তাঁকে কাফন দাও। তাকে সুগন্ধি লাগাবে না এবং তার মাথা ঢাকবে না। কেননা, কিয়ামতের দিন সে তাল্‌বিয়া১ পাঠ করতে করতে উত্থিত হবে।

১১৯২ কুতাইবা (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যাক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে আরাফাতে ওয়াকূফ (অবস্থান) কালে হঠাৎ তার সাওয়ারী থেকে পড়ে যায়। ফলে তার ঘার মটকে গেল অথবা রাবী বলেন, দ্রুত মৃত্যুমুখে ফেলে দিল। (ফলে তিনি মারা গেলেন)। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাকে বরই পাতাসহ পানি দিয়ে গোসল করাও এবং দু' কাপড়ে তাঁকে কাফন দাও; তাকে সুগন্ধি লাগাবে না এবং তার মাথা আবৃত করবে না। কেননা, আল্লাহ পাক কিয়ামতের দিন তাকে তাল্‌বিয়া পাঠরত অবস্থায় উত্থিত করবেন।

১১৯৩ আবূ নু'মান (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, এক ব্যাক্তির উট তার ঘাড় মটকে দিল। (ফলে সে মারা গেল)। আমরা তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে ছিলাম। সে ছিল ইহ্‌রাম অবস্থায়। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাকে বরই পাতাসহ পানি দিয়ে গোসল করাও এবং দু' কাপড়ে তাকে কাফন দাও। তাকে সুগন্ধি লাগাবে না এবং তার মাথা আবৃত করো না। কেননা, আল্লাহপাক কিয়ামতের দিন তাকে মুলাব্বিদ১ অবস্থায় উঠিয়ে নিবেন। ১ মুলাব্বিদঃ মাথার চুল এলোমেলো না হওয়ার জন্য মোম জাতীয় আঠালো দ্রব্য ব্যবহারকারী, এখানে ইহ্‌রামরত অবস্থায় বুঝান হয়েছে।

১১৯৪ মূসা’দ্দাদ (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যাক্তি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে আরাফাতে অবস্থান করছিল। সে তার সাওয়ারী থেকে পড়ে গেল। (পরবর্তী অংশের বর্ণনায়) আইয়ূব (রহঃ) বলেন, তার ঘাড় মট্‌কে দিল। আর আমর (রহঃ) বলেন, তাকে দ্রুত মৃত্যুমুখে ঠেলে দিল। ফলে সে মারা গেল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে বরই পাতাসহ পানি দিয়ে গোসল দাও এবং দু' কাপড়ে তাকে কাফন দাও। তাকে সুগন্ধি লাগাবে না এবং তার মাথাও আবৃত করবে না। কেননা, তাঁকে কিয়ামতের দিন উত্থিত করা হবে- এ অবস্থায় যে, আইয়ূব (রহঃ) বলেছেন, সে তালবিয়া পাঠ করছে আর আমর (রহঃ) বলেন, সে তালবিয়া পাঠরত।

১১৯৫ মূসা’দ্দাদ (রহঃ) আবদুল্লাহ‌ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ‌ ইবনু উবাই (মুনাফিক সর্দার) এর মৃত্যু হলে তার পুত্র (যিনি সাহাবী ছিলেন) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে এসে বললেন, আপনার জামাটি আমাকে দদান করুন। আমি তা দিয়ে আমার পিতার কাফন পরাতে ইছা করি। আর আপনি তার জানাযা পড়াবেন এবং তার জন্য মাগফিরাত কামনা করবেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জামাটি তাঁকে দিয়ে দিলেন এবং বললেনঃ আমাকে সংবাদ দিও, আমি তার জানাযা আদায় করব। তিনি তাঁকে সংবাদ দিলেন। যখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জানাযা আদায়ের ইচ্ছা করলেন, তখন উমর (রাঃ) তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, আল্লাহ কি আপনাকে মুনাফিকদের জানাযা আদায় করতে নিষেধ করেন নি? তিনি বললেনঃ আমাকে তো দু'টির মধ্যে কোন একটি করার ইখ্‌তিয়ার দেওয়া হয়েছে। (আল্লাহ তা'আলা বলেছেন) আপনি তাদের (মুনাফিকদের) জন্য মাগফিরাত কামনা করুন বা মাগফিরাত কামনা না-ই করুন (একই কথা) আপনি যদি সত্তর বারও তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করেন; কখনো আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন না। কাজেই তিনি তার জানাযা পড়লেন, তারপর নাযিল হলঃ "তাদের কেউ মারা গেলে কখনও আপনি তাদের জানাযা আদায় করবেন না। "

১১৯৬ মালিক ইবনু ইস্‌মায়ীল (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবদুল্লাহ‌ ইবনু উবাইকে দাফন করার পর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার (কবরের) কাছে এলেন এবং তাকে বের করলেন। তারপর তার উপর থুথু দিলেন, আর নিজের জামাটি তাকে পরিয়ে দিলেন।

১১৯৭ আবূ নু'আইম (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে তিন খানি সুতী সাদা সাহুলী (ইয়ামীন) কাপড়ে কাফন দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে কামীস এবং পাগড়ী ছিল না।

১১৯৮ মূসা’দ্দাদ (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে তিনখানা কাপড় দিয়ে কাফন দেওয়া হয়েছে, তাতে কামীস ও পাগড়ী ছিল না। আবূ আবদুল্লাহ‌ (রহঃ) বলেন, আবূ নু'আইম (রহঃ) শব্দটি বলেন নি। আর আবদুল্লাহ ইবনু ওয়ালীদ (রহঃ) থেকে হাদীস বর্ণনায় শব্দটি বলেছেন।

১১৯৯ ইসমায়ীল (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে তিনখানা সাদা সাহুলী কাপড় দিয়ে কাফন দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে কোন কামীস ও পাগড়ী ছিল না।

১২০০ আহমদ ইবনু মুহাম্মদ মাক্কী (রহঃ)সা’দ (রহঃ)- এর পিতা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন আবদুর রহমান ইবনু আওফ (রাঃ)-খাবার দেওয়া হল। তখন তিনি বললেন, মুস্’আব ইবনু উমাইর (রাঃ) শহীদ হন আর তিনি আমার চাইতে শ্রেষ্ঠ, অথচ তাঁর কাফনের জন্যও একখানি চাঁদর ছাড়া কিছুই পাওয়া যায়নি। তাই আমার আশংকা হয়, আমাদের নেক আমলের বিনিময় আমাদের এ পার্থিব জীবনে আগেই দেয়া হল। তারপর তিনি কাঁদতে লাগলেন।

১২০১ মুহাম্মদ ইবনু মুকাতিল (রহঃ) ইবরাহীম (রহঃ)থেকে বর্ণিত, একদা আবদুর রহমান ইবনু আওফ (রাঃ)-কে খাদ্য পরিবেশন করা হল, তখন তিনি সিয়াম পালন করছিলেন। তিনি বললেন, মুস’আব ইবনু উমাইর (রাঃ) শহীদ হন। তিনি ছিলেন, আমার চাইতে শ্রেষ্ঠ। (অথচ) তাঁকে এমন একখানা চাঁদরদিয়ে কাফন দেয়া হল যে, তাঁর মাথা ঢাকলে তাঁর দু’পা বাইরে থাকে আর দু’পা ঢাকলে মাথা বাইরে থাকে। (বর্ণনাকারী বলেন) আমার মনে পড়ে, তিনি আরও বলেছিলেন, হামযা (রাঃ) শহীদ হন। তিনিও ছিলেন আমার চাইতে শ্রেষ্ঠ। তারপর আমাদের জন্য পৃথিবীতে অত্যধিক প্রাচুর্য দেওয়া হয়েছে। আশংকা হয় যে, আমাদের নেক আমল গুলো (এর বিনিময়) আমাদের আগেই দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারপর তিনি কাঁদতে লাগলেন, এমন কি খাদ্যও পরিহার করলেন।

১২০২ আমর ইবনু হাফস ইবনু গিয়াস (রহঃ) খাব্বাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সংগে মদিনা হিজরত করেছিলাম, এতে আল্লাহর সন্তুষ্টি চেয়েছিলাম। আমাদের প্রতিদান আল্লাহর দরবারে নির্ধারিত হয়ে আছে। তারপর আমাদের মধ্যে অনেকে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু তারা তাদের বিনিময়ের কিছুই ভোগ করে যাননি। তাঁদেরই একজন মুস’আব ইবনু উমাইর (রাঃ) আর আমাদের মধ্যে অনেক এমনও রয়েছেন যাদের অবদানের ফল পরিপক্ক হয়েছে। আর তাঁরা তা ভোগ করছেন। মুস’আব (রাঃ) উহুদের দিন শহীদ হলেন। আমরা তাকে কাফন দেওয়ার জন্য এমন একখানি চাঁদর ব্যতীত আর কিছুই পেলাম না; যা দিয়ে তাঁর মাথা ঢাকলে তাঁর দু’পা বাইরে থাকে আর তাঁর দু’পা ঢেকে দিলে তাঁর মাথা বাইরে থাকে। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মাথা ঢেকে দিতে এবং তাঁর দু’খানা পায়ের উপর ইযখির দিয়ে ‍দিতে আমাদের নির্দেশ দিলেন।

১২০৩ আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা (রহঃ) সাহল (রাঃ) থেকে বর্ণিত, এক মহিলা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে একখানা বুরদাহ (চাঁদর) নিয়ে এলেন যার সাথে ঝালর যুক্ত ছিল। সাহল (রহঃ) বললেন, তোমরা জানো, বুরদাহ কি? তারা বলল, চাঁদর। সাহল (রাঃ) বললেন, ঠিকই। মহিলা বললেন, চাঁদরখানি আমি নিজ হাতে বুনেছি এবং তা আপনার পরিধানের জন্য নিয়ে এসেছি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা গ্রহণ করলেন এবং তাঁর চাঁদরের প্রয়োজনও ছিল। তারপর তিনি তাই যার রূপে পরিধান করে আমাদের সামনে তাশরীফ আনেন। তখন জনৈক ব্যাক্তি তার সৌন্দর্য বর্ণনা করে বললেন, বাহ! এ যে কত সুন্দর। আমাকে তা পড়ার জন্য দান করুন। সাহাবীগণ বললেন, তুমি ভাল করনি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা তাঁর প্রয়োজনে পরেছেন; তবুও তুমি তা চেয়ে বসলে। অথচ তুমি জানো যে, তিনি কাউকে বিমুখ করেন না। ঐ ব্যাক্তি বলল, আল্লাহর কসম! আমি তা পাবার উদ্দেশ্যে চাইনি। আমার চাওয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য যেন তা আমার কাফন হয়। সাহল (রাঃ) বলেন, শেষ পর্যন্ত তা তাঁর কাফনই হয়েছিল।

১২০৪ কাবীসা ইবনু উকবা (রহঃ) উম্মে আতিয়্যাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জানাযার অনুগমণ করতে আমাদের নিষেধ করা হয়েছে, তবে আমাদের উপর কড়াকড়ি করা হয়নি।

১২০৫ মূসা’দ্দাদ (রহঃ) মুহাম্মদ ইবনু সীরীন (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উম্মে আতিয়্যাহ্ (রাঃ)- এর এক পুত্রের ইন্তেকাল হল। তৃতীয় দিনে তিনি হলুদ বর্ণের সুগন্ধি আনিয়ে ব্যবহার করলেন, আর বললেন, স্বামী ব্যতীত অন্যকারো জন্য তিন দিনের বেশী শোক করতে আমাদের নিষেধ করা হয়েছে।

১২০৬ হুমাইদী (রহঃ) যায়নাব বিন্‌ত আবূ সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন শাম (সিরিয়া) থেকে আবূ সুফিয়ান (রাঃ)-এর মৃত্যু সংবাদ পৌঁছাল, তার তৃতীয় দিন উম্মে হাবীবা (রাঃ) হলুদ বর্ণের সুগন্ধি আনলেন এবং তাঁর উভয় গাল ও বাহুতে মাখলেন। তারপর বললেন, অবশ্য আমার এর কোন প্রয়োজন ছিলনা, যদি আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে একথা বলতে না শোনতাম যে স্ত্রী লোক আল্লাহ্ এবং কিয়ামতের দিনের প্রতি ঈমান রাখে তার পক্ষে স্বামী ব্যতীত অন্য কোন মৃত ব্যাক্তির জন্য তিন দিনের বেশী শোক পালন করা হালাল নয়। অবশ্য স্বামীর জন্য সে চার মাস দশ দিন শোক পালন করবে।

১২০৭ ইসমায়ীল (রহঃ) যায়নাব বিন্‌ত আবূ সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - এর সহধর্মিণী উম্মে হাবীবা (রাঃ)-এর ভাইয়ের মৃত্যু হলে আমি তাঁর কাছে গেলাম। তখন তিনি কিছু সুগন্ধি আনিয়ে তা ব্যবহার করলেন। এরপর বললেন, সুগন্ধি ব্যবহারে আমার কোন প্রয়োজন নেই, তবু যেহেতু আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - কে বলতে শুনেছি, যে ব্যাক্তি আল্লাহ্ এবং কিয়ামতের দিনের প্রতি ঈমান রাখে এমন কোন স্ত্রী লোকের পক্ষে কোন মৃত ব্যাক্তির জন্য তিন দিনের বেশী শোক পালন করা জায়িয নয়। তবে স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন (পালনকরবে)।

১২০৮ আদম (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মহিলার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যিনি কবরের পাশে কাঁদছিলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি আল্লা্হকে ভয় কর এবং সবর কর। মহিলাটি বললেন, আমার কাছ থেকে চলে যান। আপনার উপর তো আমার মত মুসিবত আসেনি। তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে চিনতে পারেননি। পরে তাকে বলা হল, তিনি তো নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম । তখন তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর দুয়ারে হাযির হলেন, তাঁর কাছে কোন পাহারাদার পেলেননা। তিনি আরয করলেন, আমি আপনাকে চিনতে পারিনি। তিনি বললেন : সবর তো বিপদের প্রথম অবস্থাতেই।

১২০৯ আবদান ও মুহাম্মদ (রহঃ) উসামা ইবনু যায়িদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কন্যা (যায়নাব) তাঁর খিদমতে লোক পাঠালেন যে, আমার এক পুত্র মুমূর্ষ অবস্থায় রয়েছে, তাই আপনি আমাদের এখানে আসুন। তিনি বলে পাঠালেন, (তাকে)সালাম দিবে এবং বলবে : আল্লাহরই অধিকারে যাকিছু তিনি নিয়ে যান আর তাঁরই অধিকারে যাকিছু তিনি দান করেন। তাঁর কাছে সব কিছুরই একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। কাজেই সে যেন সবর করে এবং সাওয়াবের আশায় থাকে। তখন তিনি তাঁর কাছে কসম দিয়ে পাঠালেন, তিনি যেন অবশ্যই আসেন। তখন তিনি দাঁড়ালেন এবং তাঁর সাথে ছিলেন সা’দ ইবনু উবাদা, মু’আয ইবনু জাবাল, উবাই ইবনু কা’ব, যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ) এবং আরও কয়েক জন। তখন শিশুটিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে তুলে দেওয়া হল। তখন তার জানো ছঠফট করছিল। রাবী বলেন, আমার ধারনা যে, তিনি এ বলে ছিলেন, যেন তার শ্বাস মশকের মত (আওয়াজ হচ্ছিল)। আর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দু’ চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছিল। সা’দ (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! একি? তিনি বললেন : এ হচ্ছে রহমত, যা আল্লাহ পাক তাঁর বান্দার অন্তরে আমানত রেখেছেন। আর আল্লাহ পাক তো তাঁর দয়ালু বান্দাদের প্রতই দয়া করেন।

১২১০ আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এক কন্যা (উম্মে কুলসুম (রাঃ)-এর জানাযায় উপস্থিত হলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের পাশে বসে ছিলেন। আনাস (রাঃ) বলেন, তখন আমি তাঁর চোখ থেকে পানি ঝরতে দেখলাম। রাবী বলেন, রসূলুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের মধ্যে কি এমন কেউ আছে, যে আজ রাতে স্ত্রী মিলন করেনি? আবূ তালহা (রাঃ) বললেন, আমি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাহলে তুমি (কবরে) অবতরণ কর। রাবী বলেন, তখন তিনি (আবূ তালহা (রাঃ) তাঁর কবরে অবতরণ করলেন।

১২১১ আবদান (রহঃ) আবদুল্লাহ‌ ইবনু উবাঈদুল্লাহ্ ইবনু আবূ মুলাইকা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মক্কায় উসমান (রাঃ)-এর এক কন্যার ওফাত হল। আমরা সেখানে (জানাযায়) শরীক হওয়ার জন্য গেলাম। ইবনু উমর এবং ইবনু আব্বাস (রাঃ) ও সেখানে হাযির হলেন। আমি তা্ঁদের দু’জনের মাঝে বসাছিলাম, অথবা তিনি বলেছেন, আমি তাঁদের এক জনের পাশে গিয়ে বসলাম, পরে অন্য জন এসে আমার পাশে বসলেন। (কান্নার আওয়াজ শুনে) ইবনু উমর (রাঃ) আমর ইবনু উসমানকে বললেন, তুমি কেন কাঁদতে নিষেধ করছনা? কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: মৃত ব্যাক্তিকে তার পরিজনদের কান্নার কারণে আযাব দেওয়া হয়। তখন ইবনু আব্বাস (রাঃ) বললেন, উমর (রাঃ) ও এরকম কিছু বলতেন। এরপর ইবনু আব্ব্স (রাঃ) বর্ণনা করলেন, উমর (রাঃ)-এর সাথে মক্কা থেকে ফিরছিলাম। আমরা বায়দা (নামক স্থানে) পৌঁছলে উমর (রাঃ) বাবলা গাছের ছায়ায় একটি কাফেলা দেখতে পেয়ে আমাকে বললেন, গিয়ে দেখোতো এ কাফেলা কার? ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমি গিয়ে দেখলাম সেখানে সুহাইব (রাঃ) রয়েছেন। আমি তাকে তা জানালাম। তিনি বললেন, তাকে আমার কাছে ডেকে নিয়ে আস। আমি সুহাইব (রাঃ)-এর নিকটে আবার গেলাম এবং বললাম, চলুন, আমীরুল মু’মিনীনের সংগে সাক্ষাত করুন। এরপর যখন উমর (রাঃ) (ঘাতকের আঘাতে) আহত হলেন, তখন সুহাইব (রাঃ) তাঁর কাছে এসে এ বলে কাঁদতে লাগলেন, হায় আমার ভাই! হায় আমার বন্ধু! এতে উমর (রাঃ) তাকে বললেন, তুমি আমার জন্য কাঁদছো? অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: মৃত ব্যাক্তির জন্য তার আপন জনের কোন কোন কান্নার কারণে অবশ্যই তাকে আযাব দেওয়া হয়। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, উমর (রাঃ)-এর ওফাতের পর আয়িশা (রাঃ)-এর কাছে আমি উমর (রাঃ)-এর এ উক্তি উল্লেখ করলাম। তিনি বললেন, আল্লাহ উমর (রাঃ)-কে রহম করুন। আল্লাহর কসম! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ল্লাহ্ একথা বলেননি যে, আল্লাহ ঈমানদার(মৃত) ব্যাক্তিকে, তার জন্য তার পরিজনের কান্নার কারণে আযাব দিবেন। তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ল্লাহ্ বলেছেন: আল্লাহ তা’আলা কাফিরদের আযাব বাড়িয়ে দেন, তার জন্য তার পরিজনের কান্নার কারণে। এরপর আয়িশা (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কুরআনই তোমাদের জন্য যথেষ্ট (ইরশাদ হয়েছে) : “বোঝা বহনকারী কোন ব্যাক্তি অপরের বোঝা বহন করবেনা”। তখন ইবনু আব্বাস (রাঃ) বললেন, আল্লাহই(বান্দাকে) হাসান এবং কাঁধান। রাবী ইবনু আবূ মুলাইকা (রহঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! (একথা শুনে) ইবনু উমর (রাঃ) কোন মন্তব্য করলেন না।

১২১২ আবদুল্লাহ‌ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সহধর্মিণী আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ল্লাহ্ এক ইয়াহূদী মেয়ে লোকের (কবরের) পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যার পরিবারের লোকেরা তার জন্য কান্নাকাটি করছিল। তখন তিনি বললেন : তারা তো তার জন্য কান্নাকাটি করছে। অথচ তাকে কবরে আযাব দেওয়া হচ্ছে।

১২১৩ ইসমায়ল ইবনু খলীল (রহঃ) আবূ বুরদার পিতা (আবূ মূসা আশ’আরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন উমর (রাঃ) আহত হলেন, তখন সুহাইব (রাঃ) হায়! আমার ভাই! বলতে লাগলেন। উমর (রাঃ) বললেন, তুমি কি জানোনা যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: জীবিতদের কান্নার কারণে অবশ্যই মৃতদের আযাব দেওয়া হয়?

১২১৪ আবূ নু’আইম (রহঃ) মুগীরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি যে, আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করা অন্য কারো প্রতি মিথ্যা আরোপ করার মত নয়। যে ব্যাক্তি আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করে, সে যেন অবশ্যই তার ঠিকানা জাহান্নামে করে নেয়। (মুগীরা (রাঃ) আরও বলেছেন,)আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে আরও বলতে শুনেছি, যে (মৃত) ব্যাক্তির জন্য বিলাপ করা হয়, তাকে বিলাপকৃত বিষয়ের উপর আযাব দেওয়া হবে।

১২১৫ আবদান (রহঃ) উমর (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মৃত ব্যাক্তিকে তার জন্য বিলাপের বিষয়ের উপর কবরে আযাব দেওয়া হয়। আবদুল আ’লা (রহঃ) কাতাদা (রহঃ) থেকে বর্ণনায় আবদান (রহঃ)-এর অনুসরণ করেছেন। আদম (রহঃ) শু’বা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, মৃত ব্যাক্তিকে তার জন্য জীবিতদের কান্নার কারণে আযাব দেওয়া হয়।

১২১৬ আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ‌ (রাঃ) থেকেবর্ণিত, তিনি বলেন, উহু‍দের দিন আমার পিতাকে অংগ প্রত্যংগ কর্তিত অবস্থায় নিয়ে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সামনে রাখা হল। তখন একখানি কাপড় দিয়ে তাকে ঢেকে রাখা হয়েছিল। আমি তাঁর উপর থেকে আবরণ উন্মোচন করতে আসলে, আমার কাওমের লোকরা আমাকে নিষেধ করল। পুনরায় আমি আবরণ উন্মুক্ত করতে থাকলে আমার কাওমের লোকেরা (আবার) আমাকে নিষেধ করল। পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নির্দেশে তাকে উঠিয়ে নেওয়া হল। তখন তিনি এক রোদন কারিনীর আওয়াজ শুনে জিজ্ঞাসা করলেন, একে? লোকেরা বলল, আমরের মেয়ে অথবা (তারা বলল,)আমরের বোন। তিনি বললেন, কাঁধো কেন? অথবা বলেছেন, কেদোঁ না। কেননা, তাকে উঠিয়ে নেওয়া পর্যন্ত ফিরিশ্‌তাগণ তাদের পাখা বিস্তার করে তাকে ছায়া দিয়ে রেখে ছিলেন।

১২১৭ আবূ নু’আইম (রহঃ) আবদুল্লাহ‌ ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যারা (মৃত ব্যাক্তির জন্য শোক প্রকাশে) গাল চাপড়ায়, জামার বুক ছিড়েঁ ফেলে এবং জাহিলীয়াত যুগের মত চীৎকার দেয়, তারা আমাদের তরীকাভূক্ত নয়।

১২১৮ আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ)সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বিদায় হাজ্জে (হজ্জ) একটি কঠিন রোগে আমি আক্রান্ত হলে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য আসতেন। একদিন আমি তাঁর কাছে আরয করলাম, আমার রোগ চরমে পৌছেঁছে আর আমি সম্পদশালী। একটি মাত্র কন্যা ছাড়া কেউ আমার ওয়ারিস নেই। তবে আমি কি আমার সম্পদের দু’ তৃতীয়াংশ সাদাকা করতে পারি? তিনি বললেন, না। আমি আবার আরয করলাম, তা হলে অর্ধেক। তিনি বললেন, না। তারপর তিনি বললেন, এক তৃতীয়াংশ আর এক তৃতীয়াংশও বিরাট পরিমাণ অথবা অধিক। তোমার ওয়ারিসদের অভাব মুক্ত রেখে যাওয়া, তাদের অভাব গ্রস্ত রেখে যাওয়া মানুষের কাছে হাত পাতার চাইতে উত্তম। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য তুমি যেকোন ব্যয় করনা কেন, তোমাকে তার বিনিময় দেওয়া হবে। এমনকি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে দিবে (তারও প্রতিদান পাবে) আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! (আফসোস) আমি আমার সাথীদের থেকে পিছনে থেকে যাব? তিনি বললেন, তুমি যদি পিছনে থেকে নেক আমল করতে থাক, তাহলে তাতে তোমার মর্যাদাও উন্নতি বৃদ্দই পেতে থাকবে। তাছাড়া, সম্ভবত, তুমি পিছনে (থেকে যাবে)। যার ফলে তোমার দ্বারা অনেক কাওম উপকার লাভ করবে। আর অন্যরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হে আল্লাহ! আমার সাহাবীগণের হিজরত বলবৎ রাখুন। পশ্চাতে ফিরিয়ে দিবেন না। কিন্তু আফসোস! সা’দ ইবনু খাওলার জন্য (এ বলে) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জন্য শোক প্রকাশ করছিলেন, যেহেতু মক্কায় তাঁর ইন্‌তিকাল হয়েছিল।

১২১৯ মুহাম্মদ ইবনু বাশ্‌শার (রহঃ) আবদুল্লাহ‌ ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন : যারা শোকে গালে চাপড়ায়, জামার বুক ছিড়েঁ ফেলে ও জাহিলীয়াত যুগের মত চিৎকার দেয়, তারা আমাদের তরীকাভুক্ত নয়।

১২২০ উমর ইবনু হাফ্‌স (রহঃ) আবদুল্লাহ‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: যারা (শোকে) গালে চাপড়ায়, জামার বুক ছিড়েঁ ফেলে ও জাহিলী যুগের মত চিৎকার দেয় তারা আমাদের তরীকাভূক্ত নয়।

১২২১ মুহাম্মদ্ ইবনু মূসান্না (রহঃ)আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন (মুতা-এর যুদ্ধ ক্ষেত্রে থেকে) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমতে (যায়িদ) ইবনু হারিসা, জাফর ও ইবনু রাওয়াহা (রাঃ)-এর শাহাদাতের সংবাদ পৌঁছল, তখন তিনি (এমনভাবে) বসে পড়লেন যে, তাঁর মধ্যে দু:খের চিহ্ন ফুটে উঠেছিল। আমি (আয়িশা (রাঃ) দরওয়াযার ফাঁক দিয়ে তা দেখছিলাম। এক ব্যাক্তি সেখানে উপস্থিত হয়ে জাফর (রাঃ)-এর পরিবারের মহিলাদের কন্নাকাটির কথা উল্লেখ করলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ ব্যাক্তিকে নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন তাদেঁরকে (কাঁদতে) নিষেধ করেন, লোকটি চলে গেলো এবং দ্বিতীয়বার এসে (বলল) তারা তাঁর কথা মানেনি। তিনি ইরশাদ করলেন : তাদেঁরকে নিষেধ করো। ঐ ব্যাক্তি তৃতীয়বার এসে বললেন, আল্লাহর কসম! ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তাঁরা আমাদের হার মানিয়েছে। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমার মনে হয়, তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (বিরক্তির সাথে) বললেনঃ তাহলে তাদের মুখে মাটি নিক্ষেপ কর। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, আল্লাহ তোমার নাকে ধূলি মিলিয়ে দেন। ১ তুমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশ পালন করতে পারনি। অথচ তুমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বিরক্ত করতেও কসূর করনি।

১২২২ আমর ইবনু আলী (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,)বীর-ই-মাউনার ঘটনায়) ক্বারী (সাহাবীগণের) শাহাদতের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (ফজরের সালাত (নামায/নামাজ)) এক মাস যাবত কুনুত-ই-নাযালা২ পড়েছিলেন। (রাবী বলেন) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে আমি আর কখনো এর চাইতে অধিক শোকাভিভূত হতে দেখিনি।

১২২৩ বিশর ইবনু হাকাম (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) তিনি বলেন, আবূ তালহা (রাঃ)-এর এক পুত্র অসুস্থ হয়ে পড়ল। রাবী বলেন, সে মারা গেল। তখন আবূ তালহা (রাঃ) বাড়ীর বাইরে ছিলেন। তাঁর স্ত্রী যখন দেখলেন যে, ছেলেটি মারা গেছে, তখন তিনি কিছু প্রস্তুতি নিলেন এবং ছেলেটিকে ঘরের এক কোনে রেখে দিলেন। আবূ তালহা (রাঃ) বাড়ীতে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, ছেলের অবস্থা কেমন? স্ত্রী জওয়াব দিলেন, তার আত্মা শান্ত হয়েছে এবং আশা করি সে এখন আরাম পাচ্ছে। আবূ তালহা (রাঃ) ভাবলেন, তাঁর স্ত্রী সত্য বলেছেন। রাবী বলেন, তিনি রতি যাপন করলেন এবং ভোরে গোসল করলেন। তিনি বাইরে যেতে উদ্যত হলে স্ত্রী তাঁকে জানালেন ছেলেটি মারা গেছে। এরপর তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সংগে (ফজরের) সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন। তারপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে তাঁদের রাতের ঘটনা জানালেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন : আশা করা যায়, আল্লাহ পাক তোমাদের এ রাতে বরকত দিবেন। সুফিয়ন (রাঃ) বলেন, এক ব্যাক্তি বর্ণনা করেছেন, আমি (আবূ তালহা (রাঃ) দম্পতির নয়জন সন্তান দেখেছি, তাঁরা সবাই কুরআন সম্পর্কে দক্ষ ছিলেন।

১২২৪ মুহাম্মদ ইবনু বাশ্‌শার (রহঃ) আনাস (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বিপদের প্রথম অবস্থায়েই প্রকৃত সব্‌র।

১২২৫ হাসান ইবনু আবদুল আযীয (রহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সংগে আবূ সায়ফ্‌ কর্মকারের কাছে গেলাম। তিনি ছিলেন (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -তনয়) ইব্‌রাহীম (রাঃ)-এর দুধ সম্পর্কীয় পিতা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তুলে নিয়ে চুমু খেলেন এবং তাকে নাকে-মুখে লাগালেন। এরপর (আর একদিন) আমরা তার (আবূ সায়ফ্‌-এর) বাড়ীতে গেলাম। তখন ইব্‌রাহীম (রাঃ) মুমূর্ষ অবস্থায়। এতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর উভয় চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে লাগল। তখন আবদুর রাহমান ইবনু আওফ (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আর আপনিও?(কাঁদছেন?) তখন তিনি বললেন : ইবনু আওফ, এ হচ্ছে মায়া-মমতা। তারপর পুন:বার অশ্রু ঝরতে থাকল, এরপর তিনি বললেন : অশ্রু প্রবাহিত হয় আর হৃদয় হয় ব্যথিত। তবে আমরা মুখে তাই বলি যা আমাদের রব পছন্দ করেন। আর হে ইব্‌রাহীম! তোমার বিচ্ছেদে আমরা অবশ্যই শোকাভিভূত। মূসা (রহঃ) আনাস (রাঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেন।

১২২৬ আসবাগ (রহঃ) আবদুল্লাহ‌ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সা’দ ইবনুুে উবাদাহ (রাঃ) রোগাক্রান্ত হলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , আবদুর রহমান ইবনু আওফ সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস এবং আবদুল্লাহ‌ ইবনু মাসউদ (রাঃ)-কে সাথে নিয়ে তাকেঁ দেখতে আসলেন। তিনি তাঁর ঘরে প্রবেশ করে তাকেঁ পরিজন-বেষ্টিত দেখতে পেলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, তার কি মৃত্যু হয়েছে! তাঁরা বললেন, না। ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেঁদে ফেললেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কান্না দেখে উপস্থিত লোকেরা কাঁদতে লাগলেন। তখন তিনি ইরশাদ করলেন : শুনে রাখ! নি:সন্দেহে আল্লাহ পাক চোখের পানি ও অন্তরের শোক-ব্যথার কারণে আযাব দিবেন না। তিনি আযাব দিবেন এর কারণে (এ বলে) জিহ্‌বার দিকে উশারা করলেন। অথবা এর কারণেই তিনি রহম করে থাকেন। আর নিশ্চয় মৃত ব্যাক্তির জন্য তার পরিজনের বিলাপের কারণে তাকে আযাব দেওয়া হয়। উমর (রাঃ) এ (ধরণের কান্নার) কারণে লাঠি দ্বারা প্রহার করতেন কংকর নিক্ষেপ করতেন বা মাটি ছুড়ে মারতেন।

১২২৭ মুহাম্মদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ‌ ইব্‌ন হাওশাব (রহঃ)…… আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (মুতার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে) যায়দ ইব্‌ন হারিসা, জা’ফর এবং আবদুল্লাহ‌ ইব্‌ন রাওয়াহা (রাঃ)-এর শাহাদাত লাভের খবর পৌঁছলে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে পড়লেন; তাঁর মধ্যে শোকের চিহ্ন প্রকাশ পেল। আমি (আয়িশা (রাঃ) দরওয়াযার ফাঁক দিয়ে ঝুকেঁ তা দেখছিলাম। তখন এক ব্যাক্ত তাঁর কাছে এসে সম্বোধন করেন, (ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! জা’ফর (রাঃ)-এর (পরিবারের) মহিলগণের কান্নাকাটির কথা উল্লেখ করলেন। তিনি তাদেঁর নিষেধ করার জন্য তাকে আদেশ করলেন। সেই ব্যাক্তি চলে গেলেন। পরে এসে বললেন, আমি তাদের নিষেধ করেছি। তিনি উল্লেখ করলেন যে, তারা তাকেঁ মানেনি। তিনি তাদেঁর নিষেধ করার জন্য দ্বিতীয়বার তাকে নির্দেশ দিলেন। তিনি চলে গেলেন এবং আবার এসে বললেন, আল্লাহ্‌র কসম! অবশ্যই তাঁরা আমাকে (বা বলেছেন আমাদেরাকে) হার মানিয়েছে। আয়িশা (রাঃ) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা হলে তাদেঁর মুখে মাটি ছুড়েঁ মারো। (আয়িশা (রাঃ) বলেন) আমি বললাম, আল্লাহ্‌ তোমার নাক ধুলি মিশ্রিত করুন। আল্লাহ্‌র কসম! তোমাকে যে কাজের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা করতে পারছ না আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বিরক্ত করতেও কসূর করোনি।

১২২৮ আবদুল্লাহ‌ ইবনু আবদুল ওয়াহ্‌হাব (রহঃ)উম্মে আতিয়্যাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাই’আত গ্রহণকালে আমাদের কাছ থেকে এ অংগীকার নিয়েছিলেন যে, আমরা (কোন মৃতের জন্য) বিলাপ করব না। আমাদের মধ্য হতে পাঁচজন মহিলা উম্মু সুলাইম, উম্মুল ‘আলা, আবূ সাব্‌রাহ্‌র কন্যা মু’আযের স্ত্রী, আরো দু’জন মহিলা বা মু’আযের স্ত্রী ও আরেকজন মহিলা ব্যতীত কোন নারীই সে অংগীকার রক্ষা করেনি।

১২২৯ আলী ইবনু আবদুল্লাহ‌ (রহঃ) আমির ইবনু রাবী’আ (রাঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমার জানাযা (যেতে) দেখলে তা তোমাদের পিছনে ফেলে যাওয়া পর্যন্ত দাড়িয়ে থাকবে। হুমায়দী আরও উল্লেখ করেছেন, তা তোমাদের পিছনে ফেলে যাওয়া বা মাটিতে নামিয়ে রাখা পর্যন্ত।

১২৩০ মুসলিম ইবনু ইব্‌রাহীম (রহঃ) আবূ সায়ীদ খুদরী (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমার জানাযা যেতে দেখলে দাড়িয়ে পড়বে, এরপর যারা তার অনুগামী হবে, তারা তা নামিয়ে না রাখা পর্যন্ত বসবে না।

১২৩১ আহ্‌মদ ইবনু ইউনুস (রহঃ)সায়ীদ মাক্‌বুরী (রহঃ)-এর পিতা মারওয়ানের হাত ধরলেন এবং তাঁরা জানাযা নামিয়ে রাখার আগেই বসে পড়লেন। তখন আবূ সায়ীদ (রাঃ) এগিয়ে এসে মাওয়ানের হাত ধরে বললেন, দাড়িয়ে পড়ুন! আল্লাহর কসম! ইনি (আবূ হুরায়রা (রাঃ) তো জানেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ কাজ করতে (জানাযা নামিয়ে রাখার আগে বসতে) নিষেধ করেছেন। তখন আবূ হুরায়রা (রাঃ) বললেন, তিনি ঠিকই বলেছেন।

১২৩২ কুতাইবা আব্‌ন সায়ীদ (রহঃ) আমর ইবনু রাবী’আ (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমাদের কেউ জানাযা যেতে দেখলে যদি সে তার সহযাত্রী না হয়, তরে ততক্ষণ সে দাঁড়িয়ে থাকবে, যতক্ষণ না সে ব্যাক্তি জানাযা পিছনে ফেলে, বা জানাযা তাকে পিছনে ফেলে যায়, অথবা পিছনে ফেলে যাওয়ার পূর্বে তা (মাটিতে) নামিয়ে রাখা হয়।

১২৩৩ মু’আয ইবনু ফাযালা (রাঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদের পাশ ‍দিয়ে একটি জানাযা যাচ্ছিল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা দেখে দাঁড়িয়ে গেলেন। আমরাও দঁড়িয়ে পড়লাম এবং আরয করলাম, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‌! এ তো এক ইয়াহূদীর জানাযা। তিনি বললেনঃ তোমরা যে কোন জানাযা দেখলে দাঁড়িয়ে পড়বে।

১২৩৪ আদম (রহঃ) আবদুর রাহমান ইবনু আবূ লায়লা (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাহ্‌ল ইবনু হুনাইফ ও কায়স ইবনু সা’দ (রাঃ) কাদেসিয়াতে বসাছিলেন, তখন লোকেরা তাঁদের সামনে দিয়ে একটি জানাযা নিয়ে যাচ্ছিল। (তা দেখে) তাঁরা দাঁড়িয়ে গেলেন। তখন তাঁদের বলা হল, এটাতো এ দেশীয় জিম্মী ব্যাক্তির (অমুসলিম সংখ্যালঘু)-এর জানাযা। তখন তাঁরা বললেন, (একবার) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে দিয়ে একটি জানাযা যাচ্ছিল। তখন তিনি দাঁড়িয়ে গেলে তাঁকে বলা হল, এটা তো একইয়াহূদীর জানাযা। তিনি এরশাদ করলেন: সে কি মানুষ নয়? আবূ হামযা (রহঃ) ইবনু আবূ লায়লা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সাহ্‌ল এবং কায়স (রাঃ)-এর সাথে ছিলাম। তখন তাঁরা দু’জন বললেন, আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে ছিলাম। যাকারিয়া (রহঃ) সূত্রে ইবনু আবূ লায়লা (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন, আবূ মাসউদ ও কায়স (রাঃ) জানাযা যেতে দেখলে দাঁড়িয়ে যেতেন।

১২৩৫ আবদুল আযীয ইবনু আবদুল্লাহ‌ (রহঃ) আবূ সায়ীদ খুদ্‌রী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যখন জানাযা খাটে রাখা হয় এবং পুরুষরা তা কাঁধে বহন করে নেয়, তখন সে নেক্‌কার হলে বলতে থাকে, আমাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাও। আর নেক্‌কার না হলে সে বলতে থাকে, হায় আফসূস! তোমরা এটাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? মানব জাতি ব্যতীত সবাই তার চিৎকার শুনতে পায়। মানুষেরা তা শুনলে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলত।

১২৩৬ আলী আব্‌ন আবদুল্লাহ‌ (রাঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমরা জানাযা নিয়ে দ্রুতগতিতে চলবে। কেননা, সে যদি পূণ্যবান হয়, তবে এটা উত্তম, যার দিকে তোমরা তাকে এগিয়ে দিচ্ছ আর যদি সে অন্য কিছু হয়, তবে সে একটি অকল্যাণ, যাকে তোমরা তোমাদের ঘাড় থেকে দ্রুত নামিয়ে ফেলছ।

১২৩৭ আবদুল্লাহ‌ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আবূ সায়ীদ খুদ্‌রী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন : যখন জানাযা (খাটিয়ায়) রাখা হয় এবং পুরুষ লোকেরা তা তাদের কাঁধে তুলে নেয়, সে নেক্‌কার হলে, তখন বলতে থাকে আমাকে সামনে এগিয়ে দাও। আর নেক্‌কার না হলে সে আপন পরিজনকে বলতে থাকে, হায় আফসোস! এটা নিয়ে তোমরা কোথায় যাচ্ছ? মানুষ জাতি ব্যতীত সবাই তার চিৎকার শুনতে পায়। মানুষ যদি তা শুনতে পেত তবে অবশ্য সজ্ঞা হারিয়ে ফেলত।

১২৩৮ মূসা’দ্দাদ (রহঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আবিসিনিয়ার বাদশাহ্‌) নাজাশীর জানাযা আদায় করেন। আমি দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় কাতারে ছিলাম।

১২৩৯ মূসা’দ্দাদ (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীগণকে নাজাশীর মৃত্যু সংবাদ শোনালেন, পরে তিনি সামনে অগ্রসর হলেন এবং সাহাবীগণ তাঁর পিছনে কাতারবদ্ধ হলে তিনি চার তাকবীরে (জানাযার সালাত (নামায/নামাজ)) আদায় করলেন।

১২৪০ মুসলিম (রহঃ) শা’বী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এমন এক সাহাবী যিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে উপস্থিত ছিলেন, তিনি আমাকে খবর দিয়েছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি পৃথক কবরের কাছে গমণ করলেন এবং লোকদের কাতারবদ্ধ করে চার তাকবীরের সংগে (জানাযার সালাত (নামায/নামাজ)) আদায় করলেন। (শায়বানী (রহঃ) বলেন) আমি শা’বী (রহঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, এ হাদীস আপনাকে কে বর্ণনা করেছেন?তিনি বললেন, ইবনু আব্বাস (রাঃ)।

১২৪১ ইব্‌রাহীম ইবনু মূসা (রহঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : আজ হাবাশা দেশের (আবিসিনিয়ার) একজন নেক্‌কার লোকের ওফাত হযেছে, তোমরা এসো তাঁর জন্য (জানাযার) সালাত (নামায/নামাজ) আদায় কর। রাবী বলেন, আমরা তখন কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (জানাযার) সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন, আমরা ছিলাম কয়েক কাতার। আবূ যুবাইর (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, জাবির (রাঃ) বলেছেন, আমি দ্বিতীয় কাতারে ছিলাম।

১২৪২ মূসা ইবনু ইসমায়ীল (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক (ব্যাক্তির), কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যাকে রাতের বেলা দাফন করা হয়েছিল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, একে কখন দাফন করা হল? সাহাবীগণ বললেন, গত রাতে। তিনি বললেন : তোমরা আমাকে অবহিত করলে না কেন? তাঁরা বললেন, আমরা তাকে রাতের আধারে দাফন করেছিলাম, তাই আপনাকে জাগানো পছন্দ করিনি। তখন তিনি (সেখানে) দাড়িয়ে গেলেন। আমরাও তাঁর পিছনে কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালাম। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমিও তাদের মধ্যে ছিলাম। তিনি তাঁর (জানাযার) সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন।

১২৪৩ সুলাইমান ইবনু হারব (রাঃ) শা’বী (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এমন এক সাহাবী আমাকে খবর দিয়েছেন, যিনি তোমাদের নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সংগে একটি পৃথক কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম )ইমামতি করলেন, আমরা তাঁর পিছনে কাতার করলাম এবং সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলাম। (শায়বানী (রহঃ) বলেন,)আমরা (শা’বীকে) জিজ্ঞাসা করলাম, হে আবূ আম্‌র! আপনাকে এ হাদীস কে বর্ণনা করেছেন? তিনি বললেন, ইবনু আব্বাস (রাঃ)।

১২৪৪ আবূ নু’মান (রহঃ)নাফি’ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইবনু উমর (রাঃ)- এর নিকট বর্ণনা করা হল যে, আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলে থাকেন, যিনি জানাযার অনুগমণ করবেন তিনি এক কীরাত (পরিমাণ) সাওয়াবের অধিকারী হবেন। তিনি বললেন, আবূ হুরায়রা (রাঃ) আমাদের বেশ বেশী হাদীস শোনান। তবে আয়িশা (রাঃ) এ বিষয়ে আবূ হুরায়রা (রাঃ)-কে সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে এ হাদীস বলতে শুনেছি। ইবনু উমর (রাঃ) বরলেন, তা হলে তো আমরা অনেক কীরাত (সাওয়াব) হারিয়ে ফেলেছি। “ফার্‌রাততু” এর অর্থ আল্লাহর আদেশ আমি খুইয়ে ফেলেছি।

১২৪৫ আবদুল্লাহ‌ ইবনু মাসলামা, আবদুল্লাহ‌ ইবনু মুহাম্মদ ও আহ্‌মাদ ইবনু শাবীব ইবনু সায়ীদ (রাঃ)… আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে ব্যাক্তি মৃতের জন্য সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করা পর্যন্ত জানাযায় উপস্থিত থাকবে, তার জন্য এক কীরাত (সাওয়াব), আর যে ব্যাক্তি মৃতের দাফন হয়ে যাওয়া পর্যন্ত উপস্থিত থাকবে তার জন্য দু’ কীরাত (সাওয়াব)। জিজ্ঞাসা করা হল দু’ কীরাত কি? তিনি বললেন, দু’ টি বিশাল পর্বত সমতুল্য।

১২৪৬ ইয়াকূব ইবনু ইব্‌রাহীম (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি কবরের কাছে তাশরীফ আনেন। সাহাবাগণ বললেন, এক গতরাতে দাফন করা হয়েছে। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, তখন আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পিছনে কাতার করে দাড়ালাম। এরপর তিনি তার জানাযার সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন।

১২৪৭ ইয়াহ্‌ইয়া ইবনু বুকাইর (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আবিসিনিয়ার বাদশাহ্‌) নাজাশীর মৃত্যুর দিনই আমাদের তার মৃত্যু সংবাদ জানোান এবং ইরশাদ করেন : তোমরা তোমাদের ভাই-এর(নাজাশীর) জন্য ইস্তিগফার কর। আর ইবনু শিহাব সায়ীদ ইবনু মূসা য়্যাব (রহঃ) সূত্রে আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিয়ে মূসা ল্লায় কাতার করলেন, এরপর চার তাক্‌বীর আদায় করেন।

১২৪৮ ইব্‌রাহীম ইবনু মুনযির (রহঃ) আবদুল্লাহ‌ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নব এর কাছে (খায়বারের) ইয়াহুদীরা তাদের এক পুরুষ ও এক স্ত্রীলোককে হাযির করল, যারা যিনা করেছিল। তখন তিনি তাদের উভয়কে (রজম করার) নির্দেশ দেন। মসজিদের পাশে জানাযার স্থানের কাছে তাদের দু’ জনকে রজম(পাথর নিক্ষেপ) করা হল।

১২৪৯ উবাঈদুল্লাহ্‌ ইবনু মূসা (রাঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে রোগে ইন্‌তিকাল করেছিলেন, সে রোগাবস্থায় তিনি বলেছিলেন : ইয়াহূদী ও নাসারা সম্প্রদায়ের প্রতি আল্লাহর লা’নত, তারা তাদের নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে। আয়িশা (রাঃ) বলেন, সে আশংকা না থাকলে তাঁর (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর) কবরকে উম্মুক্ত রাখা হত, কিন্তু আমার আশংকা যে, (খুলে দেয়া হলে) একে মসজিদে পরিণত করা হবে।

১২৫০ মূসা’দ্দাদ (রহঃ) সামুরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পিছনে আমি এমন এক মহিলার জানাযার সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেছিলাম, যে নিফাস অবস্থায় মারা গিয়েছিল। তিনি তার মাঝ বরাবর দাড়িয়ে ছিলেন।

১২৫১ ইমরান ইবনু মায়সারা (রহঃ) সামুরা ইবনু জুন্‌দার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পিছনে আমি এমন এক মহিলার জানাযার সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেছিলাম, যে নিফাস অবস্থায় মারা গিয়েছিল। তিনি মাঝ বরাবর দাড়িয়ে ছিলেন।

১২৫২ আবদুল্লাহ‌ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আবিসিনিয়ার বাদশা) নাজাশীর মৃত্যুর দিন তাঁর মৃত্যু সংবাদ জানালেন এবং সাহাবীগণকে নিয়ে জানাযার সালাত (নামায/নামাজ)-এর স্থানে চার তাকবীর আদায় করলেন।

১২৫৩ - মুহাম্মদ ইবনু সিনান (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আবসিনিয়ার বাদশাহ) আসহামা-নাজাশীর জানাজা সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন, তাতে তিনি চার তকবীর বললেন। ইয়াজীদ ইবনু হারুন ও আবদুস সামাদ (রহঃ) সালীম (রহঃ) থেকে 'আসহামা' শব্দ বর্ণনা করেন।

১২৫৪ মুহাম্মদ ইবনু বাশ্‌শার ও মুহাম্মদ ইবনু কাসীর (রহঃ) তালহা ইবনু আবদুল্লাহ‌ ইবনু আউফ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি (আবদুল্লাহ) ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর পিছনে জানাযার সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলাম। তাতে তিনি সূরা ফাতিহা তিলওয়াত করলেন এবং (সালাত (নামায/নামাজ) শেষে) বললেন, (আমি এমন করলাম) যাতে সবাই জানতে পারে যে, তা (সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করা) জানাযার সালাত (নামায/নামাজ) সুন্নাত (একটি পদ্ধতি)।

১২৫৫ হাজ্জাজ্‌ ইবনু মিনহাল (রহঃ) শা’বী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে এমন এক সাহাবী বর্ণনা করেছেন, যিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সংগে একটি পৃথক কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি তাঁদের ইমামতি করলেন এবং তাঁরা তাঁর পিছনে জানাযার সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন। (রাবী) বলেন) আমি শা’বীকে জিজ্ঞাসা করলাম, হে আবূ আম্‌র! আপনার কাছে এ হাদীস কে বর্ণনা করেছেন? তিনি বললেন, ইবনু আব্বাস (রাঃ)।

১২৫৬ মুহাম্মদ ইবনু ফায্‌ল (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, কালবর্ণের এক পুরুষ বা এক মহিলা মসজিদে ঝাড়ু দিত। সে মারা গেল। কিন্তু নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মৃত্যু সংবাদ জানতে পারেন নি। একদিন তার কথা উল্লেখ করে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এ লোকটির কি হল? সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! সে তো মারা গিয়েছে। তিনি বললেন : তোমরা আমাকে অবহিত করলে না কেন? তাঁরা বললেন, সে ছিল এমন (তার) ঘটনা উল্লেখ করলেন। রাবী বলেন, তাঁরা (যেন) তাকে খাট করে দেখলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : আমাকে তার কবর দেখিয়ে দাও। রাবী বলেন, তখন তিনি তার কবরের কাছে তাশরীফ এনে তার জন্য জানাযার সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন।

১২৫৭ আয়্যাশ ও খলীফা (রহঃ)আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : বান্দাকে যখন তার কবরে রাখা হয় এবং তাকে পিছনে রেখে তার সাথীরা চলে যায় (এতটুকু দূরে যে,)তখনও সে তাদের জুতার শব্দ শুনতে পায়, এমন সময় তার কাছে দু’জন ফিরিশতা এস তাকে বসিয়ে দেন। এরপর তাঁরা প্রশ্ন করেন, এই যে মুহাম্মদ তাঁর সম্পর্কে তুমি কি বলতে? তখন সে বলবে, আমি তো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসূল)। তখন তাঁকে বলা হবে, জাহান্নামে তোমার অবস্থানের জায়গাটি দেখে নাও, যার পরিবর্তে আল্লাহ পাক তোমার জন্য জান্নাতে একটি স্থান নির্ধারিত করেছেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : তখন সে দু’টি স্থান একই সময় দেখতে পাবে। আর যারা কাফির বা মুনাফিক, তারা বলবে, আমি জানিনা। (তবে) অন্য লোকেরা যা বলতো আমিও তাই বলতাম। তখন তাকে বলা হবে, না তুমি নিজে জেনেছ, না তিলাওয়াত করে শিখেছ। এরপর তার দু’ কানের মধ্যবর্তী স্থানে লোহার মুগুর দিয়ে এমন জোরে আঘাত করা হবে, এতে সে চিৎকার করে উঠবে, মানুষ ও জ্বীন ব্যতীত তার আশেপাশের সকলেই তা শুনতে পাবে।

১২৫৮ মাহমূদ (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মালাকুল মাওতকে মূসা (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর কাছে পাঠানো হল। তিনি তাঁর কাছে আসলে, মূসা (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে চপেটাঘাত করলেন। (এতে তাঁর চোখ বেরিয়ে গেল।)তখন মালাকূল মাওত তাঁর প্রতিপালক এর দরবারে ফিরে গিয়ে বলবেন, আমাকে এমন এক বান্দার কাছে পাঠিয়েছেন যে মরতে চায় না। তখন আল্লাহ তাঁর চোখ ফিরিয়ে দিয়ে হুকুম করলেন, আবার গিয়ে তাঁকে বল, তিনি একটি ষাঁড়ের পিঠে তাঁর হাত রাখলেন, তখন তাঁর হাত যতটুকু আবৃত করবে, তার সম্পূর্ণ অংশের প্রতিটি পশমের বিনিময়ে তাঁকে এক বছর করে আয়ু দান করা হবে। মূসা (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ শুনে বললেন, হে আমার রব! তারপর কি হবে? আল্লাহ্ বললেন : তারপর মৃত্যু। মূসা (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তা হলে এখনই আমি প্রস্তুত। তখন তিনি একটি পাথর নিক্ষেপ করলে যতদুর যায় বায়তুল মুকাদ্দাসের ততটুকু নিকটবর্তী স্থানে তাঁকে্ পৌছিয়ে দেওয়ার জন্য আল্লাহ তা’আলার কাছে আরয করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : এখন আমি সেখানে থাকলে অবশ্যই পাথরের পাশে লাল বালুর টিলার নিকটে তাঁর কবর তোমাদের দেখিয়ে দিতাম।

১২৫৯ উসমান ইবনু আবূ শায়রা (রহঃ) ইবনুুে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যাক্তিকে রাত্রিকালে দাফন করার পর তার (জানাযার) সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করার জন্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ (দাফনকৃত ব্যাক্তির কবরের পাশে) গিয়ে দাঁড়ালেন। তখন তিনি লোকটির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলেন এবং বললেন, এ লোকটি কে? তাঁরা জবাব দিলেন, অমুক গত রাতে তাকে দাফন করা হয়েছে। তখন তাঁরা সকলে তার (জানাযার) সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন।

১২৬০ ইসমায়ীল (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর অসুস্থতাকালে তাঁর এক সহধর্মিনী হাবশা দেশে তাঁর দেখা ‘মারিয়া’ নামক একটি গীর্জার কথা আলোচনা করলেন। (উম্মাহাতুল মু’মিনীনের মধ্যে) উম্মে সালামা এবং উম্মে হাবিবা (রাঃ) হাবাশায় গিয়েছিলেন। তারা ঐ গীর্জাটির সৌন্দর্য এবং তাতে রক্ষিত চিত্রসমূহের বিবরণ দিলেন। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মাথা তুলে বললেন : সে সব দেশের লোকেরা তাদের কোন পূণ্যবান ব্যাক্তি মারা গেলে তাঁর সমাধিতে মসজিদ নির্মাণ করত এবং তাতে সে সব চিত্র অংকন করত। তারা হল, আল্লাহর দরবারে নিকৃষ্ট মাখলূক।

১২৬১ মুহাম্মদ ইবনু সিয়ান (রাঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর এক কন্যার দাফনে হাযির ছিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের পাশেই বসেছিলেন। আমি দেখলাম, তাঁর দু’চোখে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি, যে আজ রাতে স্ত্রী মিলনে লিপ্ত হয়নি? আবূ তালহা (রাঃ) বলেন, আমি। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাঁর কবরে নেমে পড়, তখন তিনি তাঁর কবরে নেমে গেলেন এবং তাঁকে দাফন করলেন।

১২৬২ আবদুল্লাহ‌ ইবনু ইউসূফ (রহঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদের শহীদগণের দু’দু’ জনকে একই কাপড়ে (কবরে) একত্র করতেন। এরপর জিজ্ঞাসা করতেন, তাঁদের উভয়ের মধ্যে কে কুরআন সম্পর্কে অধিক জানত? দু’ জনের মধ্যে এক জনের দিকে ইশারা করা হলে তাঁকে কবরে আগে রাখতেন এবং বললেন, আমি কিয়ামতের দিন এদের ব্যাপারে সাক্ষী হব। তিনি রক্তমাখা অবস্থায় তাঁদের দাফন করার নির্দেশ দিলেন, তাঁদের গোসল দেওয়া হয়নি এবং তাঁদের (জানাযার) সালাত (নামায/নামাজ)ও আদায় করা হয়নি।

১২৬৩ আবদুল্লাহ‌ (রহঃ) উক্‌বা ইবনু আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন বের হলেন এবং উহুদে পৌঁছে মৃতের জন্য যেরূপ (জানাযার) সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করা হয় উহুদের শহীদানের জন্য অনুরূপ সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন। এরপর ফিরে এসে মিম্বারে তাশরীফ রেখে বললেন : আমি হবো তোমাদের জন্য অগ্রে প্রেরিত এবং আমি তোমাদের জন্য সাক্ষী। আল্লাহর কসম! এ মুহূর্তে আমি অবশ্যই আমার হাউয (হাউয-ই-কাওসার) দেখছি। আর অবশ্যই আমাকে পৃথিবীর ভান্ডারসমূহের চাবিগুচ্ছ প্রদান করা হয়েছে। অথবা (রাবী বলেছেন) পৃথিবীর চাবিগুচ্ছ আর আল্লাহর কসম! তোমরা আমার পরে শিরক করবে এ আশংকা আমি করি না। তবে তোমাদের ব্যপারে আমার আশংকা যে, তেমরা পার্থিব সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়বে।