Friday, 23 March 2018

রাসূলুল্লাহ (ছা.) এর মুজিজা _গল্পের সাথে হাদিস শিক্ষা

রাসূলুল্লাহ (ছা.) এর মুজিজা _গল্পের সাথে হাদিস শিক্ষা

মুজাহিদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আবূ হুরায়রা (রা.) বলতেন, আল্লাহ্র কসম, যিনি ছাড়া কোন (হক্ব) ইলাহ নেই। আমি ক্ষুধার যন্ত্রণায় উপুড় হয়ে পড়ে থাকতাম। আর কখনও পেটে পাথর বেঁধে রাখতাম। একদা আমি তাঁদের (রাসূলুল্লাহ (ছা.) এবং ছাহাবীদের) রাস্তায় বসেছিলাম, যেখান দিয়ে তারা বের হ’তেন। আবূ বকর (রা.) রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি তাঁকে কুরআনের একটি আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম। আমি এ উদ্দেশ্যেই তা করলাম, যেন তিনি আমাকে কিছু খেতে দিয়ে পরিতৃপ্ত করেন। কিন্তু তিনি চলে গেলেন, কিছুই করলেন না। এরপর ওমর (রা.) আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁকেও সেই একই উদ্দেশ্যে কুরআনের একটি আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম। কিন্তু তিনিও চলে গেলেন, কিছুই করলেন না। অতঃপর আবুল কাসেম [অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (ছা.)] আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, আমাকে দেখে তিনি মুচকি হাসলেন। তিনি আমার চেহারা দেখে মনের কথা বুঝতে পারলেন এবং বললেন, ‘হে আবূ হির (রা.)! আমি বললাম, ‘হে আল্লাহ্র রাসূল (ছা.)! আমি উপস্থিত। তিনি বললেন,‘তুমি আমার সঙ্গে চল’! অতঃপর তিনি চললেন, আমি তাঁর অনুসরণ করলাম। তিনি বাড়ীতে প্রবেশ করলেন। অতঃপর আমি ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলাম। তিনি অনুমতি দিলে আমি প্রবেশ করলাম।

তিনি ঘরে প্রবেশ করে একটি পেয়ালায় কিছু দুধ দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ দুধ কোথা থেকে এসেছে’? বাড়ির লোকজন উত্তর দিল, ‘অমুক পুরুষ অথবা অমুক মহিলা আপনার জন্য হাদিয়াস্বরূপ দিয়েছে’। তিনি বললেন, ‘হে আবূ হুরায়রা (রা.)’! আমি বললাম, ‘আমি হাযির হে আল্লাহ্র রাসূল’! তিনি বললেন, ‘আহলে ছুফ্ফা’র লোকদেরকে গিয়ে এখানে ডেকে আন’। (রাবী বলেন) ‘আহলে ছুফ্ফা’ ছিল ইসলামের মেহমান। তাদের পরিবার-পরিজন, ধন-সম্পদ কিছুই ছিল না। আর এমন কেউ ছিল না, যার উপর ভরসা করা যায়। যখন কোন ছাদাক্বার মাল রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর নিকট আসত, তখন তিনি তাদের জন্য পাঠিয়ে দিতেন। নিজে সেখান থেকে কিছুই গ্রহণ করতেন না। আর যদি কোন হাদিয়া (উপঢৌকন) আসত, তিনি সেখান থেকেও এক অংশ তাদের জন্য পাঠিয়ে দিয়ে এতে তাদেরকে শরীক করতেন এবং নিজে এক অংশ গ্রহণ করতেন।

(আবু হুরায়রা বলেন) রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর আদেশ শুনে আমি হতাশ হয়ে পড়লাম। (মনে মনে) বললাম, এতটুকু দুধ দ্বারা ‘আহলে ছুফ্ফা’র কি হবে? আমিই এ দুধ পানের বেশী হকদার। আমি তা পান করলে আমার শরীরে শক্তি ফিরে পেতাম। যখন তারা এসে গেলেন, তখন তিনি আমাকে আদেশ দিলেন, আমিই যেন তাদেরকে দুধ পান করতে দেই। আর আমার আশা রইল না যে, এ দুধ থেকে আমি কিছু পাব। কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছা.)-এর আদেশ মান্য করা ছাড়া আমার কোন গত্যন্তর ছিল না।

সুতরাং আমি ‘আহলে ছুফ্ফার নিকট গিয়ে তাদেরকে ডেকে আনলাম’। তারা এসে (ঘরে প্রবেশের) অনুমতি চাইলে তিনি তাদেরকে অনুমতি দিলেন। তারা ঘরে এসে নিজ নিজ আসন গ্রহণ করলেন। তিনি বললেন, হে আবূ হুরায়রা! আমি বললাম, আমি হাযির হে আল্লাহ্র রাসূল! রাসূলুল্লাহ (ছা.) আমাকে বললেন, এটি তাদেরকে দাও। আমি (দুধের) পেয়ালা হাতে নিয়ে দিতে শুরু করলাম। এক ব্যক্তির হাতে দিলাম, সে পান করে পরিতৃপ্ত হ’ল এবং আমাকে পেয়ালা ফেরত দিল। অতঃপর আমি অন্য একজনকে দিলাম, সেও তৃপ্তি সহকারে পান করে পেয়ালা ফেরত দিল। তৃতীয় জনকে দিলে সেও তাই করল। এভাবে আমি (সর্বশেষে) রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর নিকট পৌঁছলাম। সবাই পরিতৃপ্ত হ’ল। তিনি পেয়ালা নিলেন এবং আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, ‘হে আবূ হুরায়রা’! আমি বললাম, ‘আমি হাযির হে আল্লাহ্র রাসূল’! তিনি বললেন, ‘এখন আমি আর তুমি বাকী’। আমি বললাম, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন হে আল্লাহ্র রাসূল’। তিনি বললেন, ‘বসে পড় এবং পান কর’। আমি বসে পান করলাম। তিনি (পুনরায়) বললেন, ‘পান কর’। আমি পান করলাম। তিনি একথা বলতেই থাকলেন, অবশেষে আমি বলতে বাধ্য হ’লাম যে, ‘আল্লাহ্র শপথ! যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন, আমার পেটে আর জায়গা নেই’। তিনি বললেন, ‘তাহলে আমাকে দাও’। আমি তাঁকে দিলে তিনি আল্লাহ্র প্রশংসা করলেন এবং বিসমিল্লাহ বলে বাকী দুধ পান করলেন।

গীবতের ভয়াবহতা _গল্পের সাথে হাদিস শিক্ষা

গীবতের ভয়াবহতা _গল্পের সাথে হাদিস শিক্ষা

আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন, আরবরা সফরে গেলে একে অপরের খিদমত করত। আবুবকর ও ওমর (রাঃ)-এর সাথে একজন লোক ছিল যে তাদের খিদমত করত। তারা ঘুমিয়ে পড়লেন। অতঃপর জাগ্রত হলে লক্ষ করলেন যে, সে তাদের জন্য খাবার প্রস্ত্তত করেনি (বরং ঘুমিয়ে আছে)। ফলে একজন তার অপর সাথীকে বললেন, এতো তোমাদের নবী (ছাঃ)-এর ন্যায় ঘুমায়। অন্য বর্ণনায় আছে তোমাদের বাড়িতে ঘুমানোর ন্যায় ঘুমায় (অর্থাৎ অধিক ঘুমায় এমন ব্যক্তি)।

অতঃপর তারা তাকে জাগিয়ে বললেন, তুমি রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট গমন করে তাঁকে বল যে, আবুবকর ও ওমর (রাঃ) আপনাকে সালাম প্রদান করেছেন এবং আপনার নিকট তরকারী চেয়েছেন। রাসূল (ছাঃ) তাকে বললেন, যাও, তাদেরকে আমার সালাম প্রদান করে বলবে যে, তারা তরকারী খেয়ে নিয়েছে। (একথা শুনে) তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট গমন করে বলল, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! আমরা আপনার নিকট তরকারী চাইতে ওকে পাঠালাম। অথচ আপনি তাকে বলেছেন যে তারা তরকারী খেয়েছে। আমরা কি তরকারী খেয়েছি? তিনি (ছাঃ) বললেন, তোমাদের ভাইয়ের গোস্ত দিয়ে। যার হাতে আমার প্রাণ তার কসম করে বলছি, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের উভয়ের দাঁতের মধ্যে তার গোস্ত দেখতে পাচ্ছি। তারা বললেন, আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তিনি (ছাঃ) বললেন, না বরং সেই তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে’ (সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৬০৮)।

আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি নবী করীম (ছাঃ)-কে বললাম, ‘আপনার জন্য ছাফিয়ার এই এই হওয়া যথেষ্ট’। কোন কোন বর্ণনাকারী বলেন, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ছাফিয়া বেঁটে। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘তুমি এমন কথা বললে, যদি তা সমুদ্রের পানিতে মিশানো হয়, তাহ’লে তার স্বাদ পরিবর্তন করে দেবে’।

আয়েশা (রাঃ) বলেন, একদা রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট একটি লোকের পরিহাসমূলক ভঙ্গি করলাম। তিনি বললেন, ‘কোন ব্যক্তির পরিহাসমূলক ভঙ্গি নকল করি আর তার বিনিময়ে এত এত পরিমাণ ধনপ্রাপ্ত হই, এটা আমি আদৌ পসন্দ করি ন’ (আবুদাউদ হা/৪৮৭৭, সনদ ছহীহ)।

কায়স বলেন, আমর ইবনুল আছ (রাঃ) তার কতিপয় সঙ্গী-সাথীসহ ভ্রমণ করছিলেন। তিনি একটি মৃত খচ্চরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, যা ফুলে উঠেছিল। তখন তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! কোন ব্যক্তি যদি পেট পুরেও এটা খায়, তবুও তা কোন মুসলমানের গোশত খাওয়ার চেয়ে উত্তম’ (আদাবুল মুফরাদ হা/৭৩৬, সনদ ছহীহ)।

সৎ লোকের দোয়া_গল্পের সাথে হাদিস শিক্ষা

সৎ লোকের দোয়া_গল্পের সাথে হাদিস শিক্ষা

এ পৃথিবীতে আল্লাহ মানুষকে প্রেরণ করেছেন তাঁর ইবাদত করার জন্য। কিন্তু মানুষ তাদের কর্তব্য ভুলে গিয়ে বিভিন্ন অন্যায় অপকর্মে লিপ্ত হয়। এরূপ মানুষ আল্লাহর নিকট ঘৃনিত এবং জনসমাজেও ধিকৃত। তবে যারা আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলে, তাঁর অনুগত থেকে ইবাদত-বন্দেগী করে, আল্লাহ তাদের ভালবাসেন, তাদের যেকোন দো‘আ কবুল করেন। এ সম্পর্কেই নিম্নের হাদীছ।-
উসায়র ইবনু আমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তাকে ইবনু জাবিরও বলা হয়, তিনি বলেন, ইয়েমেনের বসবাসকারীদের পক্ষ থেকে ওমর (রাঃ)-এর নিকট সাহায্যকারী দল আসলে তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করতেন, তোমাদের মাঝে উয়াইস ইবনু আমির আছে কি? অবশেষে (একদিন) উয়াইস (রাঃ) এসে গেলেন। তাকে তিনি (ওমর) প্রশ্ন করলেন, আপনি কি উয়াইস ইবনু আমির? সে বলল হ্যাঁ। ওমর (রাঃ) আবার বললেন, ‘মুরাদ’ সম্প্রদায়ের উপগোত্র ‘কারনের’ লোক? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আপনার কি কুষ্ঠরোগ হয়েছিল, তা হ’তে সুস্থ হয়েছেন এবং মাত্র এক দিরহাম পরিমাণ স্থান বাকী আছে? তিনি বলেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আপনার মা জীবিত আছে কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি (ওমর) বললেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে আমি বলতে শুনেছি, ‘ইয়ামানের সহযোগী দলের সাথে উয়াইস ইবনু আমির নামক এক লোক তোমাদের নিকট আসবে। সে ‘মুরাদ’ জাতির উপজাতি ‘কারনের’ লোক। তার কুষ্ঠরোগ হবে এবং তা হ’তে সে মুক্তি পাবে, শুধুমাত্র এক দিরহাম পরিমাণ স্থান ছাড়া। তার মা বেঁচে আছে, সে তার মায়ের খুবই অনুগত। সে (আল্লাহর উপর ভরসা করে) কোন কিছুর শপথ করলে তা আল্লাহ তা‘আলা পূরণ করে দেন। তুমি যদি তাকে দিয়ে তোমার গুনাহ মাফের জন্য দো‘আ করাবার সুযোগ পাও তাহ’লে তাই করবে’। ওমর (রাঃ) বলেন, কাজেই আমার অপরাধ ক্ষমার জন্য আপনি দো‘আ করুন। অতএব তিনি (উয়াইস) ওমরের অপরাধের ক্ষমা চেয়ে দো‘আ করলেন। ওমর (রাঃ) তাকে বললেন, আপনি কোথায় যেতে চান? তিনি বললেন, কূফা (যাবার ইচ্ছা আছে)। তিনি (ওমর) বলেন, আমি সেখানকার গভর্ণরকে আপনার (সাহায্যের) জন্য লিখে দেই? তিনি বললেন, আমার নিকট গরীব-মিসকীনদের মাঝে বসবাস করাই বেশী পসন্দীয়। পরের বছর কূফার এক নেতৃস্থানীয় লোক হজ্জে এলো। তার সাথে ওমরের দেখা হ’লে তিনি উয়াইস সম্পর্কে তাকে প্রশ্ন করলেন। সে বলল, আমি তাকে এরকম অবস্থায় দেখে এসেছি যে, তার ঘরটা অত্যন্ত জীর্ণ অবস্থায় আছে এবং তার জীবন-যাপনের উপকরণসমূহ খুবই নগণ্য। ওমর (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘উয়াইস ইবনু আমির নামক এক লোক ইয়ামানের সাহায্যকারী দলের সাথে তোমাদের নিকট আসবে। সে ‘মুরাদ’ জাতির উপজাতি ‘কারন’ বংশীয় লোক। তার কুষ্ঠ রোগ হবে এবং তা থেকে সে মুক্তি পাবে, শুধুমাত্র এক দিরহাম পরিমাণ স্থান ছাড়া। তার মা বেঁচে আছে এবং সে তার মায়ের খুবই অনুগত। সে (আল্লাহর উপর ভরসা করে) কোন কিছুর শপথ করলে তা আল্লাহ পূরণ করে দেন। তুমি যদি তোমার গুনাহ মাফের জন্য তাকে দিয়ে দো‘আ করানোর সুযোগ পাও, তাহ’লে তাই করবে’। লোকটি ফিরে এসে উয়াইসের নিকট গিয়ে বলল, আমার অপরাধ ক্ষমার জন্য আপনি দো‘আ করুন। তিনি (উয়াইস) বললেন, এইমাত্র মঙ্গলময় সফর থেকে প্রত্যাবর্তন করেছেন; বরং আপনি আমার অপরাধ ক্ষমার জন্য দো‘আ করুন। তিনি বললেন, আপনি কি ওমরের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। সে বলল, হ্যাঁ। তার জন্য উয়াইস দো‘আ করলেন। উয়াইসের মর্যাদা সম্পর্কে লোকেরা সচেতন হ’লে সেখান থেকে উয়াইস অন্য স্থানে চলে গেলেন। হাদীছটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।
মুসলিমের আরেক বর্ণনায় উসায়র ইবনু জাবির (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, ওমর (রাঃ)-এর নিকট কূফার অধিবাসীরা একটি সাহায্যকারী দল পাঠায়। দলের এক লোক উয়াইসকে বিদ্রূপ করত। ওমর (রাঃ) বললেন, এখানে ‘কারন’ বংশীয় কেউ আছে কি? ঐ ব্যক্তিটি উঠে আসলে ওমর (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ইয়েমেন থেকে উয়াইস নামে এক লোক তোমার নিকট আসবে। সে তার মাকে ইয়ামানে একা রেখে আসবে। তার কুষ্ঠরোগ হবে। সে আল্লাহর নিকট দো‘আ করবে, আল্লাহ তার রোগমুক্তি দান করবেন, শুধুমাত্র এক দীনার অথবা এক দিরহাম পরিমাণ স্থান ছাড়া। তোমাদের মধ্যে যে কেউ তার দেখা পেলে, তাকে দিয়ে সে যেন তার গুনাহ মাফের জন্য দো‘আ করায়’।
মুসলিমের আরেক বর্ণনায় ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘পরবর্তীদের (তাবিঈ) মধ্যে উয়াইস নামে এক সৎ লোক হবে। তার মা বেঁচে আছে। তার শরীরে কুষ্ঠের চিহ্ন থাকবে। তার নিকট গিয়ে নিজের গুনাহ মাফের জন্য তাকে দিয়ে প্রার্থনা করাও’ (মুসলিম হা/২৫৪২/২২৫)।
পরিশেষে বলব, আল্লাহ আমাদেরকে উয়াইস ইবনু আমিরের মত সৎ কর্মশীল বান্দা হওয়ার তাওফীক দান করুন- আমীন!

Thursday, 22 March 2018

অন‍্যের উপর নিজেকে প্রাধান্য দেওয়া গল্পের সাথে হাদিস শিক্ষা

অন‍্যের উপর নিজেকে প্রাধান্য দেওয়া গল্পের সাথে হাদিস শিক্ষা

আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, একজন লোক রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট এসে বলল, আমাকে ক্ষুধা পেয়েছে। অন্য বর্ণনায় এসেছে, আমি ক্ষুধায় কাতর। তিনি তার স্ত্রীদের নিকট (খাবারের সন্ধানে) লোক পাঠালেন। তারা বলল, ঐ সত্তার কসম যিনি আপনাকে সত্য সহ পাঠিয়েছেন। আমাদের নিকট পানি ব্যতীত অন্য কোন খাদ্য নেই। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তোমাদের মধ্যে কে আছে, যে এর মেহমানদারী করবে? আল্লাহ তার প্রতি দয়া করবেন। তখন আনছারী ছাহাবী (আবু তালহা) বললেন, আমি করব। অতঃপর তিনি তাকে সাথে নিয়ে তার স্ত্রীর নিকট গেলেন এবং বললেন, রাসূলুল্লাহর মেহমানকে সম্মান কর। কোন খাদ্য জমা রাখবে না। সে (স্ত্রী) বলল, আল্লাহর কসম! শিশুদের জন্য রাখা খাদ্য ব্যতীত আমাদের নিকট কোন খাদ্য নেই। তিনি বললেন, তোমার খাবার প্রস্ত্তত কর, বাতি জ্বালিয়ে দাও এবং তোমার সন্তানরা যখন রাতের খাবার খেতে চাইবে তখন তাদের ঘুম পাড়িয়ে দিবে। সে খাবার প্রস্ত্তত করল, বাতি জ্বালালো এবং তার শিশুদের ঘুম পাড়িয়ে দিল। অতঃপর সে দাঁড়াল এবং বাতি ঠিক করার ভাব দেখিয়ে তা নিভিয়ে দিল। অতঃপর তারা উভয়ে (অন্ধকারে) খাবার খাচ্ছে বলে তাকে প্রদর্শন করলো। মেহমান খেল এবং তারা উভয়ে ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাত্রি যাপন করল। অতঃপর সকালে সে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট গমন করলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, গত রাতে মেহমানের সাথে তোমাদের উভয়ের কর্মকান্ড দেখে আল্লাহ হেসেছেন বা অবাক হয়েছেন এবং নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল করেছেন,وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ‘আর তারা তাদেরকে নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্থ হ’লেও। যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য হ’তে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম’ (হাশর ৫৯/৯)। (বুখারী হা/৩৭৯৪; বায়হাকী, সুনানুল কুবরা হা/৭৮০২; সিলসিলা ছহীহা হা/৩২৭২)।

মানুষকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকার ফযীলত :
মালেক ইবনু মারছাদ তার পিতা হ’তে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবু যার (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! কোন আমল মানুষকে জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ দিবে? তিনি বললেন, আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করা। আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী (ছাঃ)! নিশ্চয় ঈমানের সাথে কোন আমল আছে? তিনি বললেন, আল্লাহ তাকে যে সম্পদ দান করেছেন তা থেকে দান করবে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! সে যদি দরিদ্র হয়, তার নিকট দান করার মত কিছু না থাকে, (তাহ’লে সে কি করবে)? তিনি বললেন, সে সৎ কাজের আদেশ দিবে ও অসৎ কাজ হ’তে নিষেধ করবে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সে যদি অপারগ হয়, সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজ হ’তে নিষেধ করতে অক্ষম হয়? তাহ’লে তার করণীয় সম্পর্কে আপনার মত কি? তিনি বললেন, তাহ’লে সে মূর্খের জন্য কিছু করবে। আমি বললাম, যদি সে নিজে মূর্খ হয়, কারো জন্য কিছু করতে সক্ষম না হয়। তাহ’লে কি করবে বলে আপনি মনে করেন? তিনি বললেন, অত্যাচারিতকে সাহায্য করবে। আমি বললাম, সে যদি দুর্বল হয়, অত্যাচারিতকে সাহায্য করতে সক্ষম না হয়, তাহলে কি করবে? তখন তিনি বললেন, তুমি কি তাহ’লে তোমার ভাইয়ের জন্য কল্যাণকর কিছু করবে না? তুমি অন্তত মানুষকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। অতঃপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! সে ঐটা করলে জান্নাতে প্রবেশ করবে? তিনি বললেন, যে মুসলিম উপরোক্ত কর্মসমূহের কোন একটি করবে, (ক্বিয়ামতের দিন) তার হাত ধরে সেগুলো তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে (তাবারাণী, মু‘জামুল কাবীর হা/১৬৫০; সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৬৬৯)।

রসুলাল্লাহ (স:) এর নিকট এক যুবক _ গল্পের সাথে হাদিস শিক্ষা

রসুলাল্লাহ (স:) এর নিকট এক যুবক _ গল্পের সাথে হাদিস শিক্ষা

আবু উমামা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, এক তরুণ যুবক রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমাকে যেনা করার অনুমতি দিন। একথা শুনে উপস্থিত লোকজন তার নিকটে এসে তাকে ধমক দিয়ে বলল, থাম! থাম! রাসূল (ছাঃ) বললেন, তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো। অতঃপর সে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর খুব নিকটে এসে বসল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে বললেন, তুমি কি তোমার মায়ের জন্য এটা (অন্যের সাথে যেনা করা) পসন্দ করবে? সে বলল, না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন! মানুষেরা এটা তাদের মায়েদের জন্য পসন্দ করবে না। তিনি বললেন, তোমার কন্যার জন্য কি তা পসন্দ করবে? সে বলল, না, আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন! কোন মানুষ এটা তাদের মেয়েদের জন্য পসন্দ করবে না। তিনি বললেন, তুমি কি তোমার বোনের জন্য এটা পসন্দ করবে? সে বলল, না আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন! কোন ব্যক্তিই এটা তাদের বোনদের জন্য পসন্দ করবে না। তিনি বললেন, তাহ’লে তোমার ফুফুর জন্য কি এটা পসন্দ করবে? সে বলল, না আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন! কোন পুরুষ এটা তাদের ফুফুদের জন্য পসন্দ করবে না।

তিনি বললেন, তবে তোমার খালার জন্য কি এটা পসন্দ করবে? সে বলল, না আল্লাহর কসম। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন! কোন মানুষ এটা তাদের খালাদের জন্য পসন্দ করবে না। রাবী বলেন, অতঃপর তিনি তার ওপর হাত রেখে দো‘আ করে বললেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি তার গুনাহ ক্ষমা করে দাও, তার হৃদয় পবিত্র করে দাও এবং তার লজ্জাস্থানকে হেফাযত করো’। এরপর ঐ যুবক আর কারো (কোন মহিলার) প্রতি দৃষ্টিপাত করেনি (মুসনাদে আহমাদ হা/২২২৬৫; সিলসিলা ছহীহা হা/৩৭০)

আক্ববার বায়াত , গল্পের সাথে হাদিস শিক্ষা

 আক্ববার বায়াত ,  গল্পের সাথে হাদিস শিক্ষা

নবী করীম (ছাঃ)-এর মদীনায় হিজরতের পূর্বে ইয়াছরিবের কতিপয় লোক হজ্জের মৌসুমে মক্কায় এসে আক্বাবা নামক স্থানে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হাতে আনুগত্যের বায়‘আত গ্রহণ করেন। যার মাধ্যমে রাসূল (ছাঃ)-এর মদীনায় হিজরতের সূচনা হয়। সে সম্পর্কিত দু’টি হাদীছ-

ইমাম আহমাদ কর্তৃক জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) হ’তে হাসান সনদে বর্ণিত হয়েছে, জাবের (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমরা কোন কথার উপরে আপনার নিকটে বায়‘আত করব? তিনি বললেন, (১) সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় আমার কথা শুনবে ও মেনে চলবে (২) অভাবে ও সচ্ছলতায় সর্বাবস্থায় (আল্লাহর রাস্তায়) খরচ করবে (৩) সর্বদা ন্যায়ের আদেশ দিবে ও অন্যায় থেকে নিষেধ করবে (৪) আল্লাহর জন্য কথা বলবে এভাবে যে, আল্লাহর পথে কোন নিন্দুকের নিন্দাবাদকে পরোয়া করবে না (৫) যখন আমি তোমাদের কাছে হিজরত করে যাব, তখন তোমরা আমাকে সাহায্য করবে এবং যেভাবে তোমরা নিজেদের ও নিজেদের স্ত্রী ও সন্তানদের হেফাযত করে থাক, সেভাবে আমাকে হেফাযত করবে। বিনিময়ে তোমরা ‘জান্নাত’ লাভ করবে’ (৬) ওবাদাহ বিন ছামিত (রাঃ) বর্ণিত অপর রেওয়ায়াতে এসেছে যে, ‘আর তোমরা নেতৃত্বের জন্য ঝগড়া করবে না’।[1]

বস্ত্ততঃ প্রায় দেড় হাযার বছর পূর্বে নেওয়া বায়‘আতের শর্তগুলির প্রতিটির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা এ যুগেও পুরোপুরিভাবে বিদ্যমান। সেদিনও যেমন জান্নাতের বিনিময়ে নেওয়া বায়‘আত সর্বাত্মক সমাজবিপ্লবের কারণ ঘটিয়েছিল, আজও তেমনি তা একই পন্থায় সম্ভব, যদি আমরা আন্তরিক হই।

জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মক্কায় দশ বছর অবস্থান করেছিলেন। [মক্কায় দশ বছর তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার করেন। প্রথম অহী লাভের পর তিন বছর গোপনে ইসলাম প্রচার করেন। সম্ভবত এই তিন বছর হিসাবে ধরা হয়নি] তিনি উকায, মাজান্না ও হজ্জ মৌসুমে মিনায় জনসমাগম স্থলে লোকদের অনুসরণ করতেন। তিনি তাদের বলতেন, এমন কে আছে যে আমাকে আশ্রয় দিবে এবং আমাকে সাহায্য করবে, যাতে আমি আমার প্রভুর বার্তা (মানুষের নিকট) পৌঁছে দিতে পারি আর বিনিময়ে সে জান্নাত লাভ করবে? এমনি করে হয়তো একজন লোক ইয়ামন প্রদেশ কিংবা মুযার গোত্র থেকে আসে আর তিনি তাকে এভাবে বলেন, অতঃপর সে তার গোত্রে ফিরে যায় তখন গোত্রের লোকেরা বলে, কুরাইশদের ঐ নওজওয়ানকে তুমি এড়িয়ে চলবে, সে যেন তোমাকে ফিতনায় না ফেলে। তিনি তাদের সওয়ারি/কাফেলাগুলোর মাঝে হেঁটে চলেন; তারা তখন তাকে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে। এমনি করে আল্লাহ তা‘আলা ইয়াছরিব থেকে আমাদেরকে তাঁর নিকট পাঠালেন। আমরা তাঁকে আশ্রয় দিলাম এবং তাঁকে সত্য বলে মানলাম। আমাদের কোন লোক তাঁর নিকট গেলে সে তাঁর উপর ঈমান আনত, তিনি তাকে কুরআন শিখাতেন। তারপর সে তার পরিবারে ফিরে এলে তার ইসলাম গ্রহণের কারণে তারাও ইসলাম গ্রহণ করত। এমনিভাবে আনছারদের এমন কোন বাড়ি বাকী ছিল না, যেখানে একদল মুসলিম ছিল না। তারা তাদের ইসলাম (গ্রহণের বিষয়) প্রকাশ করত। তারপর তারা সবাই মিলে পরামর্শ করল। আমরা বললাম, কতকাল আর আমরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে ছেড়ে থাকব আর তিনিই বা কতকাল মক্কার পাহাড়গুলোতে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ঠেলা খেয়ে ফিরবেন। তখন আমাদের মধ্য হ’তে সত্তর জন লোক তাঁর নিকট যাত্রা করলাম। হজ্জ মৌসুমে আমরা তাঁর সঙ্গে মিলিত হ’লাম। আমরা তাঁর সঙ্গে মিলিত হ’তে আক্বাবার গিরিপথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হ’লাম। আমরা একজন দু’জন করে সবাই তাঁর সঙ্গে মিলিত হ’লাম। আমরা তাঁকে বললাম, আমরা আপনার হাতে কিসের উপরে বায়‘আত গ্রহণ করব। তিনি বললেন, তোমরা আমার নিকট এই শর্তে বায়‘আত গ্রহণ কর যে, তোমরা আমীরের কথা শুনবে ও মানবে কর্মমুখর সময়ে ও অলস মুহূর্তে, অর্থ ব্যয় করবে সচ্ছলতায় ও অসচ্ছলতায়, আদেশ করবে সৎ কাজের এবং নিষেধ করবে অসৎ কাজের। তোমরা আল্লাহর পক্ষে কথা বলবে। আল্লাহর পক্ষে কথা বলতে কোন নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করবে না। আর আমি যখন তোমাদের ওখানে যাব তখন তোমরা আমাকে সাহায্য করবে এবং যা কিছু থেকে তোমরা নিজেদের জীবন, স্ত্রী ও সন্তানদের রক্ষা কর, তৎসমুদয় থেকে আমাকে রক্ষা করবে। (এ সবের বিনিময়ে) তোমাদের জন্য জান্নাত রয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর আমরা তাঁর নিকট উঠে গেলাম এবং বায়‘আত গ্রহণ করলাম। আস‘আদ ইবনু যারারাহ তাঁর হাত ধরল। সে ছিল দলের মধ্যে বয়সে সবচেয়ে ছোট। সে বলল, হে ইয়াছরিববাসী একটু থাম। তিনি যে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) সে কথা জেনেই আমরা উট হাঁকিয়ে এখানে এসেছি। আজ তাঁকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যাওয়ার অর্থ সারা আরবের বিরোধিতা কাঁধে তুলে নেওয়া, তোমাদের শ্রেষ্ঠজনদের নিহত হওয়া এবং তোমাদের তলোয়ারের পাকড়াওয়ের মুখোমুখি হওয়া। এখন ভেবে চিন্তে বল, তোমরা কি এসব বিষয়ে ধৈর্য ধরে থাকবে এবং আল্লাহর নিকট থেকে পুরস্কার লাভ করবে, নাকি কাপুরুষতা বশত নিজেদের জীবন বাঁচানোর ভয় করবে? এটা আল্লাহর নিকট তোমাদের ওযর হ’তে পারে। তারা বলল, হে আস‘আদ, আমাদের থেকে দূর হও। আল্লাহর কসম! আমরা এই বায়‘আত কখনই ত্যাগ করব না এবং কখনই তা ছিন্ন করব না। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর আমরা তাঁর নিকট উঠে গেলাম এবং বায়‘আত করলাম। তিনি আমাদের থেকে শর্তমূলে বায়‘আত গ্রহণ করলেন এবং বিনিময়ে তিনি আমাদের জান্নাত দিলেন। অর্থাৎ জান্নাত লাভের প্রতিশ্রুতি দিলেন’।[2]

মুসা আঃ এর লজ্জশীলতা ....গল্পের সাথে হাদিস শিক্ষা

মুসা আঃ এর লজ্জশীলতা ....গল্পের সাথে হাদিস শিক্ষা

আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘মূসা (আঃ) ছিলেন খুব লজ্জাশীল ও পর্দানশীন ব্যক্তি। তাঁর লজ্জাশীলতার কারণে তাঁর দেহের কোন অংশ দেখা যেত না। ফলে বনী ইসরাঈলের লোকেরা তাঁকে যা কষ্ট দেয়ার দিল। তারা বলল, তাঁর চামড়ায় কোন দোষ-ত্রুটি থাকার কারণেই তিনি এ পর্দা করছেন। তাঁর চামড়ায় কুষ্ঠরোগ বা তাঁর হার্নিয়া রয়েছে কিংবা সে মহামারীতে আক্রান্ত। অন্যদিকে আল্লাহ তা‘আলা চান যে, তারা মূসা (আঃ)-কে যা বলছে তা থেকে তাঁকে মুক্ত করবেন। অতঃপর তিনি একদিন একাকী (গোসলের উদ্দেশ্যে) নির্জনে গেলেন। অতঃপর তিনি তাঁর কাপড় একটা পাথরের উপর রেখে গোসল করতে লাগলেন। অতঃপর তিনি গোসল শেষ করে কাপড় নেয়ার জন্য পাথরের নিকট আসলেন। আর পাথর তাঁর কাপড় নিয়ে দূরে সরতে লাগল। অতঃপর তিনি তাঁর লাঠি নিয়ে পাথরের খোঁজে ছুটলেন এবং বলতে শুরু করলেন, হে পাথর! আমার কাপড়, হে পাথর! আমার কাপড় (লুঙ্গি)। অবশেষে বনী ইসরাঈলের একটা দলের নিকটে গিয়ে থামল। ফলে তারা তাঁকে বস্ত্রহীন অবস্থায় দেখল যে, আল্লাহ তাকে কতই না সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন। আর তিনি তাকে তাদের কথিত দোষ থেকে মুক্ত করলেন। তারা বলল, আল্লাহর কসম! মূসা (আঃ)-এর কোন রোগ-ব্যাধি নেই। পাথর দাঁড়াল, মূসা (আঃ) তাঁর কাপড় নিয়ে পরলেন এবং তাঁর লাঠি দিয়ে পাথরকে কঠিনভাবে প্রহার শুরু করলেন। আল্লাহর কসম! তাঁর প্রহারে পাথরে তিন, চার বা পাঁচটি আঘাতের চিহ্ন বিদ্যমান ছিল। আর এটাই প্রমাণ বহন করে আল্লাহর বাণী- ‘হে মুমিনগণ! যারা মূসাকে কষ্ট দিয়েছে, তোমরা তাদের ন্যায় হয়ো না। অতঃপর আল্লাহ তাকে তাদের কথিত অপবাদ থেকে মুক্ত করলেন, আর তিনি ছিলেন আল্লাহর নিকট মর্যাদাবান’ (বুখারী হা/২৭৮, ৩৪০৪; তিরমিযী হা/৩২২১; মিশকাত হা/৫৭০৬)।

Tuesday, 20 March 2018

হযরত আবু বক্কর (রা:) মৃত্যু কালীন অসিয়ত


ইসলামের ১ম খলীফা আবুবকর ছিদ্দীক্ব (রাঃ)-এর মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হ’লে তিনি সূরা ক্বাফ-এর ১৯নং আয়াতটি তেলাওয়াত করেন (‘মৃত্যুযন্ত্রণা অবশ্যই আসবে; যা থেকে তুমি টালবাহানা করে থাক’)। অতঃপর তিনি স্বীয় কন্যা আয়েশা (রাঃ)-কে বললেন, আমার পরিহিত দু’টি কাপড় ধুয়ে তা দিয়ে আমাকে কাফন পরিয়ো। কেননা মৃত ব্যক্তির চাইতে জীবিত ব্যক্তিই নতুন কাপড়ের অধিক হকদার[1]। অতঃপর তিনি পরবর্তী খলীফা হযরত ওমর (রাঃ)-কে অছিয়ত করেন এই মর্মে যে, ‘নিশ্চয়ই রাত্রির জন্য আল্লাহ এমন কিছু হক নির্ধারণ করে রেখেছেন, যা তিনি দিবসে কবুল করেন না। আবার দিবসের জন্য এমন কিছু হক নির্ধারণ করেছেন, যা রাতে কবুল করেন না। কোন নফল ইবাদত কবুল করা হয় না, যতক্ষণ না ফরযটি আদায় করা হয়। নিশ্চয়ই আখেরাতে মীযানের পাল্লা হালকা হবে দুনিয়ার বুকে বাতিলকে অনুসরণ করা এবং নিজের উপর তা হালকা মনে করার কারণে। অনুরূপভাবে আখেরাতে মীযানের পাল্লা ভারী হবে দুনিয়াতে হক অনুসরণ করা এবং তাদের উপর তা ভারী হওয়ার কারণে’[2]।

শিক্ষা: রাষ্ট্রীয় গুরুদায়িত্ব পালনকারীর জন্য অলসতা ও বিলাসিতার কোন সুযোগ নেই। তাকে কোন অবস্থাতেই বাতিলের সাথে আপোষ করা চলবে না। বরং যেকোন মূল্যে সর্বাবস্থায় হক তথা আল্লাহ প্রেরিত সত্যকে কঠিনভাবে আঁকড়ে ধরে থাকতে হবে। কেননা দুনিয়াতে সকল কাজের উদ্দেশ্য হবে আখেরাতে মীযানের পাল্লা ভারী করা।

দুরন্ত সাহসের অন্যান্য কাহিনী ইসলামিক ছোট গল্প

গল্পের সাথে হাদিস শিক্ষা

সাহসিকতা প্রত্যেক মানুষের একটি মৌলিক গুণ। এ সাহসিকতা ভাল কাজে ব্যবহার করলে সুনাম হয়। আর খারাপ কাজে ব্যবহার করলে বদনাম হয়। অন্যায়কারীর সামনে সত্য কথা বলে তার অন্যায়ের প্রতিবাদ করা প্রশংসনীয় কাজ। রাসূলুল­াহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম জিহাদ হ’ল অত্যাচারী বাদশাহর নিকট হক কথা বলা’ (আবূদাউদ হা/৪৩৪৪; তিরমিযী হা/২১৭৪; মিশকাত হা/৩৭০৫)। যুগে যুগে মহান ব্যক্তিগণ এই সাহসিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাদের মধ্যে তাবেঈ ত্বাউস ইবনু কায়সান (রহঃ) অন্যতম।

ইসলামের পঞ্চম খলীফা হিসাবে খ্যাত ওমর ইবনু আব্দুল আযীয (রহঃ)-এর আমলে একজন বিখ্যাত তাবেঈ ছিলেন, যার নাম ত্বাউস। তাঁর বংশক্রম হ’ল আবু আব্দির রহমান ত্বাউস ইবনু কায়সান আল-খাওলানী আল-হামাদানী আল-ইয়ামানী। তিনি একজন দক্ষ ও বিজ্ঞ ফক্বীহ ছিলেন। তিনি ইবনু আববাস, আবু হুরায়রাহ (রাঃ) সহ অন্যান্য ছাহাবীগণের কাছ থেকে হাদীছ শুনেছেন। মুজাহিদ, আমর ইবনু দীনার সহ অনেকে তার নিকট থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। ওমর ইবনু আব্দুল আযীয যখন খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন তখন ত্বাউস (রহঃ) তার কাছে পত্র লিখে বললেন, আপনি যদি চান যে, আপনার রাষ্ট্র ভালভাবে পরিচালিত হোক, তাহ’লে আপনি ভাল লোকদেরকে রাষ্ট্রীয় কাজে নিযুক্ত করুন। তখন ওমর ইবনু আব্দুল আযীয বলেন, আমার উপদেশ গ্রহণের জন্য তার এ কথাই যথেষ্ট। তিনি ১০৬ মতান্তরে ১০৪ হিজরী সনে মক্কায় ইয়াওমুত তারবিয়ার একদিন পূর্বে মৃত্যুবরণ করেন। আব্দুল্লাহ ইবনু হাসান ইবনে আলী তাঁর জানাযার খাট বহন করেন এবং খলীফা হিশাম ইবনু আব্দিল মালেক তাঁর জানাযায় অংশগ্রহণ করেন।

একদা খলীফা হিশাম বিন আব্দুল মালেক হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় আসেন। তখন তিনি মক্কাবাসীকে বললেন, এ সময়ে কি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কোন ছাহাবী বেঁচে আছেন? বলা হ’ল, হে আমীরুল মুমিনীন! এতদিনে ছাহাবায়ে কেরাম মৃত্যুবরণ করেছেন। তখন তিনি বললেন, কোন তাবেঈ বেঁচে আছে কি? এসময় ত্বাউস ইবনু কায়সান ইয়ামানী (রহঃ) মক্কায় ছিলেন। প্রশাসনের লোকেরা গিয়ে তাঁকে খলীফার নিকটে নিয়ে আসল। তিনি খলীফার নিকটে প্রবেশ করে তাঁর জুতা কার্পেটের পার্শ্বে খুলে রাখলেন। অতঃপর আস-সালামু আলাইকুম বলে খলীফার অনুমতি ব্যতীত তাঁর পার্শ্বে গিয়ে বসলেন। এরপর বললেন, হে হিশাম! আপনি কেমন আছেন? ত্বাউস (রহঃ)-এর আচরণে হিশাম কঠিনভাবে রেগে গেলেন এবং তাঁকে হত্যা করার মনোভাব প্রকাশ করলেন। তখন তাকে বলা হ’ল, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি পবিত্র হারামে অবস্থান করছেন। আর আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ছাঃ) হারামের মধ্যে সব ধরনের হত্যাকান্ড নিষিদ্ধ করেছেন। অতএব এটা সম্ভব নয়। হিশাম বললেন, হে ত্বাউস! এ কাজ করার সাহস তুমি কোথায় পেলে? তিনি বললেন, আমি তো কোন অপরাধ করিনি। একথা শুনে খলীফা হিশামের রাগ আরও বৃদ্ধি পেল। তিনি বললেন, তোমার প্রথম অপরাধ তুমি কার্পেটের পার্শ্বে তোমার জুতা খুলে রেখেছ। দ্বিতীয় অপরাধ তুমি আমাকে আমীরুল মুমিনীন বলে সালাম দেওনি এবং আমাকে আমার উপনামে না ডেকে, নাম ধরে ডেকেছ। তারপর আমার অনুমতি ব্যতীত আমার পার্শ্বে এসে বসেছ। সর্বোপরি তুমি বলেছ, হে হিশাম! আপনি কেমন আছেন? তখন ত্বাউস (রহঃ) উত্তরে বললেন, হ্যাঁ আমি আপনার নিকটে আসার আগে আমার জুতা খুলে কার্পেটের পাশে রেখেছি। আমি তো প্রতিদিন পাঁচবার আমার প্রভুর ডাকে সাড়া দেয়ার সময় জুতা খুলে রাখি, তিনি তো কখনও আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হন না এবং আমার প্রতি রাগও করেন না। আপনি বলেছেন, আমি আপনাকে আমীরুল মুমিনীন বলে সালাম দেইনি। এর কারণ সমস্ত মানুষ আপনার খেলাফতে সন্তুষ্ট নয় এবং সবাই আপনাকে আমীরুল মুমিনীন হিসাবে মানেও না। তাই আমি আমীরুল মুমিনীন বললে তাতে মিথ্যার সম্ভাবনা রয়েছে। আপনার অপর অভিযোগ, আমি আপনাকে উপনামে আহবান করিনি বরং আপনার নাম ধরে ডেকেছি। এর কারণ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবীগণকে তাদের স্ব স্ব নামে ডেকেছেন যেমন- ‘হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে খলীফা নিযুক্ত করেছি’ (ছোয়াদ ৩৮/২৬)। ‘হে ইয়াহইয়া (মারইয়াম ১৯/১২), হে ঈসা (ইমরান ৩/৫৫)! ইত্যাদি। আর তিনি তাঁর শত্রুদের উপনামে ডেকেছেন। যেমন তিনি বলেন, ‘ধ্বংস হউক আবু লাহাবের দু’হস্ত এবং সে নিজেও’ (লাহাব ১১১/০১)।

আমি আপনার অনুমতি ব্যতীত আপনার পার্শ্বে বসেছি। কারণ আমি আমীরুল মুমিনীন আলী ইবনু আবী ত্বালিব (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, তুমি যদি কোন জাহান্নামীকে দেখতে চাও, তাহ’লে ঐ ব্যক্তির দিকে তাকাও, যে বসে আছে, অথচ তার আশে-পাশে লোকেরা তার সম্মানে দাঁড়িয়ে আছে। তাই আমি না দাঁড়িয়ে বসে পড়েছি। খলীফা হিশাম বিন আব্দুল মালেক তখন লা-জওয়াব হয়ে গিয়ে রাগ দমন করলেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, হে ত্বাউস! আমাকে উপদেশ দাও। ত্বাউস (রহঃ) বললেন, আমি আমীরুল মুমিনীন আলী (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, জাহান্নামে পাহাড়ের চূড়ার ন্যায় লম্বা লম্বা সাপ হবে এবং খচ্চরের মত বড় বড় বিচ্ছু হবে যা প্রজাদের প্রতি অত্যাচারী শাসকদেরকে দংশন করতে থাকবে। অতঃপর ত্বাউস (রহঃ) সেখান থেকে উঠে চলে গেলেন (ইবনু খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ‘ইয়ান ২/৫০৯-৫১০)।

মুসলমানদের নাওয়ান্ধা বিজয় ইসলামিক ছোট গল্প

গল্পের সাথে হাদিস শিক্ষা

যিয়াদ বিন জুবায়ের বিন হাইয়্যা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার পিতা আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, ওমর ইবনুুল খাত্ত্বাব (রাঃ) হারমুযানকে (বন্দি পারসিক সেনাপতি) বললেন, তুমি যখন নিজেকে আমার তুলনায় দুর্বল ভেবেই নিয়েছ, তখন আমাকে উপদেশমূলক কিছু কথা বল। তাকে তিনি এ কথাও বললেন যে, তোমার যা ইচ্ছা তাই বল, তোমার কোন ক্ষতি হবে না। অতঃপর তিনি তাকে জীবনের নিরাপত্তবা দান করলেন। তখন হারমুযান বলল, হ্যাঁ, বর্তমানে পারসিক সেনাবাহিনীর তিনটি ভাগ রয়েছে। শিরদেশ বা অগ্রবর্তী দল এবং দু’টি ডানা বা দল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, অগ্রবর্তী দল এখন কোথায়? সে বলল, তারা বুনদারের অধীনে নাহাওয়ান্দে অবস্থান করছে। তার সাথে রয়েছে কিসরার জেনারেলগণ ও ইস্পাহানের অধিবাসীগণ। তিনি বললেন, আর ডানা দু’টো (অর্থাৎ অন্য দু’টি দল) কোথায় আছে? হারমুযান একটা জায়গার নাম বলেছিল কিন্তু আমি তা ভুলে গিয়েছি। হারমুযান তাঁকে এটাও বলল, আপনি দল দু’টো কেটে ফেলুন, দেখবেন শিরদেশ বা মাথা আপনা থেকেই দুর্বল হয়ে পড়বে। ওমর (রাঃ) তাকে বললেন, আল্লাহর শত্রু, তুই অসত্য বলেছিস। আমি বরং ওদের মাথা ধ্বংসের সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, যাতে আল্লাহ তা বিচ্ছিন্ন করে দেন। যখন আল্লাহ আমার পক্ষ থেকে মাথাটা কেটে দিবেন তখন দল দু’টো এমনিতেই কাটা পড়ে যাবে। অতঃপর ওমর (রাঃ) নিজেই উক্ত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রায় বের হওয়ার অভিমত প্রকাশ করেন। কিন্তু তাঁরা (উপদেষ্টামন্ডলী/মুসলিমজনতা) তাঁকে বলল, হে আমীরুল মুমিনীন, আমরা আপনাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করতে বলছি। আপনি যদি নিজে এই অনারব বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে যান আর (আল্লাহ না করুন) আপনি যদি শাহাদাত বরণ করেন, তাহ’লে মুসলমানদের মধ্যে শৃঙ্খলা বলে কিছু থাকবে না। তার চেয়ে আপনি বরং অনেকগুলো সেনাদল প্রেরণ করুন। তিনি তখন মদীনাবাসীদের একটি দল প্রেরণ করলেন, যাদের মাঝে ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ)। আরও প্রেরণ করলেন আনছার ও মুহাজিরদের একটি দল। সেই সঙ্গে তিনি আবু মূসা আশ‘আরী (রাঃ)-কে বছরার সেনাদল এবং হুযায়ফা ইবনুুল ইয়ামান (রাঃ)-কে কুফার সেনাদল নিয়ে নাহাওয়ান্দে সকলকে জমায়েত হতে পত্র লিখলেন। তিনি একথাও লিখে দিলেন যে, তোমরা সব দল একত্রিত হলে তোমাদের আমীর হবে নু‘মান ইবনু মুকাররিন মুযানী। যখন তারা সবাই নাহাওয়ান্দে সমবেত হলেন তখন বুনদার (আলাজ) তাঁদের নিকট এই মর্মে আবেদন জানিয়ে একজন দূত পাঠাল যে, হে আরব জাতি, তোমরা আমাদের নিকট পারস্পরিক আলোচনার জন্য একজন লোক পাঠাও। লোকেরা তখন মুগীরাহ ইবনু শু‘বাকে এজন্য মনোনীত করল। আমার (বর্ণনাকারীর) পিতা জুবায়ের (রাঃ) বলেন, আমার চোখে এখনও যেন সেই দৃশ্য ভাসছে- লম্বা, এলোমেলো কেশবিশিষ্ট, এক চোখওয়ালা একজন (দুর্বল) লোক যাচ্ছেন। তিনি তার নিকট গিয়ে যখন আলোচনা শেষে ফিরে এলেন তখন আমরা তাঁকে বৃত্তান্ত জিজ্ঞেস করলাম। তিনি আমাদের বললেন, আমি গিয়ে দেখলাম আলাজ (বুনদার) তার পারিষদবর্গের সাথে পরামর্শ করছে- তোমরা এই আরবীয়র বিষয়ে কী করতে বল? আমরা কি তার সামনে আমাদের জাঁকজমক, ঠাটবাট, ক্ষমতার আড়ম্বর তুলে ধরব, নাকি তাকে আমাদের অনাড়ম্বর সাদামাটা অবস্থা দেখাব এবং আমাদের বিত্তবৈভব ও শক্তিমত্তার দিকটা তার থেকে আড়াল করে রাখব? তারা বলল, না বরং আমাদের যে ঐশ্বর্য ও শক্তি সামর্থ্য আছে তার সেরাটাই তার সামনে তুলে ধরতে হবে। অতঃপর আমি যখন তাদের দেখা পেলাম তখন তাদের যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র বল্লম, ঢাল ইত্যাদি আমার দৃষ্টিগোচর হ’ল। সেগুলো এতই জাক-জমকপূর্ণ ছিল যে, চোখে ধাঁধা লেগে যাচ্ছিল।

আলাজের পারিষদবর্গকে আমি তার মাথা বরাবর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেলাম। সে ছিল স্বর্ণ নির্মিত চেয়ারে বসা। তার মাথায় মুকুট শোভা পাচ্ছিল। আমি আমার মত হেঁটে তার কাছে পৌঁছলাম এবং তার সাথে চেয়ারে আসন গ্রহণের জন্য আমার মাথা একটু নিচু করলাম। কিন্তু আমাকে বাধা দেওয়া হল এবং ধমক দেওয়া হল। আমি তখন বললাম, দূতদের সাথে তো এমন অশোভন আচরণ করা বিধেয় নয়। তারা তখন আমাকে বলল, আরে তুই তো একটা কুকুর! একজন রাজার সাথে তুই কি বসতে পারিস? আমি বললাম, তোমাদের মাঝে এই লোকটার (বুনদারের) যে মর্যাদা, আমি আমার জাতির মাঝে তার থেকেও বেশী মর্যাদার অধিকারী। এবার বুনদার আমাকে ধমক দিয়ে বলল, আরে বস। আমি তখন বসে পড়লাম। একজন দোভাষী তার কথা আমাকে অনুবাদ করে দিল। সে বলল, হে আরব জাতি, তোমরা মানবজাতির মাঝে সবচেয়ে বেশী ক্ষুধার ক্লেশভোগী, তোমাদের মত হতভাগাও আর দ্বিতীয় নেই, তোমরা এতই নোংরা দুর্গন্ধযুক্ত যে এ ভুবনে তার জুড়ি নেই, বাড়ি-ঘরের সঙ্গেও তোমাদের দূরতম কোন সম্পর্ক নেই (তোমরা মরুচারী যাযাবর বেদুঈন)। সব রকম কল্যাণ থেকে তোমরা বহু দূরে অবস্থিত। এখন আমার চারপাশে যে জেনারেলদের দেখছ, এদেরকে আমি কেবল এই হুকুমই দেব যে, তারা তীরধনুক ও অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্রের দ্বারা তোমাদের গায়ের দুর্গন্ধ দূর করে তোমাদেরকে একেবারে শায়েস্তা করে দেবে। কারণ তোমরা দুর্গন্ধযুক্ত (অর্থাৎ তারা তোমাদেরকে মেরে ফেলবে)। এখন যদি তোমরা আমাদের এলাকা ছেড়ে চলে যাও তোমাদের রাস্তা পরিষ্কার করে দেওয়া হবে। আর যদি না যেতে চাও তবে মৃত্যুর ঠিকানাতেই আমরা তোমাদের আবাস গড়ে দেব। (এবার মুগীরা (রাঃ)-এর বলার পালা)। মুগীরা (রাঃ) বলেন, আমি তখন আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা ও গুণকীর্তন করলাম। তারপর বললাম, আল্লাহর কসম, আমাদের গুণ ও অবস্থা বর্ণনায় তুমি একটুও ভুল করনি। আসলেই বাড়িঘর তথা সভ্যতার থেকে আমরা সকল মানব জাতির তুলনায় অনেক দূরে ছিলাম। ক্ষুধার তীব্র জ্বালাও আমরা সব মানুষের থেকে বেশী সয়েছি, দুর্ভাগ্যের বোঝাও আমাদের সবচে বেশী বইতে হয়েছে, সব রকম কল্যাণ থেকে আমরা অনেক দূরে ছিলাম। শেষ অবধি আল্লাহ তা‘আলা আমাদের মাঝে একজন রাসূল পাঠালেন। তিনি আমাদেরকে দুনিয়াতে বিজয় এবং আখিরাতে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিলেন। আমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সেই রাসূলের আগমন থেকে নিয়ে তাঁর (আল্লাহর) মহান কৃপায় কল্যাণ ও বিজয়ের সঙ্গে আমরা এখন পরিচিত হয়েছি। শেষাবধি আমরা তোমাদের দরজায় হাযির হয়েছি। আল্লাহর কসম, আমরা তোমাদের যে রাজ্য ও জীবন-জীবিকা দেখছি তাতে আমরা আর ঐ দুর্ভাগ্যের পানে কখনই ফিরে যাব না। হয় আমরা তোমাদের মালিকানাধীন যা আছে তা সব জয় করব, নয় তোমাদের দেশেই নিহত হব।

বুনদার বলল, এই কানা লোকটা তার মনের কথা সত্যই তোমাদের বলেছে। অতঃপর আমি তার নিকট থেকে উঠে এলাম। আল্লাহর কসম, ইতোমধ্যে আমার চেষ্টায় আমি আলাজের মনে ভয় ধরাতে সক্ষম হয়েছি। এরপর আলাজ আমাদের নিকট দূত পাঠাল যে, তোমরা (দজলা নদী) পাড়ি দিয়ে নাহাওয়ান্দে আমাদের নিকট এসে যুদ্ধ করবে, নাকি আমরা পাড়ি দিয়ে তোমাদের নিকট গিয়ে যুদ্ধ করব? আমাদের সেনাপতি নু‘মান আমাদেরকে বললেন, তোমরা নদী পার হও। ফলে আমরা নদী পার হলাম। আমার পিতা বলেন, এ দিনের মত দৃশ্য আমি আর কখনো দেখিনি। আলাজের পারসিক বাহিনী যেন লোহার পাহাড় হয়ে ধেয়ে আসছিল। তারা পরস্পর অঙ্গীকারা বদ্ধ হয়েছিল যে, তারা আরবদের ভয়ে পলায়ন করবে না। তাদের একজনকে অন্য জনের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, যার সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল সাত। তারা তাদের পেছনে কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে রেখেছিল। তারা বলাবলি করছিল, আমাদের মধ্যে যে পালাতে চেষ্টা করবে সে লোহার কাঁটাতারে জড়িয়ে খুন হবে। মুগীরা ইবনু শু‘বা (রাঃ) তাদের সংখ্যাধিক্য দেখে বললেন, আজকের মত হতাশা আর কোন দিন লক্ষ করিনি। আমাদের শত্রুরা আজ ঘুম ত্যাগ করবে, তারা আগে আক্রমণ করবে না। আল্লাহর কসম, যদি দায়িত্ব আমার কাঁধে থাকত তাহ’লে আমি তাদের আগে আক্রমণ করতাম। এদিকে সেনাপতি নু‘মান (রাঃ) ছিলেন অধিক কাঁন্নাকাটি করা মানুষ। তিনি মুগীরা (রাঃ)-কে বললেন, আল্লাহ তা‘আলা যদি আপনাকে অনুরূপ অবস্থার মুখোমুখি করেন, তখন যেন তিনি আপনাকে দুঃখ-বেদনার মুখোমুখি না করেন এবং আপনার ভূমিকায় আপনাকে দোষী না বানান। আল্লাহর কসম! তাদের সাথে দ্রুত যুদ্ধে লিপ্ত হতে আমার একটাই বাধা , যা আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে লক্ষ করেছি। তিনি যখন যুদ্ধে যেতেন তখন দিনের পূর্ব ভাগে আক্রমণ করতেন না। যতক্ষণ না ছালাতের ওয়াক্ত হয়, বাতাস বইতে থাকে এবং যুদ্ধ অনুকূলে হয় ততক্ষণ তিনি আগবাড়িয়ে আক্রমণে যেতেন না। তারপর নু‘মান (রাঃ) এই বলে দো‘আ করলেন যে, হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট প্রার্থনা করছি। তুমি এমন বিজয় দ্বারা আমার চোখ ঠান্ডা করবে যাতে ইসলাম ও মুসলিমদের সম্মান এবং কুফর ও কাফিরদের লাঞ্ছনা নিহিত থাকবে। তার পরে তুমি শাহাদাতের অমিয় সুধা পানের মাধ্যমে আমার জীবনের অবসান ঘটাবে। দো‘আ শেষে তিনি বললেন, আল্লাহ তোমাদের উপর রহম করুন, তোমরা সবাই আমীন বল। আমরা বললাম, আমীন (হে আল্লাহ, কবুল কর)। দো‘আ করে তিনি কেঁদে ফেললেন, আমরাও কেঁদে ফেললাম। তারপর আক্রমণ কীভাবে শুরু হবে সে প্রসঙ্গে নু‘মান (রাঃ) বললেন, আমি যখন আমার পতাকা দুলাব তখন তোমরা অস্ত্র নিয়ে প্রস্ত্তত হবে। দ্বিতীয়বার যখন আমি পতাকা দুলাব তখন তোমরা তোমাদের বরাবর যে শত্রু থাকবে তার উপর হামলার প্রস্ত্ততি নেবে। তৃতীয়বার দুলালে প্রত্যেকেই যেন তার সামনাসামনি অবস্থিত শত্রুর উপর আল্লাহর বরকত কামনা করে আক্রমণ চালিয়ে যাবে।

অতঃপর যখন ছালাতের সময় হল এবং বাতাস বইতে লাগল তখন সেনাপতি আল্লাহু আকবার ধ্বনি করলেন, আমরাও তাঁর সাথে আল্লাহু আকবার বললাম। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, আল্লাহ চাহে তো এটি বিজয়ের বাতাস। আমি নিশ্চিত আশা করি যে, আল্লাহ আমাদের দো‘আ কবুল করবেন এবং আমাদের বিজয় অর্জিত হবে। এই বলে তিনি পতাকা দুলালেন। সৈন্যরা সবাই যুদ্ধের জন্য প্রস্ত্তত হল। তিনি দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার পতাকা দুলালেন, তখন আমরা একযোগে প্রত্যেকেই নিজের সামনের জনের উপর আক্রমণ করলাম। মহান সেনাপতি নু‘মান (রাঃ) যুদ্ধের প্রারম্ভে বলেন, আমি নিহত হ’লে হুযায়ফা ইবনুুল ইয়ামান (রাঃ) দলপতি হবেন। যদি হুযায়ফা নিহত হন তবে অমুক (তারপর অমুক)। এভাবে তিনি সাত জনের নাম উল্লেখ করেন যাঁদের সর্বশেষ ব্যক্তি ছিলেন মুগীরা ইবনু শু‘বা (রাঃ)। আমার পিতা বলেন, আল্লাহর কসম, মুসলমানদের এমন একজনও আমার জানামতে ছিল না, যে নিহত কিংবা জয় ব্যতীত নিজ পরিবারে ফিরে যেতে আগ্রহী ছিল। প্রতিপক্ষ আমাদের বিপক্ষে স্থির দাঁড়িয়ে গেল। তখন আমরা কেবল লোহার উপর লোহার আঘাত ছাড়া আর কিছুই শুনতে পাচ্ছিলাম না। এতে করে মুসলমানদের মধ্য থেকে একটি বড় দল নিহত হ’ল কিন্তু যখন তারা আমাদের ধৈর্য ও দৃঢ়তা দেখতে পেল এবং বুঝতে পারল যে আমরা ফিরে যেতে ইচ্ছুক নই তখন তারা পিঠ টান দিল। তখন তাদের একজন লোক ঘায়েল হ’লে রশিতে আবদ্ধ সাত জনই পড়ে যাচ্ছিল এবং সবাই নিহত হচ্ছিল। আর পিছন থেকে লোহার কাঁটা তারের বেড়া তাদের প্রাণহানি ঘটাচ্ছিল। তখন নু‘মান (রাঃ) বললেন, তোমরা পতাকা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাও। আমরা পতাকা নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে থাকলাম, আর তাদের হত্যা ও পরাস্ত করতে লাগলাম। তারপর নু‘মান (রাঃ) যখন দেখলেন, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর দো‘আ কবুল করেছেন এবং তিনি বিজয়ও দেখতে পেলেন ঠিক তখনই একটি তীর এসে তাঁর কোমরে বিঁধল, আর তাতেই তিনি শাহাদত বরণ করলেন।

এ সময় তাঁর ভাই মা‘কাল ইবনু মুকার্রিন এগিয়ে এসে একটি কাপড় দিয়ে তাঁকে ঢেকে দেন। তারপর তিনি পতাকা ধারণ করে এগিয়ে যান এবং বলেন, আল্লাহ তোমাদের উপর রহম করুন, তোমরা সামনে এগিয়ে চল। আমরা তখন এগিয়ে চললাম এবং তাদের পরাস্ত ও হত্যা করতে লাগলাম। তারপর আমরা যখন যুদ্ধ শেষ করলাম এবং লোকেরা এক জায়গায় জমা হ’ল তখন তারা বলল, আমাদের আমীর (সেনাপতি) কোথায়? তখন মা‘কাল বললেন, এই যে তোমাদের আমীর। আল্লাহ বিজয় দ্বারা তাঁর চোখকে ঠান্ডা করেছেন, আর তাঁর শেষ যাত্রায় শাহাদাত নছীব হয়েছে। তারপর লোকেরা হুযায়ফা ইবনুুল ইয়ামান (রাঃ)-এর হাতে বায়‘আত হ’ল।

রাবী বলেন, এদিকে ওমর ইবনুুল খাত্ত্বাব (রাঃ) মদীনায় বসে আল্লাহর কাছে দো‘আ করছিলেন। আর প্রসূতি যেমন সদ্যপ্রসূত সন্তানের কান্নার আওয়ায শোনার প্রতীক্ষা করে তেমন করে তিনি যুদ্ধের সংবাদ শোনার প্রতীক্ষা করছিলেন। ইত্যবসরে হুযায়ফা (রাঃ) একজন মুসলিমের হাতে ওমর (রাঃ)-এর নিকট বিজয় বার্তা লিখে পাঠালেন। সে তাঁর নিকট পৌঁছে যখন বলল, আমীরুল মুমিনীন, এমন একটা বিজয়ের সুসংবাদ গ্রহণ করুন, যার মাধ্যমে আল্লাহ ইসলাম ও মুসলমানদের সম্মানিত করেছেন এবং শিরক ও মুশরিকদের অপদস্থ করেছেন। তখন তিনি বললেন, তোমাকে কি নু‘মান পাঠিয়েছে? সে বলল, আমীরুল মুমিনীন, নু‘মান (রাঃ) পরপারে যাত্রা করেছেন। একথা শুনে ওমর (রাঃ) কেঁদে ফেললেন এবং ইন্নালিল্লাহ পড়লেন। তারপর বললেন, তোমার উপর রহম হোক, আর কে কে মারা গেছে? সে বলল, অমুক, অমুক- এভাবে সে বেশ কিছু লোকের নাম বলল, তারপর বলল। হে আমীরুল মুমিনীন, অন্য আরো অনেকে মারা গেছেন, যাদের আপনি চিনবেন না। ওমর (রাঃ) তখন কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ওমর তাঁদের না চিনলেও তাঁদের কোন ক্ষতি নেই। কারণ আল্লাহ তা‘আলা তো তাঁদের অবশ্যই চিনবেন।

সৌন্দর্য মর্যাদার মাপকাঠি নয় ইসলামিক ছোট গল্প


রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর একজন ছাহাবী ছিলেন, যার নাম ছিল জুলায়বীব (রাঃ)। জুলায়বীব শব্দের অর্থ ‘ক্ষুদ্র পূর্ণতাপ্রাপ্ত’। এই নাম দিয়ে মূলতঃ জুলায়বীবের খর্বাকৃতিকে বুঝানো হ’ত। তিনি ছিলেন উচ্চতায় অনেক ছোট।

আনাস (রাঃ) বলেন, তিনি দেখতে কুশ্রীও ছিলেন। রাসূল (ছাঃ) তাকে বিবাহ করার কথা বললে তিনি নিজের কুশ্রী চেহারার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, বিবাহের ক্ষেত্রে তো আমি অচল বা চাহিদাহীন। রাসূল (ছাঃ) বললেন, হ’তে পারে, তবে আল্লাহর নিকটে তুমি অচল নও।

আবু বারযা আল-আসলামী (রাঃ) বলেন, জুলায়বীবের বিষয়টা এমন ছিল যে, সে মহিলাদের নিকটে গেলে তারা সেখান থেকে চলে যেত। তারা তাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করত। তখন আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, তোমরা জুলায়বীবকে তোমাদের নিকটে প্রবেশ করতে দিও না। কেননা সে যদি তোমাদের নিকটে আসে, তাহ’লে অবশ্যই আমি (কিছু) করব, আমি অবশ্যই (কিছু) করব। তাকে স্বীয় গৃহে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছিলেন। কোন মেয়ে জুলায়বীবকে বিবাহ করার কথা চিন্তাও করত না।

কিন্তু মহানবী (ছাঃ)-এর দৃষ্টিতে জুলায়বীবের অবস্থান ছিল অনেক উপরে। তিনি এই ছাহাবীর প্রয়োজন সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত, আবু বারযা আল-আসলামী (রাঃ) বলেন, আনছার ছাহাবীদের কারো মেয়ে থাকলে তারা ততক্ষণ পর্যন্ত কোথাও বিয়ে দিতেন না, যতক্ষণ না এ ব্যাপারে নিশ্চিত হ’তেন যে, রাসূল (ছাঃ)-এর তাকে বিয়ে করার প্রয়োজন নেই।

রাসূল (ছাঃ) জুলায়বীবের কথা চিন্তা করে একদিন এক আনছারীর কাছে গিয়ে বললেন, ‘আমি তোমার মেয়েকে বিয়ে দিতে চাই’। আনছার লোকটা খুবই খুশী হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! এতো খুবই বিস্ময়কর, সম্মান, আনন্দ ও আমার চক্ষু শীতলকারী খবর। রাসূল (ছাঃ) বললেন, ‘আমি ওকে নিজের জন্য চাই না’। লোকটি (কিছুটা হতাশ হয়ে) জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! তাহ’লে কার জন্য? তিনি বললেন, ‘জুলায়বীবের জন্য’। এ কথা শুনে আনছার মনে একটা ধাক্কা খেলেন এবং নিচু গলায় বললেন, আমি এ ব্যাপারে মেয়ের মায়ের সাথে পরামর্শ করব। এই বলে লোকটি তার স্ত্রীর কাছে চলে গেলেন এবং সব খুলে বললেন। স্ত্রী তার মতই রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক জুলায়বীবের সাথে মেয়ের বিবাহের প্রস্তাব শুনে স্তব্ধ হয়ে বললেন, জুলায়বীবের সাথে! না, কখনোই নয়। আল্লাহর শপথ! আমরা তাকে (নিজ মেয়েকে) তার (জুলায়বীবের) সাথে বিয়ে দেব না। তখন সেই আনছারী তার স্ত্রীর অমতের কথা রাসূল (ছাঃ)-কে জানাতে যাওয়ার জন্য উদ্যত হ’লেন। কিন্তু তার মেয়ে যে কি-না আড়াল থেকে সব শুনছিল। সে এসে জিজ্ঞেস করল, তোমাদেরকে আমার বিয়ের ব্যাপারে কে প্রস্তাব দিয়েছেন? উত্তরে মা তাকে বললেন, রাসূল (ছাঃ) তাকে জুলায়বীবের সাথে বিয়ে দিতে অনুরোধ করেছেন।

যখন মেয়েটি শুনল যে, প্রস্তাবটি রাসূল (ছাঃ)-এর পক্ষ থেকে এসেছে এবং তার মা সেটা প্রত্যাখ্যান করছেন, তখন সে দৃঢ়চিত্তে নিয়ে বলল, তোমরা কি আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছ? আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে যাও, তিনি নিশ্চয়ই আমার জন্য ধ্বংস ডেকে আনবেন না।

অন্য বর্ণনায় এসেছে, মেয়েটি বলল, আমি এ ব্যাপারে রাযী হ’লাম এবং রাসূল (ছাঃ)-এর সম্মতির প্রতি আত্মসমর্পণ করলাম। তারপর সে মা-বাবাকে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি শুনিয়ে দিল ‘আর কোন মুমিন পুরুষ বা নারীর জন্য উচিত নয় যে, যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তখন সে ব্যাপারে তাদের কোন মতামত থাকে। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করে, সে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে নিমজ্জিত হয়েছে’ (আহযাব ৩৬)। অতঃপর তার পিতা মেয়েকে সাথে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দরবারে গিয়ে তার মেয়ের দৃঢ়তার কথা জানালেন এবং বললেন, আমার মেয়ের জন্য যেটা ভাল মনে করেন সেটাই করুন। মেয়েটির মতামত শুনে রাসূল (ছাঃ) তাঁর জন্য দো‘আ করলেন,اللَّهُمَّ صُبَّ عَلَيْهَا الْخَيْرَ صبًّا وَلاَ تَجْعَلْ عَيْشَهَا كَدًّا كَدًّا

‘হে আল্লাহ! তুমি তার প্রতি কল্যাণ নাযিল কর এবং তার সংসার জীবন কষ্টদায়ক কর না’। অতঃপর রাসূল (ছাঃ) জুলায়বীবের সাথে তার বিবাহ সম্পাদন করলেন।

এর অব্যবহিত পরেই রাসূল (ছাঃ) কোন এক যুদ্ধে বের হ’লেন এবং এক পর্যায়ে আল্লাহ তা‘আলা মুসলমানদের বিজয় দান করলে রাসূল (ছাঃ) ছাহাবীদের বললেন, তোমরা কি কাউকে হারিয়ে ফেলেছ? ছাহাবাগণ বললেন, না, আমরা কাউকে হারাইনি। তিনি বললেন, কিন্তু আমি যে জুলায়বীবকে দেখতে পাচ্ছি না। তোমরা তাকে নিহতদের মাঝে খোঁজ কর। তারা খুঁজতে খুঁজতে সাতটি মৃতদেহের পাশে তার মৃতদেহ পেলেন। অর্থাৎ তিনি তাদের সাতজনকে হত্যা করেছেন। অতঃপর নিজে শাহাদত বরণ করেছেন। তারা রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট এসে সব ঘটনা খুলে বললেন। সংবাদ শুনে রাসূলুল্লাহ সেখানে গেলেন এবং বললেন, সে সাতজনকে হত্যা করেছে। অতঃপর তারা তাকে শহীদ করেছে। জেনে রেখো! সে আমারই মত আর আমিও তার মত (তথা আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে- নববী, শরহে মুসলিম)। এভাবে তিনবার বললেন। অতঃপর রাসূল (ছাঃ) তাকে নিজ কাঁধে বহন করে যথাস্থানে নিয়ে গেলেন এবং নিজ হাতে কবর খনন করে তাকে সমাহিত করলেন। ছাবেত (রাঃ) বলেন, তখন আনছারদের বিধবাদের মধ্যে ঐ মেয়েটির চেয়ে অধিক সম্পদশীলা ও দানশীলা আর কেউ ছিল না।

(আহমাদ হা/১৯৭৯৯, আরনাঊত্ব, সনদ ছহীহ; মুসলিম হা/২৪৭২, ইবনু হিববান হা/৪০৩৫, সনদ ছহীহ, ইবনে আব্দুল বার্র, আল-ইস্তি‘আব ফী মা‘রেফাতিছ ছাহাবা, পৃঃ ৮১)।

শিক্ষণীয় বিষয় : সমাজে জুলায়বীব (রাঃ) ছিলেন অবহেলিত, নিগৃহীত ও নিম্ন শ্রেণীর। কিন্তু তাঁর সততা, নিষ্ঠা, ঈমান-আমল ও আনুগত্যের কারণে মহানবী (ছাঃ)-এর অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। ইসলামের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন অনেক মর্যাদার অধিকারী। ইসলামে মানুষের মর্যাদা জন্মসূত্রে অথবা দেহবল্লবীতে নির্ধারিত হয় না, বরং নির্ধারিত হয় তাক্বওয়ার ভিত্তিতে। যার বাস্তব উদাহরণ জুলায়বীবের উপরোক্ত ঘটনা।

পাপি ব‍্যাক্তি তার পাপের শাস্তি পায় ইসলামিক ছোট গল্প



ইরাকের মুছেলের এক সৎ ব্যক্তি, যার নাম ছিল আলী ইবনু হারব। তিনি বলেন, আমি নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস ক্রয় করার জন্য মুছেল থেকে সুররামান রায়া নামক স্থানে যাচ্ছিলাম। সে সময় দাজলা নদীতে কিছু নৌকা ছিল। যেগুলো ভাড়ায় লোকজন ও মালামাল পারাপার করত। আমি একটি নৌকায় আরোহণ করলাম।

নৌকা আমাদেরকে নিয়ে সুররামান রায়ার দিকে চলতে শুরু করল। নৌকায় মালামাল ব্যতীত আমরা পাঁচ জন যাত্রী ছিলাম। আবহাওয়া ছিল চমৎকার। আকাশ খুব পরিচ্ছন্ন ছিল। দাজলা নদীও ছিল শান্ত। নৌকা তরতর করে বয়ে চলছিল। যাত্রীদের অধিকাংশই তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিল। আমি দাজলা নদীর উভয় তীরের সৌন্দর্য অবলোকন করছিলাম। হঠাৎ পানি থেকে একটি বড় মাছ লাফিয়ে নৌকায় এসে পড়ল। আমি ছুটে গিয়ে মাছটি ধরে ফেললাম। বিশালকায় মাছের লেজের ঝাপটানিতে লোকদের তন্দ্রা দূর হয়ে গেল। মাছ দেখতে পেয়ে তাদের একজন বলল, এই মাছ আল্লাহ তা‘আলা আমাদের জন্য পাঠিয়েছেন। আমরা সামনে কোন তীরে নেমে মাছটি ভুনা করে খাব। সকলে একমত হওয়ায় তীরের দিকে নৌকা ঘুরিয়ে দেওয়া হ’ল। আমরা তীরে অবতরণ করে ঘন গাছ বিশিষ্ট এক স্থানে অবস্থান করলাম, যাতে জ্বালানী জমা করে মাছটি রান্না করা যায়।

আমরা সেখানে এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখলাম। একটি মৃতদেহ মাটিতে পড়ে আছে, পাশেই পড়ে আছে একটি ধারালো চাকু। অদূরে অন্য এক যুবক হাত-পা এবং মুখে কাপড় বাঁধা। সে বাঁধন মুক্ত হওয়ার প্রানান্ত চেষ্টা করছে। আমরা দ্রুত সামনে গিয়ে ঐ ব্যক্তির সকল বাঁধন খুলে দিলাম। তার চেহারায় অত্যন্ত ভীতি ও নিরাশার ছাপ ছিল। বাঁধন মুক্ত হয়ে সে বলল, দয়া করে আমাকে একটু পানি দাও। আমরা তাকে পানি দিলাম। এরপর আমাদেরকে সে পূর্ণ ঘটনা শুনাল। সে বলল, আমি ও এ মৃত ব্যক্তি একই কাফেলায় ছিলাম। আমরা মুছেল থেকে ব্যবসার উদ্দেশ্যে বাগদাদ যাচ্ছিলাম। এ নিহত ব্যক্তি ভাবল যে, আমার নিকট অনেক অর্থ আছে। তাই সে আমার সাথে আন্তরিকতা গড়ে তোলে এবং আমার ঘনিষ্ঠজনে পরিণত হয়। আমারও তার উপর যথেষ্ট ভরসা ছিল। কাফেলা বাগদাদ যাওয়ার পথে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য এ তীরে তাঁবু ফেলল। রাতের শেষ ভাগে কাফেলা রওয়ানা হয়ে গেল। কিন্তু আমি ঘুমিয়ে থাকায় কাফেলা রওয়ানা হওয়ার কথা জানতে পারিনি। আমার ঘুমের মধ্যে নিহত ব্যক্তি আমাকে রশি দিয়ে বেঁধে ফেলে। মুখও কাপড় দিয়ে বেঁধে দেয়, যাতে আমি চিৎকার করতে না পারি। এরপর সে আমাকে হত্যা করার জন্য মাটিতে ফেলে দিয়ে আমার বুকের উপর বসে হত্যা করতে উদ্যত হয়। তখন আমি বললাম, ওহে! তুমি আমার সকল সম্পদ নিয়ে নাও, তবুও আমাকে প্রাণে মের না। সে এতে রাযি হ’ল না; বরং তার বেল্টের সাথে বেঁধে রাখা ধারালো চাকু বের করার চেষ্টা করল। কিন্তু সে সহজে চাকুটি বের করতে পারল না। ফলে সে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে চাকু বের করতে গেল। এতে চাকু তার নিজ গলায় বিদ্ধ হয়ে শাহরগ কেটে গেল। তার প্রচুর রক্ত ক্ষরণ হ’লে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

এ পাপিষ্ঠ আমার চোখের সামনে তার পাপের শাস্তি পেয়ে গেল। আমি মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম। কেননা আমরা যেখানে আছি, কম লোকই এই পথ দিয়ে যায়। ফলে বাঁধনমুক্ত হওয়ার ব্যাপারে আমি হতাশ হয়ে পড়লাম। অবশেষে আমি আল্লাহর নিকট দো‘আ করলাম, হে আল্লাহ! তুমি আমার নিকট কাউকে পাঠিয়ে আমাকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার কর। আমি সর্বদা এ দো‘আই করছিলাম। এ কারণেই হয়ত আল্লাহ তোমাদেরকে পাঠিয়ে আমাকে রক্ষা করেছেন। বলতো, তোমরা কি কারণে এ জনমানবহীন স্থানে আসতে বাধ্য হয়েছ?

কাফেলার লোকেরা বলল, একটা মাছ আমাদেরকে তোমার নিকট আসতে বাধ্য করেছে। যেটা পানি থেকে আমাদের নৌকায় লাফিয়ে উঠেছিল। আমরা এই মাছ ভুনা করে খাবার জন্য এখানে এসেছি। কাফেলার লোকদের কথা শুনে ঐ ব্যক্তি আশ্চর্য হয়ে বলতে লাগল, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা‘আলা ঐ মাছটিকে তোমাদের নৌকায় পাঠিয়েছিলেন আমাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করার জন্য। এরই মধ্যে মাছটি নৌকা হ’তে লাফ দিয়ে পানিতে পড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। সবার ধারণা হ’ল যে, আল্লাহ মাছকে ঐ ব্যক্তির জীবন রক্ষার জন্যই পাঠিয়েছিলেন।

এভাবে যখন আল্লাহ তা‘আলা কিছু করতে চান, তখন তার জন্য কারণ সৃষ্টি করে দেন (বুখারী হা/৩৭৭৩)। নবী করীম (ছাঃ) বলেন, ‘মযলূমের বদ দো‘আ থেকে দূরে থাক। কেননা মযলূমের দো‘আ এবং আল্লাহর মাঝে কোন আড়াল থাকে না’। (বুখারী হা/২৪৪৮; মুসলিম হা/১৯; ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশ্ক ২৬/৩৮৫; ইবনু মুল্লাকান, ত্বাবাকাতুল আওলিয়া ১/১৮০)।